রাজনৈতিক ব্যক্তির বাইরেও অরাজনৈতিক ব্যক্তির গুমের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে শীপা হাফিজা বলেন, ‘যখন রাজনৈতিক কারণে কেউ গুম হন বা নিখোঁজ হন, তার একটা যুক্তি খুঁজেও পাওয়া যায়। কারণ আমাদের দেশে রাজনীতি তো আসলে একটা নোংরা খেলা। কখনও এটা সমান সমান প্লেইং ফিল্ডে হয় না। এ বছর সেই গণ্ডি পেরিয়ে সাধারণ মানুষ যেমন— শিক্ষক, বিদেশে পড়ালেখা করা শিক্ষার্থী, সাংবাদিক, এমনকি প্রকাশকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ হারিয়ে যাচ্ছেন। আমাদের কাছে মনে হয়, এটা অনেক বেশি ভয়াবহ, অনেক বেশি আশঙ্কার কারণ।’
শীপা হাফিজ বলেন, ‘আমরা জানতাম, আমরা যারা পার্টিজান রাজনীতিতে নেই, আমাদের জন্য এই ভয়টা নেই। কিন্তু এখন আমরাও প্রতিনিয়তই শঙ্কায় থাকি। আমাদের ভাবতে হয়, আজকের এই মিটিংয়ের পর আমরা এটা বলব কিনা, করব কিনা। কাজেই আমাদের তো মনে হয় আমাদের শঙ্কা অনেক বেশি।’
সংবাদ সম্মেলনে শীপা হাফিজা আরও বলেন, ‘আমাদের মধ্যে সচেনতা বাড়াতেই আমাদের এই উদ্যোগ। গুম, নিখোঁজ ও অপহরণ— এগুলো অন্যায়, অবিচার। একটা মানুষকে যখন ঘর থেকে তার অমতে বের করে নেওয়া হয়, এটাও মানবাধিকার লঙ্ঘন। আমাদের এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য হলো— মানুষ যেন জানে, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার তাদের আছে। এর বিচার চাইতেই হবে রাষ্ট্রের কাছে। রাষ্ট্রও যেন অনুধাবন করতে সক্ষম হয় যে, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনোভাবেই এত পরিমাণ মানবাধিকার লঙ্ঘন করে বেশি দিন চলা যায় না।’
মাসের পর মাস নিখোঁজের পর গ্রেফতার হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে আসকের নির্বাহী পরিচালক বলেন, ‘তুলে নিয়ে যাওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত জঘন্য একটি মানবাধিকার লঙ্ঘন। বিশেষ করে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে এই কাজ করা হয়। এগুলোকে আমরা গুম বা অপহরণ বলছি। আমরা রহস্যজনক নিখোঁজও বলে থাকি। এ বছর ৯১ জন মানুষ গুম ও নিখোঁজ হয়েছেন। সরকারের উচিত, এসব ঘটনা অনুসন্ধান করা। সব ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে একটি স্বাধীন কমিশন গঠনেরও দাবি জানিয়ে আসছে আইন সালিশ কেন্দ্র, যেন এর মাধ্যমে এসব ঘটনার স্বচ্ছ ও জবাবদিহিতামূলক একটি তদন্ত করা যায়।’
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সমন্বয়ক আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, ‘মানবাধিকারের প্রধান দু’টি সুচকের মধ্যে একটি হচ্ছে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার। সাম্প্রতিক বছরগুলোর মতো এ বছরও ইতিবাচক অগ্রগতির ধারা অব্যাহত ছিল। অন্যদিকে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি। ২০১৭ সালের সার্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে অপহরণ, গুম, ও গুপ্তহত্যার ঘটনার পাশাপাশি এ বছর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ক্ষেত্রে যুক্ত হয়েছে নতুন মাত্রা। সাবেক রাষ্ট্রদূত থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রকাশক, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতা, পৌর মেয়র— কেউই বাদ পড়েননি গুম ও নিখোঁজের এই তালিকা থেকে। এছাড়া আগের বছরগুলোর ধারাবাহিকতায় বছরজুড়ে অব্যাহত ছিল রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন বাহিনীর ক্রসফায়ার, গুলি বিনিময় ও বন্দুকযুদ্ধের নামে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।’
এছাড়াও ধর্মীয় সংখ্যালঘু নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সভা-সমাবেশে বাধা, রোহিঙ্গা ইস্যু, সাংবাদিক নির্যাতন, সীমান্ত হত্যা, নারী অধিকার, ফতোয়া, শ্রমিকের অধিকার, শিশু নির্যাতন ও হত্যা, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর অধিকার, স্বাস্থ্যের অধিকারসহ বিভিন্ন বিষয় সংস্থাটির পর্যালোচনা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।