মঙ্গলবার দুপুর দুইটায় ‘ইলাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’-এ প্রবেশ করে দেখা গেল, সাইনবোর্ডে লেখার সঙ্গে ভেতরের পরিবেশের মিল নেই। সাইনবোর্ডে খাবারের ছবি থাকলেও ভেতরে তা নেই। রয়েছে বেশ কিছু সোফা ও টেবিল। আছে কয়েকটি ছোট কুঠুরি। পরিপাটি করে সাজানো বেশ কিছু দামি হুক্কা। রঙিন আলো ও আঁধারের রুমে দেওয়ালে টানানো হয়েছে বিভিন্ন শিল্পকর্ম। মোট কথা, খাবারের রেস্টুরেন্টগুলিতে যেমন আলোর ঝলকানি থাকে, এখানে রয়েছে তার উল্টোটা।
২১ নম্বর সড়কের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী রুহুল আমীন জানালেন,রেস্টুরেন্ট নাম হলেও এটা আসলে ‘সিসাবার’ নামেই স্থানীয়ভাবে ব্যাপক পরিচিত। প্রতিদিন বিকেল পাঁচটা থেকে এখানে তরুণ-তরুণীদের মেলা বসে। দলে দলে তারা সিসাবারে গিয়ে হুক্কা টানে আর নাচানাচি করে। এদের কেউ সোফায় বসে সিসা টানে কেউবা ঘনিষ্ঠভাবে বসে সিসা টানার জন্য বেছে নেয় অন্ধকারাচ্ছন্ন আলাদা কামরা।
‘ইলাউঞ্জ অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট’ নামের সিসাবারটির এমন দৃশ্য দেখা এবং বারটি সম্পর্কে এ সব তথ্য পাওয়া গেল রাজউকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনাকালে। রাজধানীর আবাসিক এলাকা থেকে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান অপসারণে ধারাবাহিক কার্যক্রমের অংশ হিসেবে মঙ্গলবার সিসাবারটিতে অভিযান চালায় মোবাইল কোর্ট। এর নেতৃত্ব দেন রাজউকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এবং ৩ নম্বর অঞ্চলের পরিচালক খন্দকার অলিউর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন রাজউকের আরেক পরিচালক সওদাগর মোস্তাফিজুর রহমান। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) বেশ কয়েকজন পুলিশ সদস্য মোবাইল কোর্টকে সহযোগিতা দেয়। অভিযানের সময় এ প্রতিবেদকও উপস্থিত ছিলেন।
ভবনের লোকজন ছুটে এসে ম্যাজিস্ট্রেটকে রাজউক অনুমোদিত নকশা দেখালে মোবাইল কোর্ট সিদ্ধান্ত নেন, যেহেতু দোকানটির বাণিজ্যিক অনুমোদন রয়েছে, সেহেতু এটাকে সিলগালা করা হবে না। তবে দোকানে ওঠা-নামার সিঁড়িটি নকশা বহির্ভূত। এটা ভেঙে দেওয়া হবে। এ সময় তিনি দোকানের মালিককে তলব করেন।
অনেক সময় অপেক্ষার পরেও সিসাবারের মালিক না আসায় ম্যাজিস্ট্রেট দোকানের সিঁড়ি ভাঙার নির্দেশ দেন। তখন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন মাহবুব কামাল সুজন নামে এক যুবক। তিনি বলেন, দোকানের ট্রেড লাইসেন্স রয়েছে। তবে সিঁড়ির অনুমোদন নেই। সিঁড়িটি অপসারণে তিনি সময় প্রার্থনা করে তিনশ টাকা স্ট্যাম্পে লিখিত মুচলেকা দিলে মোবাইল কোর্ট তা অনুমোদন করেন।
মোবাইল কোর্টের জেরায় মাহবুব কামাল সুজন বলেন, এটা সিসাবার নয়,রেস্টুরেন্ট। এর মালিক পুরনো ঢাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসিবুর রহমান মানিক। আমি তার ছোট ভাই।
জানা গেছে,বর্তমান সময়ে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হুক্কা বা সিসা। তামাক ও আফিমের সঙ্গে কথিত ফলের নির্যাস মিলিয়ে হুক্কা টানা হয়। সিগারেটের চেয়ে বহুগুণ বেশি ক্ষতিকর এই সিসা। সিসা ব্যবহারকারীদের অধিকাংশের বয়স ২৫ বছরের নিচে। এরা হুক্কার পাইপ একে অন্যের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ধূমপান করেন। পানির মধ্যে দিয়ে তামাকের ধোঁয়া সেই পাইপ দিয়ে টেনে নেওয়া হয়। সিগারেটের চাইতে এই হুক্কা ২.৫ গুণ বেশি পরিমাণ নিকোটিন, ১০ গুণ বেশি কার্বন মনোক্সাইড,২৫ গুণ বেশি টার এবং ১২৫ গুণ বেশি ধোঁয়া সরবরাহ করে। একবার সিসা গ্রহণে যে পরিমাণ নিকোটিন গ্রহণ করা হয়, তা ১০০টি সিগারেটের সমপরিমাণ।
গুলশানে সিসার দাম স্বাদভেদে পাঁচশ থেকে এক হাজার টাকা। এ কারণে অনেকে দল বেঁধে এসে সিসা সেবন করেন। এতে খরচও কম পড়ে।
জানা গেছে, গুলশান, বনানী ও ধানমণ্ডিসহ নগরীর বেশ কিছু এলাকায় এ ধরনের সিসাবার রয়েছে দু’শতাধিক। বাইরে থেকে এগুলোকে খাবারের দোকান বলে মনে হলেও লোক দেখাতে সিসাবারে রাখা হয়, বিভিন্ন ধরনের খাবার। সিসাবারের মালিকের ভাই সিসায় কোনও মাদক থাকে না বলে দাবি করেন। কিন্তু গুলশানের অনেকেরই মন্তব্য, মাদক না থাকলে এত ছেলে-মেয়ে এখানে কেন আসে? তবে এর কোনও উত্তর পাওয়া যায়নি।
এদিকে, মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্র জানিয়েছে, সিসাবারের জন্য কোনও লাইসেন্স লাগে না। সিটি করপোরেশনের ট্রেড লাইসেন্স থাকলেই চলে। তবে সন্দেহ হলে তারা নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় মাদক ধরা পড়লে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি সিসাবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
/ওএফ/এবি
আরও পড়ুন
যশোরে রাজনীতিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ পাঁচ নাগরিককে হত্যার হুমকি