জঙ্গি দমনে ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও ‘ক্রসফায়ার’ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে খোদ পুলিশেই। অনেকেই মনে করেন, ক্রসফায়ারে নিহত জঙ্গিরা বেঁচে থাকলে কিংবা আদালতের মাধ্যমে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া সম্ভব হলে ভালো হতো। নেপথ্যে থাকা জঙ্গি ও গডফাদারদের তথ্য পাওয়া যেতো।তাদের ধরাও সম্ভব হতো। কিন্তু অনেক সময়েই কিছু করার থাকেনা বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তারা।
মুকুল রানা ওরফে শরীফ ওরফে সাকিব ওরফে সালেহ ওরফে আরিফ ওরফে হাদিকে ধরিয়ে দিতে ঢাকা মহানগর পুলিশ পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করেছিল। পুরস্কার ঘোষিত আরেক জঙ্গি সুমন হোসেন পাটোয়ারী ওরফে সাকিব ওরফে শিহাব ওরফে সাইফুলকে গ্রেফতারের পর গত ১৫ জুন আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি’র অতিরিক্ত কমিশনার ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল বিভাগের প্রধান মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, লালমাটিয়ায় প্রকাশক আহমেদুর রশিদ টুটুলের ওপর হামলার ঘটনার সমন্বয়ক ছিল শরীফ। তাকে ধরা গেলে আনসারুল্লাহর দ্বিতীয় ও প্রথম সারির জঙ্গি কারা এবং কাদের নির্দেশে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটানো হচ্ছে সেটা জানা যেতো।
বন্দুকযুদ্ধে শরীফ মারা যাওয়ার পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে গোয়েন্দা পুলিশের যুগ্ম কমিশনার আবদুল বাতেন বলেন, এসব আসামিদের দিয়ে ১৬৪ (এ) ধারায় আদালতে জবানবন্দি দেওয়াতে পারলে মামলার জন্য আরও ভালো হতো। কিন্তু বন্দুকযুদ্ধের বিষয়ে আগে থেকেতো কিছু বলা যায়না। অভিযানে যাওয়ার পর আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো এমন পরিস্থিতির মুখে পড়ে। তখন আক্রান্ত হলেই কেবল তারা আত্মরক্ষার্থে পাল্টা আক্রমণ চালায়। তখন অনাকাঙ্ক্ষিত এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
জঙ্গি দমনে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার, মামলা, গ্রেফতার, তদন্ত ও কারাদণ্ডই যথেষ্ট নয় বলে মনে করেন র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ।
জঙ্গি দমনে বিকল্প উপায় খুঁজছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। ইসলামের নামে জঙ্গি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলায় মামলা, গ্রেফতার, তদন্ত ও জেলের শাস্তিসহ প্রচলিত বিধি-বিধান যথেষ্ট নয় বলেও মন্তব্য করেছেন র্যাবের মহাপরিচালক।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ইফতার মাহফিলে শুভেচ্ছা বক্তব্য দিতে গিয়ে র্যাবের ডিজি বেনজীর আহমেদ বলেন, ১৮-১৯ বছরের একজন লাজুক, ভদ্র, মেধাবী ও সদ্য কৈশোর উত্তীর্ণ তরুণকে কি বলে জঙ্গিরা নৃশংস খুনিতে পরিণত করে সেটা জানতে হবে। সেই বক্তব্য ও যুক্তি খণ্ডন করে পাল্টা তাদের বুঝাতে হবে। সামাজিকভাবেই প্রচারণা চালিয়ে এর মোকাবিলা করতে হবে।
তিনি বলেন, জঙ্গিরা দেশ, জাতি ও ইসলামের শত্রু। তারা শান্তির ধর্ম ইসলামকে জঘন্যভাবে গোটা বিশ্বে উপস্থাপন করছে। অথচ ইসলাম কখনও এসব জঙ্গিবাদ সমর্থন করেনা। জঙ্গিবাদের শিকার হয়ে যারা মারা গেছেন তাদের বেশিরভাগই মুসলমান। বাংলাদেশে নিরীহ মুসলিম, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের হত্যা করছে। জঙ্গি দমনে সামাজিক সচেতনতার কোনও বিকল্প নেই বলেও মনে করেন তিনি।
পুলিশ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী চলতি জুন মাসের এ পর্যন্ত ‘বন্দুক যুদ্ধ’ ও ‘ক্রসফায়ারে’ অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই বিভিন্ন জঙ্গি সংগঠনের সদস্য বলে জানিয়েছে পুলিশ। যারা লেখক, ব্লগার ও প্রকাশক হত্যা ও হত্যাচেষ্টার সঙ্গে জড়িত ছিল।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী গত জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে কথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’ কিংবা ‘ক্রসফায়ারে’ ৫৩ জন নিহত হয়েছে। ২০১৫ সালে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হেফাজতে থাকা অবস্থায় ও ক্রসফায়ারে মারা যায় ১৯২ জন। যাদের অনেকেই গুরুত্বপূর্ণ জঙ্গি ও সন্ত্রাসী হামলা মামলার আসামি ছিল।
/জেইউ/ এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
‘আমরা শঙ্কিত’
আড়ালেই থেকে যাচ্ছে ‘ক্রসফায়ারে’র মূল গল্প
জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদকে প্রশ্রয় দেবো না, সিদ্ধান্ত নিয়েছি: প্রধানমন্ত্রী