মরিয়মের মস্তিষ্ক শুকিয়ে যাচ্ছে, আশা দেখছেন না চিকিৎসকরা

মা মরিয়মকে খাবার বেড়ে খাওয়াচ্ছে কন্যা মারিয়া বছরের পর বছর ধরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে থাকা মরিয়মের মস্তিষ্ক এবং মেরুদণ্ডের কিছু কিছু জায়গা শুকিয়ে গেছে। দিনে দিনে এই অবস্থা আরও খারাপ হবে, দেশে তো নয়ই, বিদেশেও এর  চিকিৎসা নেই। এখন প্রয়োজন তাকে কোনও এক জায়গায় পুনর্বাসন। কিন্তু ওকে যে কোথাও পুনর্বাসন করব সেটা তো আমরা করতে পারছি না। দুই সপ্তাহ আগে তার এমআরআই  করা হয়েছে,কিন্তু সেখানে আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু আমরা দেখতে পাইনি। বাংলা ট্রিবিউনকে বললেন মরিয়মের চিকিৎসক শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র রায়।
আরও পড়তে পারেন: নয়াপল্টনে সংঘর্ষে আহত শ্রমিকদল নেতার মৃত্যু

তিনি বলেন, নিউরো মেডিসিন, মেডিসিন এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন-এই  তিন বিভাগের চিকিৎসকদের নিয়ে গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড তাদের সিদ্ধান্ত দিয়ে দিয়েছে। রোগটা স্পাইনাল সেলিবেরাল অ্যাটাকশিয়া-ব্রেইন এবং মেরুদণ্ডের কিছু অংশ ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। দেশের বাইরে কোথাও এর চিকিৎসা নাই। আর এটি বংশগত রোগ। আমরা জানতে পেরেছি এই অসুখ মরিয়মের মায়েরও ছিল। মাও মারা গেছেন একটু বয়স হয়েই। কিন্তু আমরা ওর ক্ষেত্রে সেই সম্ভাবনাও দেখতে পাচ্ছি না। খারাপ লাগছে চোখের সামনে মেয়েটাকে দেখছি, কিন্তু কিছু তো করার নেই।এমনিতে তার ভিটামিন এবং সার্পোটিভ ওষুধ চলছে,কিন্তু এতে ওর কোনও সাহায্য হবে না।
ডা. গোবিন্দ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা না করে তো আমরা পুনর্বাসনের বিষয়ে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। লোকমুখে শুনেছি একটা ভাই নাকি আছে, সে মাঝে মাঝে ওদের কাছ থেকে টাকা নিতে আসে,কিন্তু তাকে আমি খুঁজে পাচ্ছি না। মরিয়মের দেখাশোনা যারা করেন হাসপাতালে তাদের বলে এসেছি এলে আমাদের জানাতে। তিনি আরও বলেন,আমাদের এখন আর কিছুই করার নেই,ও আর কিউরেবল নয়। এখন যদি কোথাও নিয়ে পুনর্বাসন করা যায় সেটাই ওর জন্য মঙ্গলজনক, আর কোনও পথ আমাদের জানা নেই। কারণ যতই দিন যাবে ততই সে বিছানায় পড়বে, আরও খারাপের দিকে যাবে। এরইমধ্যে আমরা সে লক্ষণগুলো দেখতে পাচ্ছি। এখন আমরা ওকে বলেছি, তোমার লোকজন থাকলে খবর দাও, তোমাকে আমরা যোগাযোগ করে সিআরপিতে পাঠাতে চেষ্টা করবো। কিন্তু ওর তো কেউ সেভাবে নেই, তাহলে যোগাযোগ কে করবে, কে নিয়ে যাবে, কেইবা সব কিছু দেখাশোনা করবে-আমরা আসলে বিপদে পড়ে গেছি ওকে নিয়ে, বলেন তিনি।
অারও পড়তে পারেন: লন্ডনে পৌঁছেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা


জানা গেল,মরিয়মকে নিয়ে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচারের পর ওকে অনেক মানুষ দেখতে এসেছেন, অনেক কিছু দিয়ে গেছেন,অনেকেই নগদ অর্থ দিয়ে সাহায্য করেছেন। কিন্তু সেসব অর্থ ওদের কাছে রাখাও বিপদজনক, মরিয়ম কিংবা তার পাঁচ বছরের মেয়ের পক্ষে এসব গুছিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তাই হাসপাতাল পক্ষ থেকে একটি বোর্ড গঠন করে করে দেওয়া হয়েছে যার কাছে নগদ অর্থের পুরো টাকাটাই রয়েছে। সেখানে প্রায় ত্রিশ হাজার টাকার মতো জমা হয়েছে এরইমধ্যে।
মরিয়মকে দেখা শোনা করা হাসপাতালের ক্লিনার ফিরোজা বেগম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে মরিয়ম। নিয়ম করে ওষুধ খাওয়াচ্ছি আমরা, ভাত খাওয়াচ্ছি। ডাক্তার স্যাররা আমাগো কইয়া দিছে ওর দিকে ভালো করে খেয়াল রাখতে, আমরা ওদের সেবায় কোনও অবহেলা করছি না।
ফিরোজা জানালেন, এরই মধ্যে মরিয়মের বেড (বিছানা) অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, পরিষ্কার বিছানা চাদরসহ সবকিছু হাসপাতাল থেকে দেওয়া হয়েছে, ভালো ভালো খাবার খেয়ে মা মেয়ে দু’জনই ভালো আছে।
এদিকে বাংলা ট্রিবিউনে মরিয়মের সংবাদ পড়ে যেসব মানুষ হাসপাতালে ছুটে গেছেন তাদের একজন আমানুল্লাহ নোমান। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন,অনেকেই আছে যারা মেয়েটিকে নিতে চায়,কিন্তু মরিয়ম তো মেয়েকে ছাড়তে চায় না।আর এখন নিজেও বুঝতে পারছি না কী করবো। সময় পেলেই হাসপাতালে যাই,কিছু সময় কাটাই, আমাদের দেখলে ওরাও একটু মানসিক শান্তি পায়। কিন্তু আসলে কী করা উচিত সেটা বুঝতে পারছি না।
হাসপাতালে আর কতদিন থাকতে পারবে,যদি একটা থাকার জায়গা নির্ধারণ করা যেত তাহলে ভালো হতো। মারিয়াকে আমরা বই, খাতা, স্কুল ব্যাগ কিনে দিয়ে এসেছি, এর মধ্যে মরিয়মের কী অবস্থা হয় সেটাও দেখা যাক। তবে আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করবো যেখানে মরিয়মের চিকিৎসা কিংবা পুনর্বাসন হবে সেখানেই তাকে নিয়ে যাবার।

/এমএসএম/