বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে মাওলানা সা’দের পক্ষে-বিপক্ষে চিঠি

 

মাওলানা সা’দকে কেন্দ্র করে সাউথ আফ্রিকা থেকে আসা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আসা চিঠিটঙ্গীতে আসন্ন তাবলিগ জামাতের বিশ্ব ইজতেমায় ভারতের মাওলানা মুহাম্মদ সাদ কান্ধলভির আগমনকে কেন্দ্র করে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছে বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতের একাধিক গ্রুপ। এই দ্বন্দ্ব ছড়িয়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশের তাবলিগ জামাতকর্মীদের মধ্যেও। কয়েকটি দেশের তাবলিগ জামাতের একাধিক গ্রুপ মাওলানা সা’দের বিশ্ব ইজতেমায় আসার পক্ষে-বিপক্ষে চিঠি দিচ্ছে বাংলাদেশকে। মাওলানা সা’দকে নিয়ে সমঝোতা না হওয়া সংকট দেখা দিয়েছে তাবলিগ জামাতে।

সংগঠনসূত্রে জানা গেছে, তাবলিগ জামাতের কার্যক্রম শুরু হয় ভারতের দিল্লিতে মাওলানা মুহাম্মাদ ইলিয়াসের মাধ্যমে। তার মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী তাবলিগ জামাত ছড়িয়ে পড়ে। সংগঠনটির মজলিসে শুরার সদস্য নির্বাচিত করা হয় দিল্লির নিজামুদ্দীন মারকাজ (মূল কেন্দ্র) থেকে।  আর এই তাবলিগের কার্যক্রমে পাকিস্তানও অগ্রগামী ভূমিকায় রয়েছে।

বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের মারকাজ হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদ। ১৯৬৭ সাল থেকে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হচ্ছে বিশ্ব ইজতেমা। এ ইজতেমায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মুসলমান ছাড়াও বিশ্বের প্রায় ৫০টি দেশ থেকে তাবলিগের অনুসারী ও ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা অংশ নেন।

সা’দ বিপক্ষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানোর ইন্দোনেশিয়ার তাবলিগ জামাতের চিঠি

টঙ্গীর তীরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসল্লিরা এই ইজতেমায় অংশ নেওয়ায় এটি ‘বিশ্ব ইজতেমা’ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। বাংলাশে ছাড়াও বড় পরিসরে ভারত ও পাকিস্তানেও ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া, অন্য অনেক দেশেই ছোট পরিসরে ইজতেমা অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের তাবলিগের মুরব্বিদের অংশ গ্রহণেই এই ইজতেমা সর্বজনীনতা লাভ করে। ভারত-পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় দ্বন্দ্বের জেরে দুই দেশের ইজতেমায় দুই দেশের তাবলিগের মুরব্বিদের অংশ নেওয়ার সুযোগ কম থাকে। এছাড়া, ভিসা জটিলতা ও নিরাপত্তাজনিত কারণেও অন্যান্য দেশের মুসল্লিদের অংশ নেওয়ার সুযোগ বেশি থাকে না। এদিকে বাংলাদেশের ইজতেমায় ভারত-পাকিস্তানের মুরব্বিরা সহজেই আসতে পারেন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয়ভাবে পৃষ্ঠপেষকতার কারণে অন্য দেশের মুসল্লিরাও এই ইজতেমায় অংশ নেওয়ার জন্য সহজে ভিসা পান।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের তাবলিগ জামাতের একজন মুরুব্বি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘সারা বিশ্বের তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় কোনও ইজতেমা বা অন্য কোনও অনুষ্ঠান নেই। প্রত্যেক দেশ নিজে নিজ দেশে ইজতেমার আয়োজন করতে বাধা নেই। আবার একইসঙ্গে কোনও দেশের ইজতেমায় অন্যদেশের কর্মীদের অংশ নিতে কোনও বাধ্যবাধকতাও নেই। মূলত ভারত-পাকিস্তানে তাবলিগের মুরব্বিরা রয়েছেন, তাদের বয়ান শোনার জন্য অনেকে আগ্রহী।পাকিস্তানের ইজেতেমায় ভারতীয় মুরব্বিরা নানা কারণে অংশ নিতে পারেন না। অন্যদিকে নিরাপত্তাজনিত কারণেও অনেকে সেদেশে যেতে চান না। একই রকম ঘটনা ভারতের ইজতেমার ক্ষেত্রেও ঘটে। একমাত্র বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের শীর্ষ মুরব্বিরা মিলনমেলা ঘটে। বাংলাদেশের ভিসা প্রক্রিয়া সহজ হওয়ায় অন্যান্য দেশের মানুষ আসেন।

উল্লেখ্য,  এই বছর ১২ জানুয়ারি ও ১৯ জানুয়ারি দুই দফায়  তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফায় ১৪ জানুয়ারি ও দ্বিতীয় দফায় ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।

মাওলানা সা’দের পক্ষে বিপক্ষে আসছে চিঠি

তাবলিগ জামাতে ফের অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তাবলিগের দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের মাওলানা সাদ কান্ধলভি’র বাংলাদেশে আসা নিয়ে এ দ্বন্দ্বের সূত্রপাত। মাওলানা সাদ’কে ঠেকাতে মাঠে নেমেছে বাংলাদেশের তাবেলিগের একাংশের পাশাপশি যুক্ত হয়েছে হেফাজতে ইসলামসহ কওমি আলেমরাও। আর এসব দ্বন্দ্বে রাজধানীর কাকরাইল মসজিদে হাতাহাতি ও ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া, মাওলানা সা’দকে বাংলাদেশে ইজতেমায় অংশ গ্রহণের পক্ষে বিপক্ষে মালায়েশিয়া, দক্ষিণ  আফ্রিকা ও ইন্দোনেশিয়ার তাবলিগের একাধিক গ্রুপ বাংলাদেশকে  চিঠি দিচ্ছে। 

প্রসঙ্গত, গত ৬ জানুয়ারি রাজধানীর উত্তরায় মাওলানা সা’দকে কেন্দ্র করে চলমান সংকট নিরসনে একটি পরামর্শ সভা অনুষ্ঠিত হয়। তাবলিগ জামাতকর্মীদের পাশাপাশি হেফাজতপন্থী কওমি আলেমরাও ওই সভায় অংশ নেন। সভায়  মাওলানা সা’দকে প্রতিহত করার ঘোষণা দেওয়া হয়।

এই প্রসঙ্গে তাবলিগের একজন মুরব্বির বলেন, ‘‘মাওলানা সা’দ কান্ধলভির বিভিন্ন সময়ে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। ওই সময় মাওলানা সা’দ আলেমদের অর্থের বিনিময়ে ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার বিরোধিতা করে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন। এছাড়া ক্যামেরাযুক্ত মোবাইল পকেটে রেখে নামাজ হয় না বলেও মন্তব্য করেছিলেন। তখন তার ওই  বক্তব্য সমালোচনার মুখে পড়ে। এ ঘটনায় ‘দারুল উলুম দেওবন্দ’ও মাওলানা সা’দ কান্ধলভির বক্তব্যের প্রতিবাদ করে। এমনকি দারুল উলুম দেওবন্দের মুহতামিম মাওলানা আবুল কাসেম নোমানিসহ শীর্ষ আলেমরা বিবৃতি দিয়ে তার বক্তব্য প্রত্যাহারেরও আহ্বান জানান। তখন ‘চাপে পড়ে’ মাওলানা সা’দ তার বক্তব্যের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।’’

সা’দকে কেন্দ্র করে মালয়েশিয়া তাবলিগের একাংশের চিঠি

তাবলিগ সূত্র জানায়, বাংলাদেশে তাবলিগের ফায়সালের (আমির) দায়িত্ব পালন করছেন সাত জন। এরমধ্যে সৈয়দ ওয়াসিফ ইসলাম 'তাবলিগ জামাত বাংলাদেশে'র একজন মজলিসে শুরা সদস্য। একইসঙ্গে আমিরও। বিশ্ব ইজতেমায় মাওলানা সা’দ কান্ধলভির অংশ নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন তিনি। বিপরীতে বাংলাদেশের তাবলিগের অন্য মুরব্বিদের মধ্যে কেউ কেউ মাওলানা সা’দের বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ  চান, শুধু সা’দ এককভাবে যেন না আসেন। নিজামুদ্দীনে বিভক্ত গ্রুপ দু’টি সমঝোতা করে একইসঙ্গে বিশ্ব ইজতিমায় শরিক হোক।

সা’দের পক্ষে-বিপক্ষে চিঠি আসা প্রসঙ্গে বাংলাদেশে তাবলিগের শুরা সদস্য সৈয়দ ওয়াসিফ ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিঠি আসছে মূলত সরকারের কাছে। আমরাও কপি পেয়েছি। আবেগে হয়তো অনেকে অনেক কিছু করছেন। ইজতেমার সিদ্ধান্ত মূলত মুরব্বিদের পরামর্শ অনুযায়ীই হয়।’

সংকট নিরসন প্রসঙ্গে তাবলিগের শুরা সদস্য মাওলানা রবিউল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আসলে এ পরিস্থিতিতে আমার জন্য কথা বলা মুশকিল। এ সংকট নিয়ে একাধিক বৈঠক হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও যুক্ত হয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, সরকারের পক্ষ থেকে কী সিদ্ধান্ত আসে।’

উল্লেখ্য,  এই বছর ১২ জানুয়ারি ও ১৯ জানুয়ারি দুই দফায়  তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হবে। প্রথম দফায় ১৪ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় দফায় ২১ জানুয়ারি আখেরি মোনাজাত অনুষ্ঠিত হবে।