দিনটি ছিল অন্যরকম। সকালে হিম হিম আবেশ অতঃপর ঝলমলে রোদ্দুর। এমনই এক ঝরঝরে দিনে বাংলা একাডেমির আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ মিলনায়তনে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে পর্দা উঠলো ঢাকা লিট ফেস্টের ষষ্ঠ আসরের।
কিন্তু অন্যবারের থেকে এবারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি বেশ কিছুটা অন্যরকম। কারণ এবারের অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন ২০০১ সালে সাহিত্যে নোবেলজয়ী ত্রিনিদাদিয়ান লেখক ভি এস নাইপল।
যে কারণে বাংলাদেশের উৎসবসমূহের ভিড়ে এক দারুন স্মৃতি হয়ে ঢাকা লিট ফেস্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। হেমন্তের স্নিগ্ধ সকালে আকাশী শার্টের ওপর ধূসর কোট এবং গাঢ় নীল রঙের প্যান্ট পরে হুইল চেয়ারে বসে স্যার নাইপল যখন মঞ্চে এলেন তখন ঘড়ির কাঁটা বেলা ১২টা পেরিয়ে গেছে। উৎসুক চোখে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে প্রস্তুতি নিলেন ফিতা কাটার।
সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী নাদিরা নাইপল। দু’পাশে চন্দ্রমল্লিকা দিয়ে বাধা লাল রঙের ফিতা দিকে এগিয়ে গেলেন ধীরে। অতঃপর সেটিকে কেটে উদ্বোধন করলেন ঢাকা লিট ফেস্টের। বয়সের ভারে শরীর নুয়ে পড়লেও তার চোখে ছিল তারুণ্যের ঝিলিক। ফ্রেঞ্চ কাটের সাদা দাড়িতে ভরা মুখে রঙিন হাসিতেই বোঝা যাচ্ছিল ঢাকায় এসে তিনি কতটা খুশি।
সেই পরিচয় মিলল তার কণ্ঠেও। ধীরকণ্ঠে বলে উঠলেন, ‘গুড মর্নিং ঢাকা’। তিনি যে রসিক মানুষ সেটার পরিচয়ও দিলেন পরক্ষণেই। বললেন, ‘পারি না। আমি বোধহয় এবারও তাড়াতাড়ি ফিতা কেটে ফেলেছি। ফিতা তো কাটলাম। কিন্তু কেউ আমার কথাগুলো যদি বলে দেয় তাহলে আমি খুশি হব। এখন আমার এমন অবস্থা যে, নিজের কথা নিজেও শুনে বুঝতে পারি না’।
এসময় নাইপলের হয়ে তার লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান অনুষ্ঠানের উপস্থাপিকা।
এভাবেই পর্দা উঠেছে ঢাকা লিট ফেস্টের ষষ্ঠ আসরের। এসময় ভি এস নাইপলের সঙ্গে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান সহ আরও অনেকে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ছিল দুই পর্বে বিভক্ত। প্রথম পর্ব শুরু হয় বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গানের মধ্য দিয়ে। রবীন্দ্রসঙ্গীত পরিবশনায় অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশের রবীন্দ্রসঙ্গীতের অন্যতম সংগঠন ‘সুরের ধারা’। গানের সঙ্গে সঙ্গে নৃত্য পরিবেশন করে সংগঠনটির শিশুশিল্পীরা। এরপর একে একে বক্তৃতা রাখেন অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিবৃন্দ। বিশেষ অতিথির বক্তৃতায় সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ‘বাংলাদেশে এমন একটা অনুষ্ঠান হচ্ছে এটা আমাদের জন্য বড় পাওয়া। আশা করি, অনুষ্ঠানটি বাংলাদেশকে আরও বেশি বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতে সাহায্য করবে।’
এছাড়া তিনি গত বছরের লেখক-প্রকাশকদের ওপর জঙ্গি হামলার দুঃসময় পেরিয়ে এই বছর সুন্দরভাবে উৎসব শুরু হওয়ায় স্বস্তি প্রকাশ করেন।
প্রধান অতিথি বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, ‘প্রথমবারের মত কোনও নোবেলজয়ী আমাদের ঢাকা সাহিত্য উৎসবে এলেন, এটা আমাদের জন্য অনেক বড় পাওয়া। এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আমরা যেমন নিজেদের সংস্কৃতিকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরবো। তেমনি অন্যান্যদের সংস্কৃতির সঙ্গে আমাদের পরিচয়টাও উভয়ের একটা মেলবন্ধন ঘটাবে। ঢাকা লিট ফেস্টের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্য যেমন বিশ্ব দরবারে উপস্থাপিত হচ্ছে, তেমনি ঢাকা ট্রান্সলেশন সেন্টারের মাধ্যমে বাংলাদেশের সাহিত্য অনূদিত হচ্ছে।’
এছাড়া বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান তার বক্তৃতায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে বাংলা একাডেমি আয়োজিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর কথা স্মরণ করেন। এবং ঢাকা লিট ফেস্টের আয়োজনে সন্তুষ্ট হয়ে আয়োজকদের ধন্যবাদ জানান।
আগে থেকেই জানানো হয়েছিল তিন দিনব্যাপী এই উৎসবটিকে মোট ৯০টি পর্বে ভাগ করা হয়েছে। যেখানে বিভিন্ন সেশনে বিভিন্ন ধরনের আয়োজন থাকবে। তবে প্রথমদিনের অনুষ্ঠান ছিল মোট ১৫টি পর্বে বিভক্ত। এসব অনুষ্ঠানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ভি এস নাইপলকে নিয়ে নির্মিত তথ্যচিত্রের প্রদর্শনী। এছাড়াও বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে ছিল সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক স্মরণে নাট্য প্রদর্শনী। তার ‘নীল দংশন’ নাটকটি ‘ব্লু ভেনম’ শিরোনামে ইংরেজি অনুবাদে মঞ্চস্থ হয়। মুক্তিযুদ্ধের ওপর লেখা এই নাটকটির নির্দেশনা দিয়েছেন নায়লা আজাদ নূপুর। এতে অভিনয় করেন আরিফ সৈয়দ ও তারিক আনাম খান।
অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী পর্ব শেষে বেলা ১২টায় একাডেমির বর্ধমান হাউসের সামনে লনে মেহেদি হাসান ও তার বন্ধুরা সঙ্গীত পরিবেশন করে। ঠিক একই সময় কসমিক টেন্টে প্রদর্শিত হয় জয়া আহসান অভিনীত ও ইন্দ্রনীল রয় পরিচালিত চলচ্চিত্র ভালোবাসার শহর সিনেমাটি।
এরপর বেলা ১টায় মূল মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্বসাহিত্য নিয়ে ‘ওয়ার্ল্ড ফিকশন: হিডেন রিয়েলিটি’ শিরোনামের আলোচনা। এতে অংশগ্রহণ করেন ড্যানিয়েল হান, নিকোলাস লেজার্ড, আনজুম হাসান এবং নায়েল এলতোখি।
ঠিক একই সময় কে কে টি স্টেজে ‘ইমাজিনিং হিস্টোরি’ শিরোনামের আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। সাদ জেড হোসাইনের সঞ্চালনায় এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন সাজিয়া ওমর ও বাপ্পাদিত্য চক্রবর্তী।
বেলা ২টায় প্রধান মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্ব ‘আমেরিকা এক্সেপশোনাল নো মোর’ শিরোনামের আমেরিকার বৈশিষ্ট্য বিষয়ক আলোচনা। এতে অংশ নেন ভারতের এনডিটিভির প্রধান সম্পাদক সাংবাদিক বারখা দত্ত, মার্কিন কবি জেফরি ইয়াং বেন জোদাহ ও আরব সাহিত্যের কিউরেটর মার্সিয়া লিন্যাক্স কিউলি।
আর ওই সময়ে দেশের অন্যতম জিন বিজ্ঞানী আবেদ চৌধুরী কে কে টি স্টেজে আলোচনা করেন নিওরো সায়েন্সের অ্যাসথেটিক্স বিষয়ের ওপর।
এ সময় লনে সাম্প্রদায়িকতার এপার ওপার নিয়ে আলোচনা করেন শামসুজ্জামান খান, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কবি জহরসেন মজুমদার, অধ্যাপক মাসুদুজ্জামান, পশ্চিমবঙ্গের প্রাবন্ধিক সেমন্তী ঘোষ ও আহমেদ রেজা। সবাই সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে তাদের দেশের বিভিন্ন সমস্যা এবং এর সমাধান নিয়ে কথা বলেন। তাদের কথায় উঠে আসে বাংলাদেশ ও ভারত সহ সাম্প্রদায়িক বিশ্বের নেপথ্যের থাকা বিভিন্ন কথা।
বেলা সাড়ে ৩টায় বাংলা একাডেমির বর্ধমান হাউজের সামনে লনে অনুষ্ঠিত হয় ভিন্নধর্মী অনুষ্ঠান। ‘সময়ের কবিতা সময়ন্তরের কবিতা শিরোনামের এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেন একঝাঁক বাংলাদেশি কবি। তাদের কবিতা শুনতে সরগরম হয়ে ওঠে বাংলা একাডেমির লন।
আর ঠিক একই সময় ব্র্যাক স্টেজে অভিনয়শিল্পী ইরেশ যাকের আলোচনা করেন ভারতের প্রাবন্ধিক অন্তরা গাঙ্গুলির বই ‘তনয়া তানিয়া’ নিয়ে। এসময় বটতলায় ছিল আবৃত্তি পরিষদের কবিতা আবৃত্তি।
বিকালে মূল মঞ্চে বারখা দত্তের সঙ্গে আলোচনায় বসেন উৎসব পরিচালক সাদাফ সায। আলোচনার বিষয় ছিল বারখা দত্ত রচিত আলোচিত গ্রন্থ ‘দ্য আনকোয়াইট ল্যান্ড’।
একই সময় ভ্রমণপিপাসু অস্টেলিয়ান লেখক টিম কোপ কেকে স্টেজে আলোচনায় বসেন তার লেখা ‘জার্নি অ্যান্ড কোয়েস্ট অব ইন ট্রুথ’ বইটি নিয়ে। একই সময় পুলিৎজার বিজয়ী ভারতীয় বংশোদ্ভূত কবি বিজয় শেষাদ্রি আমেরিকার কবিতা নিয়ে ব্র্যাক স্টেজে আলোচনা করেন জেফরি ইয়াংয়ের সঙ্গে বসেন । এছাড়া এই সময় রিচার্ড বিয়ার্ড লাইভ এডিটিংয়ের ওপর কসমিক টেন্টে তরুণদের নিয়ে বিশেষ ওয়ার্কশপ পরিচালনা করেন।
সন্ধ্যা নামার পরপর সবাই একে একে হাজির হয় মূল মঞ্চে। সন্ধ্যা সোয়া ৬টায় মূল মঞ্চে প্রয়াত সব্যসাচী সাহিত্যিক সৈয়দ শামসুল হকের জীবনী নিয়ে আলোচনা করেন তার ছেলে দ্বিতীয় সৈয়দ হক, কবি সাজ্জাদ শরীফ, সাহিত্যিক আহমাদ মাযহার ও পারভেজ হোসেন। এই অনুষ্ঠান চলে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। এসময় একসঙ্গে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চের বটতলায় অনুষ্ঠিত হয় বাউল সংগীত। বাংলা সংস্কৃতির প্রায় তিনশ বছর ধরে চলে আসা এই বাউলগানে অংশগ্রহণ করেন দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা বেশ কয়েকজন বাউলশিল্পী। তাদের সুরে উৎসবে আসা দর্শকেরা ভিন্ন এক আলোড়নে ডুবে যায়। আর এই বাউল সংগীতের মাধ্যমেই ইতি ঘটে ঢাকা লিট ফেস্টের প্রথম দিনের । তবে সবমিলিয়ে নোবেলজয়ী নাইপল আলোয় নতুন এক যাত্রা শুরু করলো ঢাকা লিট ফেস্ট। যে কারণে উদ্বোধনী দিনে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল চোখে পড়ার মতো।
আগামীকাল শুক্রবার উৎসবের দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি সকাল নয়টায় ‘স্প্রিচুপাল সংস’ শিরোনামের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে শুরু হলেও আগামিকালের মূল পর্ব শুরু হবে সকাল ১০টায়। তিন দিনের এই সাহিত্য উৎসব চলবে ১৯ নভেম্বর পর্যন্ত।
সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায়, বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে আয়োজিত এবারের এই উৎসবে অংশ নিচ্ছেন ৬০টি দেশের প্রায় দুশতাধিক শিল্পী, সাহিত্যিক, লেখক, গবেষক, সাংবাদিকসহ আরও অনেকে।
২০১৬ সালের ম্যান বুকার পুরস্কার বিজয়ী ও ২০১৪ সালে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন প্রাইজ ফর লিটারেচার ইভ উইল্ড জয়ী ডেবোরাহ স্মিথ, উত্তর কোরিয়ার লেখক হাইয়েনসিও লিসহ নেপাল, ভুটানসহ অনেক দেশের সাহিত্যিকরা থাকছেন এবারের লিট ফেস্টের আকর্ষণ হিসেবে।
/এইচকে/