তিনি এখনও গুলিস্তান জ্যামে আটকা। নেমে হেঁটেই চলে যাবেন কিনা ভাবছেন কিন্তু তাতেও কোনও লাভ নেই। সময়ের আগে পৌঁছানো সম্ভব নয়। কারণ গুলিস্তান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পায়ে হাঁটার পথ অন্তত ৩০ মিনিটের।
এক পর্যায়ে জ্যাম ঠেলে বাসটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে পৌঁছাল ঠিকই কিন্তু ততক্ষণে পরীক্ষার সময় ১০ মিনিট পার হয়ে গেছে। বাস থেকে নেমে পরীক্ষার হল পর্যন্ত যেতে আরও ৫ মিনিট লাগবে। নষ্ট হলো ১৫ মিনিট। পরীক্ষা শেষে ওই ছাত্রী এই প্রতিবেদককে ফোন করে জানালেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা।
আরও পড়তে পারেন: কেন্দ্রের ফলাফল পাল্টে গেল উপজেলায় গিয়ে!
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করতে করতে জানালেন, আমাদের তো থাকার জায়গা দেননি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আমি মিরপুর ১২ তে থাকি। তাই সেখান থেকে প্রতিদিন ক্যাম্পাসে আসতে-যেতে সময় লাগে কমপক্ষে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ৪-৫ ঘণ্টা আমরা জ্যামে বসে থাকি। বিশ্ববিদ্যালয়ে আসি সকাল ৯টার মধ্যে। এরপর মেসে ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে যায়। ফিরেই খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি। পড়াশোনা করার মতো শক্তি ও মানসিকতা কোনোটাই আর থাকে না। আমি একটি টিউশনি করি, ফলে সেখানেও সময় দিতে হয়। তাই অন্তত ২-৩ ঘণ্টা হাতে সময় নিয়ে মেস থেকে বের হই, পরীক্ষা অথবা ক্লাস যেটাই থাকুক হাতে বই রাখি। বাসে বসেই পড়াশোনা করি। বাসায় অথবা হোস্টেল থেকে পড়াশোনা শেষ করে আসার কথা থাকলেও পরীক্ষার প্রস্তুতিটা অনেক সময় বাসে বসেই নিতে হয়।
শিক্ষার্থী রত্না আক্ষেপ করে বলেন, আবাসিক সুবিধা না থাকা এবং পরিবহন সংকট দুটোই আমাদের ওপর একসঙ্গে চেপে বসেছে। আবাসিক সংকট আছে তবুও যদি আমাদের পর্যাপ্ত পরিবহন ব্যবস্থা থাকতো তাহলে কষ্ট কিছুটা হলেও কম হতো। আমরা যে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের থেকে অনেক পিছিয়ে, তা শুধু এখানেই বোঝা যায়। বাকি অন্য সব প্রাপ্য অধিকারের কথা তো বাদই দিলাম।
তিনি আরও বলেন, দেশের ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। বিভিন্ন সংকটে জর্জরিত বিশ্ববিদ্যালয়টির আবাসিক ব্যবস্থা না থাকা শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের। এ সুবিধা না থাকায় ঢাকায় বসবাসে ‘মেস’ই আমাদের একমাত্র ভরসা। অন্যদিকে যাওয়া-আসার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যে পরিমাণ পরিবহন বাস আছে তাও খুব কম। প্রায়ই বাসে জায়গা পাওয়া যায় না, ফলে বাধ্য হয়ে পাবলিক বাস ধরতে হয়।
ওই শিক্ষার্থীর বক্তব্যের সূত্র ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতরে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, মেস থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য বরাদ্দ রয়েছে মাত্র ১৪টি বাস। এর মধ্যে ১২টি দ্বীতল, অন্য দুটি একতলা বাস। এছাড়া ৭টি বাস শিক্ষকদের যাতায়াতের জন্য এবং সিনিয়র শিক্ষকদের জন্য ৬টি মাইক্রোবাস রয়েছে। অ্যাম্বুলেন্স রয়েছে মাত্র ১টি।
অারও পড়তে পারেন: আইপিএল-এর সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় মুস্তাফিজ
অন্যদিকে প্রায় ২০ হাজার শিক্ষার্থীদের জন্য এখন পর্যন্ত কোনও আবাসিক ব্যবস্থা করতে পারেননি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এই ব্যবস্থার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দুটি প্রকল্প হাতে নিলেও গত পাঁচ বছরে তার ফলাফলটাও নিরাশার। ছাত্রীদের জন্য একটি হোস্টেলের নির্মাণ কাজ শুরু হলেও মাঝে মাঝেই কাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
এদিকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সুবিধা দিতে পরিবহন বাবদ কত রাখা হয় জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা জানান, তাদের কাছ থেকে প্রতি সেমিস্টারে পরিবহন ফি বাবদ ২০০ টাকা রাখা হয়। অথচ প্রায় ৯০ শতাংশ শিক্ষার্থী এই পরিবহন সুবিধা পায় না। সুতরাং প্রতিটি শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরিবহন ফি শতভাগ আদায় করা হলেও তাদেরকে পরিবহন সুবিধা দিতে ব্যর্থ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন দফতরের সহকারী রেজিস্ট্রার আবদুল আজিজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, দিনে শুধু একবার ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন রুট থেকে বাসগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে আসে। সকালের এক ট্রিপে শিক্ষার্থীদের নিয়ে আসে এবং বিকালে ফিরে যায়। এক ট্রিপ হওয়ার কারণেও শিক্ষার্থীরা ভোগান্তিতে পড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরিবহন সংকট কাটাতে নতুন কোনও বাস যুক্ত হচ্ছে কিনা জানতে চাইলে তিনি জানান, পরিকল্পনা তো সবসময়ই থাকে। বেশ কিছুদিন আগেও একটি বাস এসেছে। সামনেও আরও নতুন বাস আসার সম্ভবনা রয়েছে।
বাসে যাতায়াতকারী কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসে সবসময় প্রচণ্ড ভিড় থাকে। কোনও সিট খালি তো থাকেই না বরং এক সিটে দুজন ঠেসাঠেসি করে বসতে হয়। এছাড়া সিটে বসা শিক্ষার্থীরা ছাড়াও দাঁড়িয়ে থাকে প্রায় অর্ধশত শিক্ষার্থী। বাসের গেটে ঝুঁলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাতায়াত করেন বলে জানান।
এদিকে পরিবহন সংকট ও আবাসিক সুবিধা না থাকার কারণে গতবছর বিশ্ববিদ্যালয় পরিবহনের দরজায় ঝুঁলে ক্যাম্পাসে আসার পথে মাশুক নামে এক শিক্ষার্থী রাস্তায় পড়ে নিহত হন। অন্যদিকে নৃবিজ্ঞান বিভাগের আতিকুর রহমান পাবলিক বাসে বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পথে বাস দুর্ঘটনায় নিহত হয়। জীবনের ঝুঁকি নিয়েই ক্যাম্পাসে যাতায়াত করেন বলে মনে করেন শিক্ষার্থীরা।
জানা গেছে, আবাসিক সংকট কাটাতে কেরানীগঞ্জে দুই ধাপে ২২ বিঘা জমি ক্রয় করেছে প্রশাসন। জায়গাটিতে মাটি ভরাট করে একটি একাডেমিক ভবন ও একটি ছাত্রাবাস নির্মাণের কথা থাকলেও এ বিষয়ে প্রকল্পের তেমন কোনও অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
জবির পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও ওয়ার্কার্স দফতরের পরিচালক নুরুল হক মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ছাত্রী হোস্টেল ও একাডেমিক ভবনের ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের কাজ দ্রুত গতিতেই চলছে।
অন্যদিকে কেরানীগঞ্জে ২০ তলার একটি ছাত্রাবাস ও একটি একাডেমিক ভবন নির্মাণের পরিকল্পনার অগ্রগতি সর্ম্পকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভবন দুটি নির্মাণে সরকারের কাছে প্রথম দফায় ১২২ কোটি টাকা চেয়েছিলাম। সরকার সেই অর্থ ছাড় দিয়েছিল কিন্তু বতর্মানে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সরকারের কাছে ২৫০ কোটি টাকা চাওয়া হচ্ছে। বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফাইলটি জমা পড়ে আছে। সেখান থেকে ছাড় পেলে আরও দুটি ধাপ এগোনোর পর একনেকে পাসের জন্য যাবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সংকট নিয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, রাতারাতি সমস্যার সমাধান করা যাবে না। ছাত্রীদের জন্য একটি হল নির্মাণের কাজ চলছে। সামনে একটি প্রকল্প পাসের অপেক্ষায় রয়েছে, সেখানে ছাত্রদের একটি হল নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এগুলো সম্পন্ন করতে সময়ের প্রয়োজন।
নতুন বাস কেনার পরিকল্পনা আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবহন পার্কিংয়ের জায়গা নেই। আর একটি বাস কিনলেও রাখতে সমস্যা হয়ে যাবে। তবে বর্তমানে যে পরিবহন আমাদের রয়েছে সেগুলো দিয়েই সংকট কাটানো সম্ভব।
/আরএআর /এএইচ/