ঈশ্বরগঞ্জে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদের ইমাম মোস্তাফিজুর রহমানের ওপর হামলার ঘটনায় কোনও জঙ্গি সংশ্লিষ্টতা পায়নি পুলিশ। তদন্ত কর্মকর্তার দাবি, এরা কোনও জঙ্গি সংগঠনের না হলেও জঙ্গিবাদকে আদর্শ হিসেবে নিয়ে এই হামলা চালিয়েছে। তিন হামলাকারীর মধ্যে দুই হামলাকারী আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও তাই বলেছে। তবে এখনও এক হামলাকারীকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।
গত ৮ মে রাতে ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জের সরিষা ইউনিয়নের কানপুর গাংপাড়া গ্রামের আহমদিয়া মসজিদের ইমাম আহত মোস্তাফিজুর রহমানের ওপর হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। ঘটনার সময় স্থানীয়রা দ্রুত টের পাওয়ায় এক হামলাকারীকে আটক করে পুলিশে দেয়। আহত অবস্থায় ইমামকে প্রথমে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে নেওয়া হয়। ওইদিন রাতেই তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। এই ঘটনার পরদিন ৯ মে আহমাদিয়া সম্প্রদায়ের মুখপাত্র হাজারী আল মুনির বাদী হয়ে মামলা করেন। ময়মনসিংহ জেলা গোয়েন্দা পুলিশ মামলাটি তদন্ত করছে।
ময়মনসিংহের গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, হামলায় তিনজন অংশ নেয়। তারা হলো, আব্দুল আহাদ মোহাম্মদ উল্লাহ, জহিরুল ইসলাম ও ইলিয়াস উদ্দিন। এদের মধ্যে ঘটনার দিনই গ্রেফতার করা হয় আহাদকে। ২২ মে গ্রেফতার করা হয় জহিরুল ইসলামকে। এরা দুজনেই দোষ স্বীকার করে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। তাদের দুজনকেই কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে এখনও পলাতক ইলিয়াস হোসেন।’
পুলিশ জানায়, ‘তারা তিনজনই ঈশ্বরগঞ্জ কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। সেখানে তারা পড়ালেখা কার অবস্থায় গাংপাড়া গ্রামের আহমদিয়া মসজিদের ইমামের কর্মকাণ্ডের বিষয়ে খবর পায়। প্রকাশ্যে তারা কয়েকবার ইমাম মোস্তাফিজকে হুমকি দেয়। তারপরও ইমাম তাদের কথা না শোনায় তারা ভিন্ন পরিকল্পনা করে। প্রথমে তারা ইমামের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। এরপর তার কাছে বয়ান শোনার জন্য নিয়মিত আসতে থাকে। তখন ইমাম তাদের বিশ্বাস করতে শুরু করেন। তিনি মনে করছেন, আহমদিয়া মতবাদ গ্রহণে তাদের আগ্রহ রয়েছে। বিশ্বস্ততা জন্মানোর পর ঘটনার তিনদিন আগে তারা কামারের দোকানে গিয়ে একটি চাপাতি, চায়নিজ কুড়াল তৈরি করে। এরপর ৮ মে রাতে তারা আহমদিয়া সম্প্রদায়ের বই-পুস্তক নেওয়ার কথা বলে বাড়িতে এসে ইমামকে ডাকাডাকি শুরু করে। ইমাম তাদের বিশ্বাস করে বাসা থেকে বের হয়ে তাদের নিয়ে মসজিদের দিকে যায়। মসজিদের দরজা খুলে ইমাম যখন লাইট জ্বালানোর জন্য সুইচ অন করছিলেন, তখন আহাদ চায়নিজ কুড়াল দিয়ে ইমামকে একাধিক আঘাত করে। তার চিৎকার শুনে বাড়ি থেকে নারীরা বের হয়ে আসে। আশেপাশের লোকজনও আসেন। এসময় অন্ধকারে অপর এক জঙ্গির কোপে আহত হয় আহাদ। তখন আহমদিয়া সম্প্রদায়ের নারীরা তাকে ধরে ফেলে। অনেক লোকজন আসায় আহাদ পালাতে পারেনি। তবে অপর দুই হামলাকারী জহিরুল ও ইলিয়াস পালিয়ে যায়।’
মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশের পরিদর্শক ইমারত হোসেন গাজী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তদন্তে কোনও জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা পাইনি। হামলাকারীরা নিজেরাই জঙ্গিবাদকে আদর্শ হিসাবে মনে করে এই হামলা চালিয়েছে বলে তারা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে। গত ২১শে মে আদালতে প্রথম স্বীকারোক্তি দেয় আহাদ। এরপর ২৪ মে জহিরুল ইসলাম স্বীকারোক্তি দেয়।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের তদন্তে কোনও জঙ্গি সংগঠনের সংশ্লিষ্টতা পাইনি। তবে হামলাকারীরা জঙ্গিবাদের কার্যক্রমকে আদর্শিক মনে করে। সেভাবেই তারা হামলা করতে চেয়েছে। ঘটনার তিন থেকে চার মাস আগে থেকেই তাদের এই পরিকল্পনা।’
হামলাকারী আহাদ নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দার চারিয়া গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। সে গত ১ বছর ধরে ইসলামপুর দারুস সুন্নাত জাফরিয়া মাদ্রাসায় লেখাপড়া করছে। তারা ৫ ভাই ও ৫ বোন। সে এর আগে চট্টগ্রামের মেকল মাদ্রাসায় ১ বছর লেখাপড়া করেছে। অপর দুই হামলাকারীও ইসলামপুর দারুস সুন্নাত জাফরিয়া কওমী মাদ্রাসার শিক্ষার্থী। এদের মধ্যে জহিরুল ইসলামের গ্রামের বাড়ি ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার মাঝিয়াকান্দি গ্রামে। তার বাবার নাম জসিম উদ্দিন। মামলার অপর আসামি ইলিয়াসকে এখনও গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। তবে তার নাম ঠিকানা পেয়েছে। তাকে গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত কর্মকর্তা ইমারত হোসেন গাজী বলেন, ‘দুজনের স্বীকারোক্তিতে বিষয়টি পরিষ্কার। অপর আসামিকে গ্রেফতারের জন্য আমাদের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। তাকে গ্রেফতারের জন্য একাধিকবার অভিযান চালানো হয়েছে। তবে এখনও তাকে পাওয়া যায়নি।’
এদিকে জঙ্গিরা সাংগঠনিকভাবে সংগঠিত ছাড়াও নাশকতা, হামলা করতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক বিগ্রেডিয়ার জেনারেল (অব) এম সাখাওয়াত হোসেন জানান, বর্তমান ইন্টারনেটের যুগে যে কেউ যেকোনোভাবে মোটিভেটেড হতে পারে। বোমা বানানো থেকে শুরু করে গলা কাটার সবকিছুই অনলাইনে রয়েছে। জঙ্গিবাদের প্রচার, প্রকাশও রয়েছে। এসব থেকে কেউ উজ্জীবিত হয়ে হামলা চালাতে পারে। এটা হচ্ছে আদর্শিক লড়াই। জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। যাতে কেউ অপপ্রচার বা ভুল ব্যাখ্যাকে আদর্শ মনে না করে।’
/এআরআর/টিএন/