শিক্ষকরা বলছেন, গবেষণা করতে প্রয়োজনীয় কেমিক্যালসহ অন্যান্য যেসব যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয় তা অনেকটাই দুর্লভ। এছাড়া তথ্য সংগ্রহে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছুটতে হয় প্রতিনিয়ত। কিন্তু এমন গবেষণা সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) মাধ্যমে সরকারিভাবে যে বরাদ্দ দেওয়া হয় তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এমন কম বরাদ্দের কারণে গবেষণাকর্ম শতভাগ বস্তুনিষ্ঠ করা সম্ভব নয়।
ইউজিসি’র হালনাগাদ বার্ষিক প্রতিবেদন ২০১৬-তে উঠে আসা তথ্যের ব্যাপারে এভাবেই বাংলা ট্রিবিউনের কাছে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন শিক্ষক ও গবেষকরা।
ইউজিসি বলছে, ২০১৬ সালে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের একাডেমিক মঞ্জুরির অধীনে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান ও কারিগরিতে মোট গবেষণা প্রকল্প ছিল ৯৯১টি। এর মধ্যে সমাপ্ত হয়েছে মাত্র ১২৫টি। প্রকল্প চলমান রয়েছে মাত্র ২২০টি, প্রক্রিয়াধীন রয়েছে ২৩৫টি এবং বাতিল করা হয়েছে ৪১১টি। ২০১৬ সালে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ক্যাটাগরিতে সমাপ্ত প্রকল্প ছিল মাত্র ২৯টি। বিজ্ঞান ও কারিগরিতে সমাপ্ত প্রকল্প ছিল ৯৬টি।
ইউজিসির প্রতিবেদনটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে,কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান ক্যাটাগরিতে সমাপ্ত হওয়া ২৯টি প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয় মাত্র ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৪২০ টাকা। যাতে প্রতিটি প্রকল্প গড়ে বরাদ্দ পায় প্রায় এক লাখ ১৫ হাজার টাকা। অন্যদিকে, বিজ্ঞান ও কারিগরি ক্যাটাগরিতে সাতটি উপ-শাখায় ২২৮টি প্রকল্পের অধীনে মোট বরাদ্দ দেওয়া হয় এক কোটি ৮৮ লাখ ৯২ হাজার ৩৫৩ টাকা। যাতে প্রতিটি প্রকল্প গড়ে বরাদ্দ পায় মাত্র ৮২ হাজার ৮০০ টাকা।
২০১৬ সালে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান এবং বিজ্ঞান ও কারিগরিতে সমাপ্ত হওয়া ১২৫টি প্রকল্পের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকল্প সমাপ্ত হয়েছে সবচেয়ে বেশি ৩৬টি। এরপরে বিজ্ঞান ও কারিগরি শাখায় ২১টি প্রকল্প সমাপ্ত করে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।
এদিকে ইউজিসি সূত্রে জানা গেছে, ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য ইউজিসি বরাদ্দ রাখে মাত্র ৬ কোটি টাকা, পরের অর্থ বছর ২০১৬-২০১৭ তে বরাদ্দ তিন কোটি টাকা বাড়িয়ে বরাদ্দ রাখা হয় ৯ কোটি টাকা এবং সর্বশেষ চলতি অর্থ বছরে ২০১৭-২০১৮ তে গবেষণার জন্য মোট বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১২ কোটি টাকা। অন্যদিকে, গবেষণার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ২০১৫-২০১৬ অর্থ বছরে সরকারি বরাদ্দ ছিল ৩ কোটি, ২০১৬-২০১৭ অর্থ বছরে ছিল সাড়ে ৩ কোটি টাকা এবং ২০১৭-২০১৮ অর্থ বছরে বরাদ্দ ছিল মাত্র সাড়ে ৪ কোটি টাকা।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইউজিসি’র সাবেক একজন চেয়ারম্যান বলেন,‘গবেষণার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন তা আসলেই খুব কম। আগের তুলনায় হয়ত এ খাতে বরাদ্দ কিছুটা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু তাও অপর্যাপ্ত।’
তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণা প্রকল্পের জন্য ইউজিসিতে কেউ আবেদন করলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পছন্দের শিক্ষকদেরই প্রকল্প দেওয়া হয়। তাদের জন্য অর্থও বেশি দেওয়া হয়। আবার অনেক বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণার জন্য ইউজিসির কাছ থেকে অর্থ নিয়ে যথাযথভাবে কাজ করেন না। ফলে গবেষণার মান নিয়েও প্রশ্ন থেকে যায়।’
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. মনিরুজ্জামান ২০১৬ সালে একটি গবেষণা প্রকল্প সমাপ্ত করেছেন। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘একটি মান ঠিক রেখে গবেষণা করতে চাইলে যে পরিমাণ অর্থ খরচ হয় তার অর্ধেকও দেওয়া হয় না। ফলে গবেষণার মান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে। পর্যাপ্ত অর্থ না থাকায় অনেকে গবেষণা করতে আগ্রহীও হয় না। এতে করে দেশে গবেষণাও প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু তাই নয়, গবেষণার জন্য আবেদন করলে তার অনুমোদন পেয়ে অর্থ বরাদ্দ পেতে পেতে এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত সময় লাগে। একটি গবেষণা করতে চেয়ে তার অর্থ ছাড় পেতে যদি এত সময় লাগে তাহলে হতাশা তৈরি হয়। গবেষণাটির ওপর মনোযোগ থাকে কম।’
গবেষণা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেন, সরকারের উচিত এই খাতে বরাদ্দ বাড়ানো। এছাড়া গবেষণার জন্য যে যন্ত্রপাতি ও কেমিক্যাল ব্যবহার করার প্রয়োজন হয় তাও যদি সহজলভ্য করা সম্ভব হয় তাহলেও অনেক সুবিধা হয় গবেষকদের।
একই সুরে কথা বলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. শারমিন মুসা। তিনি বলেন, ‘আমি গত বছর যে গবেষণাটি সমাপ্ত করেছি তা করতে গিয়ে আমার অনেক চ্যালেঞ্জ নিতে হয়েছে। কারণ ছিল একটাই, তা হলো অর্থ। আমার গবেষণাটির জন্য যাদেরকে সহযোগী রেখেছিলাম তাদেরকে বিভিন্ন জায়গায় তথ্য সংগ্রহের জন্য পাঠাতে হয়েছে। এছাড়া গবেষণায় যে সব কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হয় তার খুবই সামান্য পরিমাণ কেমিক্যালের দামও লাখ লাখ টাকা। কিন্তু এত সামান্য অর্থ দিয়ে একটি গবেষণা খুব ভালোভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়, তবুও করতে হয়।’ অর্থ কম বরাদ্দের কারণে গবেষণার মান নিয়ে তিনিও প্রশ্ন তুলেছেন।
এদিকে ওই প্রতিবেদনটির মাধ্যমে সরকারের কাছে দেশে দক্ষ ফ্যাকাল্টি তৈরির উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিষয়ক বিশ্বমানের একটি গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের গবেষণার সুবিধার্থে কেন্দ্রীয়ভাবে গবেষণাগার স্থাপনের সুপারিশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)।ওই সুপারিশে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইতোমধ্যে গবেষণায় বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
২০২১, ২০২০ এবং ২০৪১ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে হলে শিক্ষাখাতে গবেষণা বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। গবেষণার মানোন্নয়নের জন্য এই ফান্ড অবশ্যই বাড়ানো প্রয়োজন। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের গবেষণার সুবিধার্থে কেন্দ্রীয়ভাবে গবেষণাগার পরিচালনা করা প্রয়োজন মনে করে কমিশন। এছাড়া গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির স্বল্পতা এবং তা রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়বহুল হওয়ায় কেন্দ্রীয় গবেষণাগার স্থাপনেরও সুপারিশ করে কমিশন।
এই দুটি সুপারিশের বিষয়ে ইউজিসি’র চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মান্নান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা সত্য গবেষণার জন্য যে পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ প্রয়োজন তা অপ্রতুল। আগের চেয়ে বরাদ্দ বাড়লেও তাও পর্যাপ্ত নয়। ফলে আরও অর্থ বাড়ানো প্রয়োজন।’
তিনি আরও বলেন, ‘গবেষণার জন্য দেশে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির স্বল্পতা আছে তাছাড়া তা রক্ষণাবেক্ষণও বেশ ব্যয়বহুল। ফলে শিক্ষকদের গবেষণার জন্য কেন্দ্রীয়ভাবে একটি গবেষণাগার স্থাপন করা গেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সেই গবেষণার ব্যবহার করে আরও দক্ষ হবে বলে অনুভব করি। এসব বিষয়ে বিবেচনা করেই সরকারের কাছে একটি কেন্দ্রীয় গবেষণাগারের সুপারিশ করা হয়েছে।’
আরও পড়ুন:
এনসিটিবির ছাগলপ্রীতি!