দেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন হয়, তার পুরোটা সংগ্রহ করা সম্ভব হয় না। ঘাটতি থেকে যায়। রক্তদাতাদের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন সন্ধানী বলছে, বছরে মোট চাহিদার ৬০ ভাগ রক্ত পাওয়া যায়, ঘাটতি থাকে বাকি ৪০ ভাগ।
জানা গেছে, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৭ লাখ ব্যাগ রক্তের দরকার হয়। কিন্তু গতবছর রক্ত সংগ্রহ হয়েছে প্রায় ছয় লাখ ব্যাগ।
অপরদিকে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, সারাবিশ্বে বছরে প্রায় ১১ কোটি ব্যাগ রক্ত স্বেচ্ছায় সংগৃহীত হয়ে থাকে। বিশেষজ্ঞরা জানান, চাহিদা পূরণের জন্য ২০২০ সালের মধ্যে স্বেচ্ছায় রক্তদানের মাধ্যমে শতভাগ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এজন্য সরকারিভাবে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করার পাশাপাশি স্বেচ্ছায় রক্তদানে উৎসাহিত করার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে, জনগণের মধ্যে উদ্যোগ বাড়াতে হবে।
জানা যায়, সচেতনতা বেড়ে যাওয়ায় এবং নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচির কারণে আত্মীয়স্বজন থেকে ৬০ শতাংশ, স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের কাছ থেকে ৩০ শতাংশ রক্ত নেওয়া হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, উন্নত বিশ্বে প্রতি হাজারে স্বেচ্ছায় রক্ত দেয় ৪৫০ জন, আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে মাত্র তিনজন। নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে স্বেচ্ছায় রক্তদাতাদের রক্তের ৬৫ ভাগ কাজে লাগে অনূর্ধ্ব পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের, আর উন্নত দেশগুলোতে সংগৃহীত রক্তের ৭৬ ভাগ যায় ৬৫ বছরের বেশি বয়সী রোগীদের শরীরে।
জনসংখ্যার মাত্র এক ভাগ মানুষ নিয়মিত স্বেচ্ছায় রক্তদান করলেই তা একটি দেশের রক্তের চাহিদা পূরণের জন্য যথেষ্ট বলে জানাচ্ছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. সামিউল ইসলাম। রক্তদানের কর্মসূচিতে আমরা খুব একটা সুখকর জায়গায় নেই। ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশ হওয়ার পাশাপাশি মধ্যম আয়ের দেশে আমরা রয়েছি। দেশে এখন জনসংখ্যা ১৬ কোটির বেশি। নানা অসুখসহ সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। কিন্তু রক্তের অভাবে মানুষ মারা যাবে এটা মানা যায় না। আত্মীয় পরিজনের কাছ থেকে রক্ত পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু ঘাটতি থেকে যায় এক লাখ ব্যাগ। এর এজন্যই মানুষকে নানা দুর্ভোগের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। দায়িত্ব নিয়ে আমাদেরকে এই এক লাখ ব্যাগ রক্তের ঘাটতি পূরণ করতে হবে, তবে এটা অসম্ভব না। আর এ জন্য সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
কুমিল্লা থেকে প্রতিমাসে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত আয়মানকে নিয়ে ঢাকায় আসতে হয় মা কাজী জয়নাবকে। জয়নাব বলেন, আমার মেয়ের রক্ত দরকার হয় প্রতিমাসে। আর যেসব ডোনার আয়মানকে রক্ত দেন তাদের একবার রক্ত দেওয়ার পর অপেক্ষা করতে হয় চার মাস। কিন্তু আমারতো দরকার প্রতিমাসে, তাই প্রতিটি সামর্থ্যবান মানুষ যদি স্বেচ্ছায় রক্ত দিতো তাহলে আমাদের হাহাকার করা লাগতো না।
নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচি থেকে জানা যায়, স্বেচ্ছায় রক্তদাতার সংখ্যা গত ১০ বছরে বেড়েছে প্রায় ৩৫ শতাংশ। থাইল্যান্ডে এই হার ১০০ এবং ভারতে ৬৫ শতাংশ। ২০০০ সালে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিরাপদ রক্ত পরিসঞ্চালন কর্মসূচি শুরু হয়। বর্তমানে দেশে সরকারি ৩৯০টি এবং লাইসেন্স নিয়ে বেসরকারিভাবে ১০২টি ব্লাড ব্যাংক রক্ত সংগ্রহ ও বিতরণ করছে। এসব কেন্দ্রে হেপাপাইটিস বি-সি, সিফিলিস, ম্যালেরিয়া এবং এইডসের স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
স্বেচ্ছায় রক্তদানের সংগঠন সন্ধানীর রোগী কল্যাণ সম্পাদক এস এম মনিরুল ইসলাম মনির বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, এক ব্যাগ রক্তেই বেঁচে যেতে পারে একজন মানুষের জীবন। একজন সামর্থবান মানুষ নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর নিয়মিত রক্তদান করতে পারেন। নানা রকম সার্জারি এবং থ্যালাসেমিয়াতেই বেশি রক্তের প্রয়োজন হয়।
মনিরুল বলেন, বাংলাদেশে ও পজেটিভ এবং বি পজেটিভ রক্তের চাহিদা বেশি। অপরদিকে এবি পজেটিভ এবং নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপের রক্ত পাওয়া কঠিন। নেগেটিভ ব্লাডের ডোনার খুবই কম দেশে। ২৫ বছর থেকে ৩৫ বছরের মানুষেরাই বেশি রক্ত দিয়ে থাকেন।
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রক্ত পরিসঞ্চালন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাসুমা রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, একজন সুস্থ মানুষের রেড সেলগুলো ৮০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যে ভেঙে যায়, কেউ যদি রক্ত নাও দেন, তবু সেটা শরীরে থাকছে না। আর তিনি যদি এই রক্তটা দান করেন, তাহলে একজন মানুষ বেঁচে যান।
নিরাপদ রক্তের চাহিদার জন্য সরকারি এবং বেসরকারিভাবে ডোনারদের একটি তালিকা করার প্রতি জোর দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য কামরুল হাসান খান। তিনি বলেন, যাদের নেগেটিভ ব্লাড গ্রুপ তাদের নিয়ে একটি তালিকা করা খুবই জরুরি। এই তালিকা দেশের সব সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে হবে। স্বেচ্ছা রক্তদান নিয়ে আমাদের সামগ্রিকভাবে চিন্তা করতে হবে এবং পেশাদার রক্তদাতাদের পুনর্বাসনের চিন্তা করতে হবে। একইসঙ্গে অবৈধ ব্লাডব্যাংক যেগুলো রয়েছে সেগুলো বন্ধ করতে হবে।
কামরুল হাসান খান বলেন, আমরা সবাই মিলে যদি একসঙ্গে কাজ করি, তাহলে বাংলাদেশে রক্তের অভাবে অনন্ত কোনও মানুষ মারা যাবে না এটা আমি বিশ্বাস করি।
/এজে/ আপ- এপিএইচ/
আরও পড়ুন:
৮০ ভাগ সন্তান প্রসব হচ্ছে সিজারিয়ানে, বেশিরভাগই অপ্রয়োজনীয় !
রক্তের সেতুবন্ধনে যত বাধা ছিল