‘শহরটাকে নিজের মনে করতে হবে’

রাস্তা ও পার্ক ইস্যুতে আয়োজিত বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকীতে অতিথিরাজনবিচ্ছিন্ন পরিকল্পনা না করে, জনসম্পৃক্ত পরিকল্পনার মধ্যদিয়ে সমাজকে সঙ্গে নিয়েই বাসযোগ্য ঢাকা গড়ে তুলতে হবে।বিনোদন কেন্দ্র হিসেবে উন্মুক্ত মাঠ ও দখলমুক্ত পার্ক যেমন চান, তেমনই সেই জায়গাগুলো রক্ষায় নাগরিকেরও সুনাগরিক হয়ে ওঠার দরকার আছে। ইতোমধ্যে ঢাকায় পার্কগুলো দখলমুক্ত করা সম্ভব হলেও সেগুলো ঠিক কতদিন দখলমুক্ত থাকবে,তা নিয়ে শঙ্কাও আছে ষোলআনা। আজ  (শনিবার) বাংলা ট্রিবিউন আয়োজিত বৈঠকিতে বক্তারা এসব কথা বলেন।

তারা বলেন, পাবলিক স্পেসগুলোকে নানা কায়দায় দখল করে রাখার পেছনে ক্ষমতাসীন দলের কর্মীরাই জড়িত থাকেন। আর  ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন বলেছেন, ‘খাল দখলমুক্ত করেছি, মুক্ত রাখবোই। যতদিন নাগরিক আবর্জনা ফেলার বিন ব্যবহার করতে শিখবে না, চুরি করে নিয়ে যাবে, ততদিন বারবার লাগানো হবে। একদিন এর ব্যবহার শিখবেই।’ মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘এই শহর একা মেয়র বা কিছু কর্মকর্তা,কর্মচারীর না। শহরটাকে নিজের মনে করতে হবে।’

 

মেয়র সাঈদ খোকনক্ষমতাসীনদের মাধ্যমে পার্ক-মাঠ দখল করে বাজার-হাট বসানোর অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে মেয়র বলেন, ‘বিভিন্ন সময় ক্ষমতা বদল হয়। এদের বদল হয় না। যখন যে দল আসে, এরা তাদের সঙ্গে মিশে যায়। এরা নির্দিষ্ট দলের হয় না। মনে রাখবেন, আমরা যে বিষয়ে লক্ষ্য নির্ধারণ করছি সেটি থেকে পিছিয়ে আসার কোনও নজির নেই।’

ত্রিমোহনী খাল উদ্ধারে গিয়ে খালের মধ্যে জেলা প্রশাসনের মার্কেট বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা সেটিকে বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে ফেলেছি।’ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে কাজ করার কথা উল্লেখ করে মেয়র সাঈদ খোকন বলেন, ‘এই শহর একা মেয়র বা কিছু কর্মকর্তা, কর্মচারীর না। শহরটাকে নিজের মনে করতে হবে।’

 

অধ্যাপক গোলাম রহমানজাতীয় তথ্য কমিশনের চেয়ারম্যান গোলাম রহমান আলোচনায় বলেন, ‘কেবল আদর্শিক পরিকল্পনা নয়, ঢাকাকে বাসযোগ্য করতে হলে পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবমুখী। ঢাকায় যে জনস্রোত এবং প্রতিদিন সেই স্রোতকে কেন্দ্র করে শহরের যে স্বাভাবিক বৃদ্ধি, সেটিকে অস্বীকার করা যাবে না।’ পার্ক আর মাঠের মধ্যে কোনও পার্থক্য থাকবে না, এমন পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে মেয়র উল্লেখ করলে গোলাম রহমান বলেন, ‘যেখানে খেলবে সেখানেই শিশুরা ঘুরে বেড়াবে, এটা বেশি চাওয়া হয়ে যাচ্ছে কিনা বিবেচনায় নেওয়া দরকার।’

 

সরকার ফিরোজধানমন্ডিকে ষাটের দশকের ধানমন্ডিতে ফেরানোর উদ্যোগ নিতে হলে সার্বিকভাবে আমাদের কাজ করতে হবে এবং এর মাধ্যমে সবুজের রাজধানী নিশ্চিত করা যাবে বলে মনে করেন এটিএন নিউজ এর সিইও এবং ধানমন্ডি বাঁচাও আন্দোলনের সরকার ফিরোজ। তিনি বলেন, ‘রাজধানীর নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলেরই দায়িত্ব এটি একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু পরিকল্পনার অভাব ও বাস্তবতা বিবর্জিত উদ্যোগের কারণে আমাদের সবুজ হারিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত ‘ তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকার যানজট ত্রিশ শতাংশ এখনই কমিয়ে ফেলা যায়, যদি সাধারণ আইনগুলো গাড়ির মালিকেরা মেনে চলেন।’

 

ড. আইনুন নিশাতঢাকার অনেক সর্বনাশ ইতোমধ্যে হয়ে গেছে উল্লেখ করে  ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর অ্যা্মেরিটাস ড. আইনুন নিশাত বৈঠকিতে বলেন, ‘আমরা যারা ঢাকাকে আগের অবস্থায় ফিরে যেতে হবে দাবি করি, তাদের মনে রাখতে হবে, সেটি আর সম্ভব না। পার্কগুলোকে দোকান করা হয়েছে। পুরো ঢাকা শহর বাজারের শহর ‘ মেয়রদের কাজের উদ্যোগগুলোকে স্বাগত জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ‘পরিকল্পনা হতে হবে বাস্তবসম্মত এবং জনসম্পৃক্ত। তা না হলে বাস্তবায়নের জায়গায় ঘাটতি থেকে যায় ‘

ড. কাজী আনিস আহমেদ

বাংলা ট্রিবিউনের প্রকাশক ড. কাজী আনিস আহমেদ মন করেন, বাসযোগ্য নগরায়ণের পরিকল্পনায় আবাসিক-বাণিজ্যিক এলাকা সঠিক অনুপাতে থাকা জরুরি। এর মিশ্রণটি সঠিকভাবে হলে সমস্যা কমে আসবে। খেয়াল করে দেখা জরুরি পৃথিবীর কোনও দেশে এখন আর কেবল আবাসিক বা কেবল বাণিজ্যিক ধারণা নেই।' বিশ্বের কোথাও এখন আর কেবল আবাসিক বা কেবল বাণিজ্যিক এলাকা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এই ধারণায় এক ধরনের মিশ্রণ ঘটেছে।’

ধানমণ্ডি লেকের সৌন্দর্য বর্ধন করতে গিয়ে কী ধরনের বিপত্তি ঘটেছে সে আলোচনায় তিনি বলেন,  ‘৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার প্রথম সৌন্দর্য রক্ষার কাজ শুরু করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দ্বিতীয় পর্যায়ের সৌন্দর্য রক্ষার কাজ করতে গিয়ে প্রকৌশলীরা লেকের পাড়ে খোলা জায়গায় প্রজাপতির জন্য জায়গা করা হবে ঘোষণা দেন। একটা উন্মুক্ত জায়গাকে নষ্ট করতে এ ধরনের স্থাপনা যথেষ্ট ।’

শহীদুল আলম

সরকারের দখলদারিত্বের উদাহরণকেও বিবেচনায় নিতে হবে উল্লেখ করে আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, ‘রাজধানীর বেশকিছু রাস্তা চিরস্থায়ীভাবে বন্ধ করে রাখতে দেখা যায়। রাজধানীর মধ্যে সেনানিবাস ও পিলখানার মতো বড় এলাকা, যার মধ্যে সাধারণ নাগরিকের চলাচলের সুযোগ নেই। এগুলো শুরুতে ঢাকার মধ্যে ছিল না, এখন এটি ঢাকার মধ্যে পড়ে যাওয়ায় এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ।’

রফিক আজম

স্থপতি রফিক আজম পার্কগুলোতে গবেষণা করে দেখেছেন দখলমুক্ত হওয়ার পর কেমন পরিবেশ চান নাগরিকেরা এবং সে অনুযায়ী ঢাকার পার্ক সাজানো হবে  উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘পার্কগুলোর চারপাশে দেয়াল- গ্রিল তুলে দিয়ে আমরা সুরক্ষিত করতে চাইলে শহরের মানুষ সেটি প্রত্যাখ্যান করেছে।  গ্রিল করলে সেটাকে ঘিরে দোকান ওঠে। ফলে আমাদের গবেষণা থেকে বুঝা যাচ্ছে, পার্কের মধ্যে ঝোপঝাড় অন্ধকার রাখা যাবে না।

জাহিদ হাসান

আমাদের চেনাজানা পরিসরে কোনটি আবাসিক, কোনটি বাণিজ্যিক এলাকা এই চিহ্ন উঠে গেছে। আগে আমরা রাস্তায় আ/এ লেখা দেখতাম মানে আবাসিকএলাকা। এখন আর আবাসিক ও বাণিজ্যে বিভাজন নেই।  বৈঠকিতে অভিনয় শিল্পী জাহিদ হাসান এসব কথা বলার পাশাপাশি ছোট ছোট স্থাপনা তৈরি করে ক্লাবের নামে পার্ক দখলের যে উৎসব চলে তার সমালোচনা করেন।

কামরুল ইসলাম

রাজধানীতে যে পরিমাণ মানুষ বাস করে তাদের তুলনায় পার্ক বা খেলার মাঠ নেই, এটি এখন নতুন কোনও কথা নয় বলে সাংবাদিক কামরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের রাস্তা বা পার্কের যে হিসেব সেটি আমাদের জনগণের অংকের সঙ্গে মেলানো মুশকিল। ঢাকা জনবহুল নগরী হওয়ায় এর যেকোনও পরিকল্পনা বাস্তবায়ন যথেষ্ট কষ্টসাধ্য। তবে আমরা আদৌ ঢাকাকে বাসযোগ্য নগরী হিসেবে দেখতে চাই কিনা সেটি আগে স্পষ্ট করতে হবে।

মিথিলা ফারজানা

মিথিলা ফারজানার উপস্থাপনায় বাংলা ট্রিবিউনের আয়োজিত এ বৈঠকিতে বক্তারা বলেন, বাংলাদেশ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ। ফলে যে পরিমান জায়গা আমাদের আছে সেখানে এদেশকে অন্যদেশের সঙ্গে তুলনা করার সুযোগ নেই।যে ফাঁকা জায়গাগুলো আছে সেগুলোর সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে পারাটাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।

ছবি: নাসিরুল ইসলাম

/ইউআই/ এপিএইচ/