১৫ জানুয়ারির মধ্যে শিশু আইন সংশোধনের নির্দেশ

হাইকোর্টশিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলার আসামি প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার বিচার কোন আইনে বা কোন আদালতে হবে, সে বিষয়টি স্পষ্ট করে শিশু আইন- ২০১৩ সংশোধন করতে নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে আগামী ১৫ জানুয়ারির মধ্যে এ আইনটি সংশোধনের নির্দেশ দেন আদালত। রবিবার (১২ নভেম্বর) আইন ও সমাজকল্যাণ সচিবের ব্যাখ্যা দাখিলের পর বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি সহিদুল করিমের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের দ্বৈত বেঞ্চ এ আদেশ দেন।
আদালতে সমাজকল্যাণ সচিবের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার আশিকুর রহমান, রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ফরহাদ আহমেদ ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ইউসুফ মাহবুব মোর্শেদ।
এর আগে, পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী আদালতে উপস্থিত হয়ে নিজেদের ব্যাখ্যা দাখিল করেন মন্ত্রণালয়ের আইন প্রণয়ন ও সংসদ (লেজিসলেটিভ ও ড্রাফটিং) বিভাগের সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক ও সমাজকল্যাণ সচিব জিল্লার রহমান।
আদালতের আদেশের পর আইন মন্ত্রণালয়ের আইন প্রণয়ন ও সংসদ বিষয়ক বিভাগের (ড্রাফটিং উইং) সচিব মোহাম্মদ শহিদুল হক আদালতকে বলেন, আদালতের বেধে দেওয়া সময়ের মধ্যেই আইন সংশোধনের কাজ শেষ করতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।
এসময় আদালত বলেন, শিশু আদালত এখন বয়স্কদের আদালতে পরিণত হয়েছে। ভিকটিম শিশু, অথচ বিচার হচ্ছে প্রাপ্তবয়স্কদের। আমাদের প্রত্যাশা, আইনের অস্পষ্টতা দূর হবে। আদালত জানতে চান, ‘আইনের অস্পষ্টতা দূর করতে সমস্যা কোথায়? আইনটি কেন সংশোধন করা হচ্ছে না?’
আদালত বলেন, ‘আমরা দেখছি, শুধুই চিঠি চালাচালি হচ্ছে। আমাদের আশা— তারা দ্রুত বাস্তবভিত্তিক পদক্ষেপ নেবে। এ কারণেই তাদের ডাকা হয়েছে।’
এসময় সচিব শহিদুল হক বলেন, ‘আইন সংশোধনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তবে আরও আগেই আইন সংশোধন হলে ভালো হতো। তা হয়নি বলে দুঃখপ্রকাশ করছি।’
সচিব আরও বলেন, ‘মূলত আইনের ১৭ নম্বর ধারাতেই সমস্যা। এটা স্পষ্ট হওয়া দরকার। সারাদেশে আরও ৪১টি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল স্থাপনের কাজ চলছে। শিশুদের মামলা এসব ট্রাইব্যুনালে পাঠানোর আদেশের দিতে পারেন আদালত। তাছাড়া কোনও মামলা কোন পর্যায়ে কোন আদালতে যাবে, তার একটা নির্দেশনা দিতে পারেন আদালত।’
আদালত বলেন, ‘আইন কিভাবে সংশোধন হবে, তা নির্ধারণ করা আমাদের কাজ নয়। আইন প্রণেতাদের ভূমিকায় আমরা যেতে পারি না।’
এসময় সচিব সহিদুল হক বলেন, ‘আইন সংশোধনের জন্য দুই মাস সময় দরকার।’ এরপর সমাজকল্যাণ সচিব বলেন, ‘আমরা আইন সংশোধনের একটি খসড়া ভেটিংয়ের জন্য গত ৭ মে পাঠিয়েছি আইন মন্ত্রণালয়ে। এখনও সেটা ফেরত আসেনি। আমাদের কাছে ফেরত আসার পর সাত দিনের মধ্যেই এটা চূড়ান্ত করতে পারব।’
এরপর আদালত এই আইন সংশোধনের জন্য আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় বেধে দিয়ে আদেশ দেন।
এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘কোনও অপরাধী যদি শিশু হয়, তাহলে তার মামলা শিশু আদালতে পাঠাতে পারেন।’ আদালত বলেন, ‘নতুন কোনও বিশেষ আইন হলে সে আইনের মামলা বিচারের আগে বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা, আইনজীবী— সবার প্রশিক্ষণ প্রয়োজন।’
পরে রাষ্ট্রপক্ষের আরেক আইনজীবী ফরহাদ আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আজ (রবিবার) আদালত দুই সচিবকে ডেকেছিলেন শিশু আইন সংশোধনে অগ্রগতি জানার জন্য। সচিবরাও তাদের কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানিয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘এর আগে এক বাকপ্রতিবন্ধী শিশু (১৫) ধর্ষণের ঘটনায় একটি ফৌজদারি মামলা হয়। মামলার আসামীর বয়স ছিল ৫২ বছর। শিশু আইন অনুযায়ী মামলাটি শিশু আদালতে বিচার হয়। কিন্তু হাইকোর্টের ভাষ্য, শিশু আইনে শুধুমাত্র শিশু অপরাধীদের বিচার হবে। শিশুদের ক্ষেত্রে সংগঠিত অপরাধের অপরাধী প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার বিচার শিশু আইনে করা যাবে না। তাই আদালত শিশু আইন থেকে এই সাংঘর্ষিক বিষয়টি বাদ দিয়ে আইনটি সংশোধন করতে বলেছেন।’
এর আগে, শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় আসামী প্রাপ্তবয়স্ক হলে তার বিচার কোন আইনে বা কোন আদালতে হবে, সে বিষয়ে গত বছরের ১৪ আগস্ট তিন সচিবের কাছে ব্যাখ্যা চান হাইকোর্ট। গত বছরের ৭ সেপ্টেম্বরের মধ্যে তাদের ব্যাখ্যা দিতে বলা হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কেউই ব্যাখ্যা দাখিল করেননি। এ কারণে ওই বছরের ৩১ অক্টোবর তাদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে রুল জারি হয়।
এরপর ওই বছরের ডিসেম্বরে সচিবরা আদালতে হাজির হয়ে শিশু আইন-২০১৩ সংশোধনের মাধ্যমে আইনের অস্পষ্টতা দূর করার কথা জানান। তবে শিশু আইন সংশোধন করতে প্রায় ১০ মাস আগের দেওয়া নির্দেশ কার্যকর না করায় এ বিষয়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে আইন ও সমাজকল্যাণ সচিবকে নির্দেশ দেন হাইকোর্ট।