শুক্রবার ঢাকা লিট ফেস্টের দ্বিতীয় দিন ‘বাংলার টিকে থাকা: আজ, কাল, পরশু’ শীর্ষক সেশন অনুষ্ঠিত হয়। আলোচকরা হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক মানস চৌধুরী, কলকাতার চলচ্চিত্র পরিচালক ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরী, লেখক ও বুদ্ধিজীবী আহমদ মোস্তফা কামাল এবং প্রাবন্ধিক ফিরোজ আহমেদ। প্রাণবন্ত আলোচনায় চার আলোচক চেষ্টা করেছেন বাংলা ভাষার অস্তিত্ব সংকটের একেবারে শেকড়ে পৌছাতে, প্রশ্ন তুলেছেন এমন কোন্ও সংকট আসলেই আছে কিনা।
আলোচক ফিরোজ আহমেদ বলেন, ‘বাংলা নিয়ে উদ্বেগের অবকাশ অবশ্যই আছে। সাধারণ মানুষের মুখের ভাষা হিসেবে বাংলা টিকে থাকবে। কিন্তু ক্ষমতার জায়গাগুলোতে বাংলার অবস্থান দুর্বল। বিশেষ করে দেশের সাংস্কৃতিক অভিজাত যারা আছেন, তারা ভাবেন বাংলা ছাড়া্ই তাদের চলে। অন্যদিকে তৃণমূলের মানুষ আবার তাদের অনুসরণের চেষ্টা করেন। যেসব দেশে উচ্চশিক্ষা, জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং শিল্প-সাহিত্যের মতো উচ্চ সংস্কৃতির চর্চা বিদেশি ভাষায় হয়, সেসব দেশেই মাতৃভাষা এমন সংকটে পড়ে।
ইন্দ্রনীল রায়চৌধুরীর মতে, বাংলা নিয়ে উদ্বেগের ধরন কলকাতায় এবং বাংলাদেশে আলাদা। আমি কলকাতার বাসে তরুণ-তরুণীদের হিন্দি ভাষায় প্রেম করতে দেখি। অর্থাৎ প্রেমের ভাষা হয়েছে হিন্দি। বাংলা ছবির বাজার কমছে দিন দিন। কলকাতার অধিবাসীরা এখন ভাবেন সারা ভারতবর্ষে যোগাযোগের জন্য দরকার হিন্দি। আর ভালো চাকরির জন্য দরকার ইংরেজি। তাহলে বাংলা দিয়ে করবোটা কী?অর্থাৎ বাংলাকে টিকিয়ে রাখতে হলে বাজারের নিরিখে ভাবতে হবে। ভাষার সঙ্গে বাজারের যোগাযোগ করতে হবে। আর বাংলার পক্ষ হয়ে লড়াই চালাতে দুই বাংলার একটা যৌথ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে।
মানস চৌধুরী অবশ্য ভাষার সংকটের প্রশ্নটি একটু সন্দেহের দৃষ্টিকোণ থেকেই নিলেন। তার মতে, ‘ষাটের দশকেও কিন্তু এখানকার সাংস্কৃতিক অভিজাতদের নৈকট্যের ভাষা ছিল বাংলা। নব্বইয়ের পর থেকে উচ্চ-মধ্যবিত্ত ইংরেজিতে ঝুঁকছেন। ভাষার মৃত্যুঘণ্টার বিলাপ কলকাতায় যতটা জাগরুক, এই বাংলায় ততটা নয়। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ঔপনিবেশিক শাসকের প্রিয়পাত্র ছিল বাঙালিরা। এখন ক্ষমতার কেন্দ্র বাংলা থেকে দিল্লিতে সরে গেছে। ভাষার বিলাপটা কি প্রকারান্তরে সেই হারানো ক্ষমতার জন্যই বিলাপ?’
ভাষা প্রশ্নে ততটা উদ্বিগ্ন নন আহমদ মোস্তফা কামাল। তার ভাষায়, ‘যাদের প্রতিদিনকার ভাষা বাংলা, তার জন্য বাংলা বিলোপের কোনো উদ্বেগ নেই। আবার যার বাংলার দরকার নেই, বাংলা নিয়ে উদ্বেগ নেই তারও। তাহলে এই উদ্বেগটা কি চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে কি না, তা ভাবা যেতে পারে।’ এছাড়া রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে বাংলা সাহিত্যকে অনুবাদের মাধ্যমে বিশ্ব বাজারে ছড়িয়ে দেয়ার ওপরে গুরুত্ব দেন তিনি।
/এনএ/