নিতে আসেন না কেউ!

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

পরিবার, নিকটাত্মীয় কিংবা দায়িত্ব নেওয়ার মতো সঙ্গে কেউ না থাকলে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য হাসপাতালে রোগী ভর্তি নিতে সমস্যা হয়। আর মানবিক কারণে ভর্তি করা হলেও পরে ডিসচার্জের সময়ে রোগীরা  সমস্যায় পড়েন। কারণ রোগীর পরিবারের কাউকেই তখন খুঁজে পাওয়া যায় না। পরিবারের সদস্যরাও তাদের নিতে আসেন না। বিদেশে যেমন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে সাইকিয়াট্রিক রোগীদের পুনর্বাসন কেন্দ্র থাকে, বাংলাদেশেও সেরকম থাকা দরকার বলে মনে করছেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা।

তারা জানান, মানসিক রোগীদের জন্য যতোটুকু সরকারি ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার ততোখানি এখানে নেই। অনেক রোগী আছেন, যাদের অসুখ কখনও পুরোপুরি সারবে না, কিন্তু মানুষ হিসেবে তার অধিকার রয়েছে রাষ্ট্রের সহযোগিতা পাবার। রাষ্ট্র সে ব্যবস্থা এখনও নিচ্ছে না। তবে পরিবারের মানুষগুলো যদি মানবিক হয়ে ওঠেন তাহলে সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর চাপ কমে যায়।

আরও পড়ুন: প্রিজনভ্যানে মতিউর রহমান নিজামীনিজামী ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে

পটুয়াখালী জেলার মীর্জাগঞ্জ থানার বন্দর গ্রামের পুতুল চিকিৎসকদের কাছে তার বাড়ির ঠিকানা বলেছেন।  বাবার নাম খোকন কর্মকার আর মা শেফালি রানী কর্মকার।  পুতুলকে শেরেবাংলা নগর থানার পুলিশ এখানে ভর্তি করেছেন গত ২৪ ফেব্রুয়ারি।  এখন তিনি অনেকটাই সুস্থ। বাড়ি ফিরে পরিবারের সঙ্গে থাকলে আরও সুস্থ হবেন বলে চিকিৎসকরা জানালেও পুতুলকে নিতে কেউ আসেনি এখনও। আর তাই হাসপাতাল থেকে থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়েছে। প্রথম দিকে খুবই ভায়োলেন্ট হলেও এখন তিনি স্বাভাবিক বলে বাংলা ট্রিবিউনকে জানালেন জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কার মো. জামাল হোসেন।

তিনি বলেন, আমি ২০০১ সাল থেকে এখানে আছি, আজ  পর্যন্ত এ রকম ২০ থেকে ২৫টি কেস হ্যান্ডেল করেছি। তিনি জানান,  গত এপ্রিলে চাঁদপুরের কোর্ট থেকে একজন রোগীকে হাসপাতালে পাঠায় চিকিৎসার জন্য।  কোর্ট থেকে পাঠানোর কারণে তার সঙ্গে অ্যাটেনডেন্ট হিসেবে একজন পুলিশ সদস্য ছিলেন।কিন্তু যখন তাকে ডিসচার্জ করা হয়,তার আগেই সেই পুলিশ সদস্যটি চলে যান। এরপর চাঁদপুরের পুলিশ সুপারের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশ এনে রিলিজ করা হয়।

আরও পড়ুন:শেখ হাসিনা দিল্লি চায় এ বছরেই হোক শেখ হাসিনার ভারত সফর

আবার ২০১০ সালে বুয়েটের সামনের রাস্তায় পেয়ে একজনকে বুয়েটের শিক্ষার্থীরাই ভর্তি করেন এখানে।  তারা সবাই তাকে দেখাশোনাও করেছেন। কিন্তু ডিসচার্জের সময় দায়িত্ব নিতে কেউ রাজি হননি। রোগী একটু সুস্থ হলে তার কাছ থেকে গ্রামের বাড়ির ঠিকানা জানতে পারলেও ফোন নম্বর দিতে পারেননি তিনি। তখন অনেক খুঁজে তার বাড়িতে গিয়ে পরিবারের সদস্যদের জানানো হয়। কিন্তু পরিবার আগ্রহী ছিল না তাকে ফিরিয়ে নিতে। বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করার পরে তারা জানালেন, আমরা তাকে আনতে যাবো না, যদি পৌঁছে দেওয়া হয় তা হলে তাকে রাখতে পারি। প্রায় দুই মাসের ওষুধ ও যাতায়াত খরচ দিয়ে হাসপাতাল থেকে তাকে বাড়িতে পৌঁছে দেই আমরা।

জামাল হোসেন আরও বলেন,  হাসপাতাল থেকে রোগীদের সরাসরি রাষ্ট্রীয় কোনও প্রতিষ্ঠান গ্রহণ করবে এমন কোনও আইন দেশে নেই।আর তেমন প্রতিষ্ঠানও নেই।

আরও পড়ুন: মশাম্যালেরিয়াতে মৃত্যু কমলেও ঝুঁকি রয়েছে!

কিছু রোগী আসেন যারা রোগের কারণে পরিবার থেকে বের হয়ে যান,আবার কখনও কখনও রোগী পরিবারের সদস্যদের ছাড়া অন্য কারও মাধ্যমে হাসপাতালে আসেন, আবার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কিংবা কখনও কখনও বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে রোগী পেয়ে থাকি আমরা। ভর্তি করিয়ে দেওয়ার পর ডিসচার্জ নেওয়ার সময় তারা আর দায়িত্বটা নিতে চায় না। এই ক্ষেত্রে আমরা বিভিন্ন সময়ে নানা সমস্যার মুখোমুখি হই, বললেন সহকারী অধ্যাপক হেলাল উদ্দিন আহমেদ।

ডা. হেলাল  আরও বলেন, কিছু অসুখ এবং অসুখের কারণে যে সীমাবদ্ধতাগুলো তৈরি হবে সেটাকে পরিবারের সদস্যদের মেনে নিতে হবে, এই সচেতনতা যখনই আসবে তখনই এ ধরনের রোগী প্রত্যেকে পরিবারে ফিরে যাবে। বর্তমানে অটিজম নিয়ে যে সচেতনতা হয়েছে, পরিবারগুলো এ রোগে আক্রান্ত কোনও শিশুর সব সীমাবদ্ধতা মেনে নিয়ে তার পাশে থাকছে,ভালবাসা দিচ্ছে শিশুটিকে। সেই সচেতনতা জন্মাতে হবে মানসিক রোগের ক্ষেত্রেও। তাহলেই এই রোগে আক্রান্ত মানুষগুলো হাসপাতাল থেকে বাড়ি যেতে পারবে, রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে হবে না তাদের। মানসিক রোগীদের বেলায় চিকিৎসা করালে শতকরা ৯৯ ভাগ ভাল থাকেন, এটা জানতে হবে সবাইকে। তারপরও এসব মানুষের জন্য যেসব সাপোর্ট দরকার সেটা প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম রয়েছে।

এইচকে/এমএসএম /   আপ- এপিএইচ/