একান্ত সাক্ষাৎকারে শিরিন এবাদি

স্বাধীনতা শব্দটিই ইরানের নারীদের জন্য নিষিদ্ধ

শিরিন এবাদি

ইরানের প্রখ্যাত আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মী শিরিন এবাদি। যিনি অধিকারের কথা বলতে গিয়ে নিপীড়নের শিকার হয়েছেন নিজ দেশে। ক্ষমতাসীনদের রোষানলে পড়ে একসময় বাধ্য হয়েছেন দেশ ছেড়ে যেতে। শিরিন ২০০৩ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় অবদানের জন্য তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন। শিরিনই ইরানের প্রথম নাগরিক, যিনি নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। রোহিঙ্গাদের শরণার্থী জীবন দেখতে শিরিন এবাদি তার দুই সহযোদ্ধাকে নিয়ে সম্প্রতি বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন। ওই দুই সহযাত্রী হলেন— নোবেল বিজয়ী আয়ারল্যান্ডের ম্যারেইড ম্যাগুয়ার ও ইয়েমেনের তাওয়াক্কল কারমান। গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় আসার পর বাংলা ট্রিবিউনের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে তিনি একান্তে বিশ্বের নারী, ইরানের নারী স্বাধীনতা ও মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেন। এই একান্ত সাক্ষাৎকারটির আয়োজন করিয়ে দেওয়ার জন্য বেসরকারি সংগঠন ‘নারীপক্ষ’কে ধন্যবাদ।

ইরানের নারীরা কতটা স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারেন?

শিরিন এবাদি: একেবারেই না। তারা যে পোশাকটা পছন্দ করে পরতে চায়, সেটাও বেছে নেওয়ার অধিকার রাখে না। আমি যে পোশাকে আছি (ব্লেজার), এই পোশাকে আমি যদি ইরানে যাই, তাহলে আমাকে আটক করা হবে। এর জন্য শাস্তিও পেতে হবে। সেখানকার মেয়েরা স্বাধীনতা ভোগ করবে কী? তারা তো এমনকি কোনও খেলাধুলা দেখার জন্য স্টেডিয়ামেও যেতে পারে না। কনসার্টে যেতে পারে না। সবচেয়ে বড় উদাহরণ, যেটা দিলেই আপনি পরিস্থিতিটা বুঝতে পারবেন—সেখানকার নারীরা ডিভোর্স দেওয়ার অধিকারও রাখে না। ভুলে গেলে চলবে কেন, পুরুষশাসিত সমাজে স্বাধীনতা শব্দটিই নারীর জন্য নিষিদ্ধ করে রাখা হয়েছে। এটি পুরুষতান্ত্রিকতার মন্ত্র। এই পুরুষতন্ত্র কেবল পুরুষে নিহিত না, নারীর মস্তিষ্কেও এই বীজ রয়েছে।

সেই পরিস্থিতিতে আপনি কথা বলেছেন, বললেন কীভাবে?

শিরিন: আমি যখন কথা বলা শুরু করি, আমাকে থামানোর হেন চেষ্টা নেই যে, করা হয়নি। আমাকে থামাতে আমার কাজের জায়গা থেকে বাদ দেওয়া হয়। তারপরও আমি থেমে থাকিনি। বরং আমি এরপর রাজনৈতিক ও আদর্শিক কারাবন্দিদের নিয়ে কাজ শুরু করি। সেসময় আমি দেশে-বিদেশে পুরস্কার পেতে শুরু করি, আমার কাজের কারণে। আমি যত বেশি খ্যাতি লাভ করতে থাকি, সরকার ততই বিগড়ে যেতে থাকে। এটাই হওয়ার কথা। আমি যদি থেমে যেতাম, তাহলে আমার পথচলা সেখানেই শেষ হয়ে যেত। এরপর আমার অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। আমার কলিগদের জেলে ঢোকায় তারা। সেসময় আমি দেশের বাইরে ছিলাম। আমার কাজ শেষে যখন ইরানে ফিরতে চাইলাম, আমার সহকর্মীরা তখন আমাকে ফিরতে নিষেধ করেন। তারা তখন আন্ডারগ্রাউন্ডে। তারা বলেন, ‘আমি যদি দেশের বাইরে থাকি, আমি অন্যদের হয়ে অধিকারের কথা বলতে পারবো।’ এরপর সরকার আমার স্বামী ও বোনকে গারদে ঢোকায়। তারা প্রত্যেকবারই আমাকে প্রস্তাব দেয়—আমি চুপ করে থাকলে সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি সোজা উত্তর দিয়েছি, হবে না, আমি চুপ করবো না।

মানবাধিকার কর্মী হিসেবে এই মুহূর্তে বিশ্বকে কী বার্তা দিতে চান?

শিরিন: মানবতা হবে সবার জন্য, নারী-পুরুষ সবার জন্য। বিশেষত সমাজের সংখ্যালঘুদের জন্য মানবাধিকার নিশ্চিত করাটা জরুরি। কোনও একটি দেশে তখনই বলা যাবে যে বাক স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা আছে, যখন কিনা বিরোধীদের কথা বলতে দেওয়া হবে। স্বাভাবিকভাবেই যিনি ক্ষমতায় থাকেন, তিনি কেবল তার পক্ষের লোকদেরই বলতে দেন। ক্ষমতাসীনরা বিরোধীদের কথা বলতে দেয় কিনা সেটাই জরুরি।

 

প্রতিবেদকের সঙ্গে শিরিন এবাদি

 

 



কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন দেশে হিজাব ও নিকাবের বিরোধিতার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখেন?

শিরিন: অনেকে এর সঙ্গে নিরাপত্তার বিষয়টি যুক্ত করেন। কিন্তু আমি মনে করি, এর সঙ্গে নিরাপত্তার কোনও সম্পর্ক নেই। দেখুন, বোরকা-নিকাব একেক জায়গায় একেক রকম। আবার ইউরোপ বলছে— হাফ খুলে রাখতে। কেউ বলছেন—এটি নারীর স্বাধীনতা, নারী যেভাবে ভাবে। হিজাবের বিষয়টি আলাদা। সমস্যার বিষয় হয় তখনই, যখন এটি ধারণ করতে আপনি বলপ্রয়োগ করবেন।

বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার কর্মীরা ফাঁসির বিরোধিতা করেন। এ বিষয়ে আপনার অবস্থান যদি বলেন

শিরিন: আমি নিজেও ফাঁসির বিরুদ্ধে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও আমার দেশে ফাঁসির শাস্তি আছে। এর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোটা আমার লড়াই।

আপনি কি ইরানকে মিস করেন?

শিরিন: অবশ্যই। সেটা আমার জন্মভূমি না? ২০০৯ সালের পর থেকে আমি আর সেখানে নেই। আমি জেলে যাওয়ার ভয় পাই, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই। আপনারা হয়তো জানেন না, আমি জেলে থেকেছি এবং তার ভোগান্তি আমি জানি। কিন্তু সবাই যেমন আমাকে বলেছেন, আমারও মনে হয়েছে—আমার এমন জায়গায় থাকা দরকার, যেখানে বসে আমি কথা বলতে পারি। জেলে থাকলে কেউ আমাকে শুনতে পাবে না। আমি চাই আমার কথা ইরানি মানুষের কাজে আসুক। আমি জানি এটাই আমার কাজ ।

বাংলাদেশ নিয়ে কিছু বলবেন?

বাংলাদেশকে যতটা দেখছি, (মানুষের) অন্যরকম মন আছে। ১৯৭৯ সালে ইসলামিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ইরানে গণতন্ত্রের নামে চরম অগণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায়। ইসলামের নামে যে পরিবর্তনগুলো এলো, সেগুলো নিয়ে আমি কাজ শুরু করি। ইরানে পাথর ছুড়ে মারার শাস্তি আছে, হাত কেটে ফেলার নিয়ম আছে। বাংলাদেশও মুসলিম দেশ, এখানে এমন কোনও নিয়ম তো নেই। নারীর জীবনের মূল্য পুরুষের অর্ধেক! তারা বলে, দুজন নারী সাক্ষীর সমান একজন পুরুষ সাক্ষী। বাংলাদেশে অনেক কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়েছে। ইরানে সেটি সম্ভব হয়নি।