২০১৬ সালের আজকের দিনে (৩০ জানুয়ারি) আবুল বাজানদার ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে। এরপর কেটেছে দীর্ঘ এক বছর। এই এক বছরে তার জীবনে ঘটেছে বিশাল পরির্বতন। হতাশাভরা জীবনকে পেছনে ফেলে তিনি এখন দেখছেন নতুন জীবনের স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখছে তার পরিবারও। জীবনটা যে এভাবে বদলে যাবে, তা কল্পনাও করতে পারেননি ‘বৃক্ষমানব’ নামে পরিচিত বাজানদার।
বাংলাদেশে বাজানদারই এই রোগের প্রথম রোগী, আর বিশ্বে তৃতীয়। তার চিকিৎসার পুরো খরচ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল বহন করছে। ১৫ বছর বয়সে বাজানদারের হাতে ও পায়ে গাছের শেকড়ের মতো মাংসপিণ্ড তৈরি হয়। যে কারণে তিনি পরিচিতি পান ‘বৃক্ষমানব’ হিসেবে।
ঢাকা মেডিক্যালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত বাজানদারের দুই হাত এবং দুই পায়ে মোট ১৮ বার অস্ত্রোপচার করে সাফল্যের সঙ্গে মাংসপিণ্ডগুলো অপসারণ করা হয়েছে। বার্ন ইউনিট সূত্রে জানা গেছে, তার হাতে-পায়ে আর চার কিংবা পাঁচটি অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন।
খুলনা থেকে আসা বাজানদারকে সুস্থ করে তুলতে পেরে আনন্দিত ডা. সামন্ত লাল সেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘গত বছর আজকের দিনে বাজানদার যখন আমার রুমে এসেছিল, তখন এক অসহায় তরুণকে দেখেছিলাম। সেদিন সে আর তার মা চারদিকে তাকাচ্ছিল আর কাঁদছিল। তার সামনে ছিল অনিশ্চয়তা, অন্ধকার ভবিষ্যত। সে কোনও ভরসা পাচ্ছিল না। এখানে কোথায় থাকবে, কত টাকা খরচ হবে, টাকা কোথায় পাবে- এসব বারবার বলছিল। এরপর আমরা তাকে বার্ন ইউনিটে ভর্তি করিয়ে বললাম যে, তুমি এখানে থাকবে এবং তোমার সব খরচ সরকার বহন করবে। তখন সে কিছুটা ভরসা পায়, তার চিকিৎসা শুরু হয়। আর তারপর তো ইতিহাস।’
বাজানদারের হাত-পায়ের অপসারিত মাংসপিণ্ডগুলো ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এখন পর্যন্ত সেগুলো ফিরে আসার সম্ভাবনা আমরা দেখতে পাচ্ছি না।’
সরেজমিনে দেখা যায়, বাজানদার এখন একজন স্বাভাবিক মানুষের মতোই হাত দিয়ে কলম ধরতে পারেন। নিজ হাতে ধরে পত্রিকা পড়া এবং একমাত্র মেয়েকে কোলেও নিতে পারেন। বাজানদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক বছর আগেও হাত ছিল ভারী, কিছু ধরতে পারতাম না, নিজে নিজে চলাফেরাও করতে পারতাম না। কিন্তু সময় বদলে গেছে, এক বছর আগের বাজানদারের সঙ্গে আজকের বাজানদারের বিস্তর ফারাক।’
বাজানদারের চোখে এখন একমাত্র মেয়েকে চিকিৎসক বানানোর স্বপ্ন। মেয়ে চিকিৎসক হয়ে তার মতো অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াবে, তাদের সেবা করবে এটাই তার জীবনের একমাত্র ব্রত। তিনি বলেন, ‘আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়, পৃথিবীর কোনও কিছুর সঙ্গে এর তুলনা হয় না। যারা আমাকে আজকের জীবন দিয়েছেন, তাদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই, সবাইকে আমার সালাম জানাই।’
বাজানদারের দিন কাটছে বার্ন ইউনিটের পাঁচ তলার একটি কেবিনে। সেখানে তার সব সময়ের সঙ্গী স্ত্রী হালিমা খাতুন এবং সাড়ে তিন বছরের মেয়ে তাহিরা। বাজানদার জানান, গত বছর ঈদের দিনে তিনি এই কেবিনের বাইরে গিয়েছেন, নতুন পোশাক পরে ঘুরেছেন স্ত্রী-সন্তানকে নিয়ে। সেরে ওঠার জন্য সার্বক্ষণিক সঙ্গী কাজী বাহারের কাছে কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বাজানদার বলেন, ‘বাহার ভাই না থাকলে আমাদের দিন কাটানো খুব কষ্টের হতো।’ প্রবাসী সাংবাদিক ফজলুল বারী সহ এক বছর ধরে যারা পাশে ছিলেন, তাদের সবার কাছেও তিনি কৃতজ্ঞ।
বিরল রোগে আক্রান্ত হওয়ার পর রিকশা চালানো ছেড়ে দিতে বাধ্য হওয়া বাজানদারের ইচ্ছা, বাড়ি ফিরে একটি চালের দোকান দেওয়ার। চিকিৎসক কবীর চৌধুরীর দেওয়া জমিতে একটি বাসা বানাতেও চান তিনি। বাড়ি ফেরার আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে কৃতজ্ঞতাও জানাতে চান ‘বৃক্ষমানব’ আবুল বাজানদার।
/এএআর/আপ-এমও/