সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও বেপরোয়া অজ্ঞানপার্টি

পুলিশের সাঁড়াশি অভিযানের মধ্যেও থেমে নেই অজ্ঞান পার্টি। বরং নতুন নতুন কৌশলে হয়ে উঠেছে বেপরোয়া। ঈদ সামনে রেখে অজ্ঞানপার্টির সদস্যরা নানা কৌশলে সাধারণ মানুষকে অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। বাস, লঞ্চ, ট্রেন স্টেশন ও শপিংমলসহ রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে তারা আইন শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ফাঁকি দিয়ে তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এরইমধ্যে প্রায় অর্ধশত ব্যক্তি অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ রাজধানীর বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন। পুলিশও রমজানে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এ পর্যন্ত অজ্ঞান ও মলমপার্টির অর্ধশত সদস্যকে গ্রেফতার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে সোপর্দ করেছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত বিভিন্ন মেয়াদে তাদের সাজাও দিয়েছেন।

অজ্ঞান পার্টি

অজ্ঞানপার্টিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেওয়া ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দূরপাল্লার গাড়িতে হালুয়া ও হারবাল ওষুধ, ডাব, পানি, জুস ও তরল জাতীয় খাবার খাইয়ে নিরীহ সাধারণ মানুষকে তাদের খপ্পরে পড়ে। এসব দুর্বৃত্ত এতই ধূর্ত যে, তাদের চেনার কোনও উপায় থাকে না। কখনও অটোরিকশা ও ট্যাক্সিক্যাব চালক, কখনও হকার ও সহযাত্রী হয়ে কাজ করে। বাস, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন যানবাহনে এ চক্রের সদস্যরা ছদ্মবেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে। টার্গেটকৃত ব্যক্তির সঙ্গে ভাব জমিয়ে যেকোনও খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেয় নেশাজাতীয় দ্রব্য। এ চক্রে রয়েছে নারী সদস্যও। অনেক সময় দুর্বৃত্তরা স্বামী-স্ত্রী সেজে যানবাহনে ওঠে। এরপর টার্গেটকৃত এক বা একাধিক ব্যক্তিকে নেশাজাতীয় দ্রব্য খাইয়ে অচেতন করে সর্বস্ব লুটে নেয়। প্রায়ই অতিরিক্ত চেতনানাশকের ফলে প্রাণহানিও ঘটে।  

অজ্ঞানপার্টির খপ্পরে পড়ে এ সপ্তাহে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন অন্তত ২০ জন। তাদের মধ্যে নূর ইসলাম খান, রাশেদ উদ্দিন, খোরশেদ আলম, ইউনুস শরীফ, জীবন কৃষ্ণ দাস ও আসাদ আলীর অবস্থা গুরুতর। জ্ঞান না ফেরায় দু’জনের নাম-পরিচয় পাওয়া যায়নি। এ দু’জনকে গুলিস্তান ও বঙ্গবাজার এলাকা থেকে রবিবার রাতে উদ্ধার করে স্থানীয়রা হাসপাতালে পৌঁছে দেয়। রাশেদ উদ্দিন সিএনজি চালিত অটোরিকশার চালক। রবিবার রাতে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের পাশ থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা তার অটোরিকশাটি নিয়ে গেছে।

চট্টগ্রামের ব্যবসায়ী ইউনুসকে সোমবার মধ্যরাতে অজ্ঞান অবস্থায় ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। রাত ১২টার দিকে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে ফকিরাপুল এলাকায় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েন। সোমবার সকালে বিমানবন্দর রেলস্টেশন থেকে জীবন কৃষ্ণ দাস ও সন্ধ্যায় মতিঝিল এলাকা থেকে আসাদ আলীকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

কিন্তু পুলিশের অতিরিক্ত সতর্কতা ও সাঁড়াশি অভিযানের ফলে এ চক্রের সদস্যরা অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর বেশি সুবিধা করতে পারেনি বলে জানিয়েছেন ঢাকা মহানগর গোযেন্দা পুলিশের উপ-কমিশনার (পশ্চিম) মো. সাজ্জাদুর রহমান। তিনি বলেন, গত ক’দিনে তারা অজ্ঞানপার্টির দলনেতাসহ ২৪ জনকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হয়েছেন। তিনি জানান, ঈদকে সামনে রেখে রাজধানীতে মলম ও অজ্ঞানপার্টির সদস্যদের দৌরাত্ম্য বন্ধে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে যাত্রাবাড়ী, শাহবাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও হাইকোর্ট এলাকা থেকে মলম ও অজ্ঞানপার্টির ২৪ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়।

পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মশিউর রহমান এ চক্রের ২১ সদস্যের মধ্যে ১২ জনকে ২ বছর, ৬ জনকে ১ বছর ও ৩ জনকে ৬ মাস সশ্রম কারাদণ্ড দেন।

রমজানের শুরুতে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, অজ্ঞান ও মলম পার্টির সদস্যরা গ্রেফতারের পর জামিনে বেরিয়ে আবার একই কাজ করে। তাই তাদের ধরে শুধু মামলা দিলে হবে না। কঠোর ধারায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, আমরা এবার রোজার শুরু থেকেই অজ্ঞানপার্টির প্রতিরোধের ব্যাপারে তৎপর ছিলাম। গোয়েন্দা টিম বেশ কয়েক স্থানে অভিযান চলিয়ে অজ্ঞানপার্টি-মলমপার্টির অন্তত ৪০ জন সদস্যকে গ্রেফতার করে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। ঈদ পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।

ডিএমপি’র পক্ষ থেকেও বিভিন্ন পদক্ষেপ ও নানামুখী প্রচারণার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ডিএমপি’র জনসংযোগ শাখার সহকারী কমিশনার এ এস এম হাফিজুর রহমান বলেন, অজ্ঞান ও মলমপার্টির প্রতারকচক্র থেকে বাঁচতে আগে থেকেই নগরবাসীকে সতর্ক করা হচ্ছে ডিএমপি’র পক্ষ থেকে। রমজানের আগের কয়েকমাসে ও রমজানে সবমিলিয়ে ৭৮৬ জনকে গ্রেফতারের পর বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। 

এছাড়া, ডিএমপি অজ্ঞান ও মলম পার্টির অপতৎপরতা রোধে সচেতনতামূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে বানিয়েছে বিভিন্ন শর্ট ফিল্ম, ডকুমেন্টরি ও বিভিন্ন ধরনের লিফলেট। বিভিন্ন রেলওয়ে স্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাটসহ বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় এগুলোর দেখানো ও বিতরণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। সাদাপোশাকে বিপুল পরিমাণ পুলিশ সদস্যের পাশাপাশি থাকবে সাদা পোশাকে মহিলা পুলিশের দলও।

/এমএনএইচ/

আরও পড়ুন:

অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে ৯ লঞ্চযাত্রী হাসপাতালে

ঈদ উপলক্ষে অজ্ঞান পার্টির ১০ চক্র সক্রিয়