শিক্ষা প্রশাসনের দুর্নীতিবাজদের সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে

শিক্ষা মন্ত্রণালয়শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে বদলির সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণালয়। ঘুষ-দুর্নীতি ও চাকরিবিধি লঙ্ঘন করে একই প্রতিষ্ঠানে বহু বছর ধরে কর্মরত থাকায় তাদের ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে প্রথমে ৩০ জনের বদলি সংক্রান্ত একটি নথিতে সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব স্বাক্ষর করেছেন। মন্ত্রী স্বাক্ষর করলে মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি) বদলি আদেশ জারি হবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বিষয়টি স্বীকার করেছেন মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব চৌধুরী মুফাদ আহমেদ। তিনি বাংলা ট্রিবিউন’কে বলেন, ‘অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকায় তাদের বিরুদ্ধে ঘুষ, দুর্নীতির নানা অভিযোগ উঠেছে। তাদের বদলির আদেশ যে কোনও সময় জারি করা হবে।’

কতজন কর্মকর্তাকে বদলি করা হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘মাউশি (মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদফতর), ঢাকা শিক্ষাবোর্ড, এনসিটিবি (জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড), ডিআইএ’র (পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর) অভিযুক্ত কর্মকর্তারাই বদলির তালিকায় রয়েছে।’

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) ৩০ জনের বদলির নথি তোলা হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ ফেব্রুয়ারি) অন্যদের বদলির নথি তোলা হতে পারে। এ তালিকায় মাউশি, ঢাকা বোর্ড, এনসিটিবি, ডিআইএ’র কর্মকর্তারা রয়েছেন বলে জানা গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মকর্তার মূল পদ সরকারি কলেজগুলোতে হলেও প্রভাব খাটিয়ে তারা বছরের পর বছর প্রশাসনিক পদ আঁকড়ে রয়েছেন। অনেকেই গড়ে তুলেছেন বাণিজ্য সিন্ডিকেট।

সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, মাধ্যমিক শাখার উপ-পরিচালক মোস্তফা কামাল, বেসরকারি কলেজ শাখার উপ-পরিচালক মেজবাহ উদ্দিন, এস এম কামাল হায়দারসহ অন্তত ১২ জন রয়েছেন অভিযোগের তালিকায়। একইভাবে অভিযোগ রয়েছে ঢাকা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক তপন কুমার সরকার, কলেজ পরিদর্শক ড. মো. আশফাকুস সালেহীন, বিদ্যালয় পরিদর্শক এটিএম মইনুল হোসেনসহ ১১ জন, এনসিটিবির উৎপাদন নিয়ন্ত্রক আবদুল মজিদ, মোখলেছুর রহমান, মোছাব্বির হোসেন, মনির হোসেনসহ অন্তত ২০ জন এবং ডিআইএ’র সিদ্দিকুর রহমান, কাউছার হোসেন, এনামুল হকসহ আরও ছয়জনের বিরুদ্ধে।

জানা গেছে, এনসিটিবিতে প্রতি বছর হাজার কোটি টাকার বই ছাপার কাজে কমিশন হাতিয়ে রাতারাতি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন অনেক কর্মকর্তা। বোর্ডে তারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অনুমতি, কেন্দ্র স্থাপন, কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত। ডিআইএ কর্মকর্তারা বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদশর্নের নামে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন। সম্প্রতি একজন কর্মকর্তা ঘুষসহ দুদকের অভিযানে আটক হয়েছেন। মাউশি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমপিওভুক্তিসহ বিভিন্ন কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এসব অনৈতিক সুবিধা নিতেই বছরের পর বছর সেখানে ‘খুঁটি’ গেড়েছেন অনেক কর্মকর্তা।

অভিযুক্তদের সহকর্মীরা জানিয়েছেন, তাদের মূল পদ সরকারি কলেজে। অথচ তারা ক্লাসে পড়াতে আগ্রহী নন। উল্টো প্রশাসনিক পদে থেকে অবৈধ সুবিধা নিচ্ছেন। চাকরিবিধি অনুযায়ী এক পদে তিন বছরের বেশি থাকার বিধান না থাকলেও চাকরিতে যোগদান করেই প্রশাসনিক পদে যুগের পর যুগ পার করেছেন কেউ কেউ। একই পদে বহাল থাকার জন্য পদোন্নতি পর্যন্ত নেননি এমন কর্মকর্তাও রয়েছেন।

প্রশ্নফাঁস, মন্ত্রীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা ও মন্ত্রণালয়ের উচ্চমান সহকারী ঘুষের টাকাসহ ধরা পড়ার মতো ঘটনায় দেশজুড়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সংসদে ও রাজপথে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি ওঠে। ইমেজ সংকটে পড়ে মন্ত্রণালয়। এমন বাস্তবতায় বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বদলির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এসব কর্মকর্তাকে বদলির পর প্রশাসন ক্যাডারের বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তাকেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। এ তালিকায় অতিরিক্ত সচিব থেকে সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তা রয়েছেন বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানিয়েছে।