‘সরকারি চাকরির নিয়োগে কোটা বরাদ্দ রয়েছে ৫৬ শতাংশ। মেধার তুলনায় বেশিরভাগ আসন কোটার বরাদ্দ থাকলেও পদ শূন্য থেকে যাচ্ছে। যেখানে মেধাবীরা সুযোগ পাচ্ছে না। এতে দেশের প্রকৃত মেধাবীরা চাকরির বাইরে থেকে যাচ্ছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার সময়ের তুলনায় বর্তমান বাংলাদেশের অবস্থানের অনেক পরিবর্তনও ঘটেছে, বদলেছে চাকরির বাজার, মানুষের আর্থ সামাজিক অবস্থা। ফলে কোটা সংস্কার এখন সময়ের দাবি।’
বাংলা ট্রিবিউন বৈঠকিরাজধানীর শুক্রাবাদে বাংলা ট্রিবিউন স্টুডিওতে আয়োজিত ‘নিয়োগে কোটা বনাম মেধা’ শীর্ষক বৈঠকিতে এসব কথা বলেন অতিথিরা। বৃহস্পতিবার (১ মার্চ) বিকাল সাড়ে ৪টায় শুরু হয় বৈঠকি। এ আয়োজন সরাসরি সম্প্রচার করেছে এটিএন নিউজ। পাশাপাশি বাংলা ট্রিবিউনের ফেসবুক, হোমপেজ ও ইউটিউব চ্যানেলেও দেখা যায় বৈঠকি।
আরও পড়ুন: কোটা বাদ না সংস্কার?
মুন্নী সাহার সঞ্চালনায় বৈঠকিতে অংশ নেন— সাবেক যুগ্ম সচিব ড. এম এ মোমেন, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হারুন হাবীব, কলামিস্ট শরিফুল হাসান, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসান, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সমন্বয়কারী মো. রাশেদ খান এবং বাংলা ট্রিবিউনের চিফ নিউজ এডিটর দুলাল আহমদ চৌধুরী।
বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের সমন্বয়কারী মো. রাশেদ খান বলেন, ‘কোটার কারণে আজ প্রকৃত মেধাবীরা চাকরি পাচ্ছেন না, মেধাবীরা তাদের যোগ্যতা দিয়ে সঠিক কর্মস্থল পাচ্ছে না। আমি কোটা সংস্কারের পক্ষে আজ এই বৈঠকে উপস্থিতি হয়েছি। কোটা সংস্কারের মাধ্যমে মেধাবীদের চাকরি সুযোগ দেওয়ার জন্য আমি এবং আমরা লাখ লাখ চাকরিপ্রার্থী আন্দোলন করে যাচ্ছি।’
মো. রাশেদ খানকয়েকটি দাবি তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সাধারণ শিক্ষার্থীদের জন্য মাত্র ৪৪ শতাংশ এবং কোটা রয়েছে ৫৬ শতাংশ। আমি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে দাবি করবো নতুন করে এই কোটা সংস্কার করার। বিভিন্ন চাকরিতে কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেই আসনগুলো খালি রাখা হয়। সেখানে মেধাবীদের যদি সুযোগ দেওয়া হয় তাহলে তারা দেশের উন্নয়নে কাজ করতে পারতো। কোটাধারীদের জন্য বিশেষ নিয়োগ পরীক্ষা নিলেও আসন শূন্য থেকে যায়। আমি আরও দাবি করি, চাকরিতে প্রবেশের সময়সীমা সবার জন্য সমান হতে হবে।’
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসানবৈঠকিতে অংশ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সন্তান কমান্ডের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মেহেদী হাসান বলেন, ‘বিভিন্ন সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এই কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন হয়েছে, তখন জানতে পারি শিবিরের কিছু ছেলে টিএসসিতে বৈঠক করছে। তারা ষড়যন্ত্র করছে বলেই জানতে পারলাম। এমন আন্দোলন অনেকবারই হয়েছে। সম্প্রতিও হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে ফেসবুকে কিছু মানুষ বিষয়টি উসকে দেয়।’
আরও পড়ুন: কোটা সংস্কারে সরকার চাইলে কমিশন করতে পারে: দুলাল আহমদ চৌধুরী
মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদদের কি আমরা কোটা সুবিধা দিতে পেরেছি প্রশ্ন রেখে কলামিস্ট শরিফুল হাসান বলেছেন, ‘আমি মনে করি দেশের ২ লাখ মুক্তিযোদ্ধা অন্য সবার চেয়ে একটু হলেও এগিয়ে রয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধারা কোটা সুবিধা পাবে মানতে রাজি আছি, মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের কোটা দিবেন তাও মানতে রাজি, কিন্তু মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিদের কেন কোটা সুবিধা দেবেন?’
কলামিস্ট শরিফুল হাসানতিনি আরও বলেন, সংবিধানে বৈষম্যের বিরুদ্ধে কথা বলা হয়েছে। আমি মনে করি স্বাধীনতা ৪৮ বছর পর কোটার সংস্কার করা দরকার। তবে পিছিয়ে পড়াদের কিছু স্পেশাল সুবিধা দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু বর্তমানে যারা কোটা সুবিধা ভোগ করেন তাদের মধ্যে কে কে পিছিয়ে পড়া তা একটু বলি। মুক্তিযোদ্ধার নাতিপুতিরা কি পিছিয়ে পড়া? যদি চার ধরনের কোটার কথায় আসি, জেলা কোটায় সুবিধা পাচ্ছে বড় জেলাগুলো। নারী কোটার কথা বলতে গেলে বলি, রাজধানীর মহিলা স্কুলগুলোর নারীরা কোটা সুবিধা পায়, ঢাকার বাইরের নারী কোটা সুবিধা পায় না। সর্বশেষ আদিবাসীর জায়গায় আসি, প্রতিটি নিয়োগে আদিবাসী কোটা শূন্য থাকে।’
আরও পড়ুন: ‘আমরা মুক্তিযোদ্ধারা কোটায় বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কথা কল্পনাও করিনি’
মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক হারুন হাবীব বলেন, ‘আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধ করেছি তারা কখনও ভাবিনি বর্তমানের মতো এমন কোটা দিয়ে বাড়তি সুবিধা দেওয়া হবে। কোটায় বাড়তি সুবিধা নেওয়ার কথাও তো কল্পনাও করিনি। আমি মনে করি মেধার কোনও বিকল্প নেই। যদি মেধার গুরুত্ব না দেওয়া হয় তাহলে পাবলিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিষ্ক্রিয় অবস্থায় পড়বে। ফলে আমি মনে করি মেধার কোনও বিকল্প নেই।’
সাংবাদিক হারুন হাবীবএই কোটা নিয়ে তো আন্দোলন আগেও হয়েছে উল্লেখ করে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, ‘কিন্তু তখন দেখা গেলো সেই সব আন্দোলন মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে/বিপক্ষে গিয়ে দাঁড়ালো। কিন্তু আজ বাংলাদেশ যদি মুক্তিযোদ্ধাদের উপেক্ষা করার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাহলে তো সেটা কিন্তু বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয়। যাই হোক, একটি সিস্টেম যখন চালু হয় সেটা যুগ যুগ ধরেই কি থাকবে? সেটা আলোচনা সাপেক্ষে তা সংস্কার হতে পারে। এটা যুক্তি দিয়ে সমাধান করা সম্ভব।’
আরও পড়ুন: মুক্তিযোদ্ধার নাতি-পুতিদের কেন কোটা সুবিধা দেবেন: শরিফুল হাসান
সাবেক যুগ্ম সচিব ড. এম এ মোমেন বলেন, ‘আমার একটা অভিজ্ঞতা আছে, অনেক আগে একজন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান বিসিএস পরীক্ষায় প্রথম হয়েছিলেন। ফলে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানকে অমেধাবী ভাবার কারণ নেই। ফলে আমি মনে করি কোটায় সংস্কার প্রয়োজন। আমরা যখন একটি দেশে বসবাস করি তখন দেশের সবচেয়ে বড় গ্রন্থপঞ্জি হলো সংবিধান। সেটা আমাদের মানতেই হবে। ওই সংবিধানে বৈষম্য রাখা হয়নি। আর এই সংবিধান বিশ্বের অন্যতম একটি শ্রেষ্ঠ সংবিধান। ফলে সংবিধান মানতেই হবে।’
ড. এম এ মোমেনসরকার কেন চাকরি দেবে প্রশ্ন রেখে তিনি বলেন, ‘আমাদের প্রথমত চিন্তা করতে হবে চাকরির জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী কেন হতে হবে? নেলসন মেন্ডেলার কথা একটু বলি। তিনি তো মুক্তিযোদ্ধা। তার কাছে মুক্তিযোদ্ধারা যখন কোটা চাইলো। তখন তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের উদ্দেশে বলেছেন, মুক্তিযোদ্ধার কাজ দেওয়া, নেওয়া নয়। তোমরা ঠিক করো তোমরা দেশকে কি দেবে?’
আরও পড়ুন: কোটার কারণে মেধাবীরা চাকরি পাচ্ছেন না: মো. রাশেদ
বৈঠকিতে অংশ নিয়ে বাংলা ট্রিবিউনের চিফ নিউজ এডিটর দুলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবি অযৌক্তিক নয়। এখন যে আন্দোলন হচ্ছে তা দেখে মনে হয় কোটা বাতিলের দাবি হচ্ছে, তা কিন্তু নয়। সংস্কারের দাবি হতেই পারে, এটা যৌক্তিক। বর্তমান বাস্তবতা অনুধাবন করে সরকার চাঈলে সাবেক কোনও খ্যাতিমান মন্ত্রিপরিষদ সচিব কিংবা কোনও খ্যাতিমান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করতে পারে। এই কমিশন সরকারি চাকরিতে নিয়োগ বিধি বিচার বিশ্লেষণ করতে পারে। প্রয়োজনে গণশুনানি করতে পারে। সবপক্ষের মর্যাদা রক্ষা হয় এমন একটা উপায় খুঁজে বের করে সরকারকে সুপারিশ করতে পারে।’
বাংলা ট্রিবিউনের চিফ নিউজ এডিটর দুলাল আহমদ চৌধুরীদুলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে কোটার পরিমাণ প্রায় ৫৬ ভাগ। এটা নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে মনে হয়, কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা ও মুক্তিযুদ্ধের সন্তান কমান্ড মুখোমুখি অবস্থান করছে। চাকরিবঞ্চিত দেশের শিক্ষিত তরুণরা একটা দাবি তুলেতেই পারে। সরকার দেশের প্রয়োজনে মানুষের প্রয়োজনের আইন-কানুন সংস্কারের মাধ্যমে যুগপোযোগি করতে পারলে এক্ষেত্রে নয় কেন? তবে শুধুমাত্র মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে অহেতুক বিতর্ক করে আমরা জাতিকে নতুন করে বিভক্ত করতে চাই না। এরমধ্য দিয়ে নতুন প্রজন্মের কাছে বিভ্রান্তিকর ম্যাসেজ যাবে। স্বাধীনতাবিরোধীরা সুযোগ পাবে। এ বিষয়ে দু’পক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে।’
আরও পড়ুন: ‘কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমস্যা হচ্ছে কিছু মানুষ বিষয়টা উসকে দেয়’
ছবি: সাজ্জাদ হোসেন