দেড় বছরে রাজধানীতে বাসা ভাড়ার নামে পাঁচ খুন

খুন

বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে গত দেড় বছরে রাজধানীতে পাঁচটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়েছে। এসব ঘটনায় নিহত সবাই নারী এবং তাদের বয়স ৫০ থেকে ৬৫ বছরের মধ্যে। ধরন অনুযায়ী ঘটনাগুলোর মিল থাকলেও এখন পর্যন্ত এসব হত্যাকাণ্ডে জড়িত কাউকে শনাক্ত বা হত্যারহস্য উদঘাটন করতে পারেননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। পুলিশ অবশ্য দাবি করেছে, প্রতিটি ঘটনাই গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে দেখা হয়েছে এবং হচ্ছে।  

ভুক্তভোগীদের পরিবারের সদস্য এবং  ঘটনাস্থলে থাকা একাধিক সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে হত্যাকারীর ছবি ও শারীরিক বর্ণনা পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। 

তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রাজধানীতে বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে যে হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হয়েছে, সেগুলোর ধরন একই। হত্যাকারী বাসা দেখার কথা বলে ভেতরে প্রবেশ করে এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে পেছন থেকে মাথায় আঘাত করে মধ্যবয়সী গৃহকর্ত্রীদের হত্যা করে। এরপর তাদের সঙ্গে থাকা স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায়। 

২০১৬ সালের ২৬ জুলাই থেকে ৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেড় মাসে রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকায় বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে পর পর চারটি হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। সর্বশেষ এ বছরের ৮ মার্চ দুপুরে তেজগাঁওয়ে পশ্চিম নাখালপাড়ায় (বাড়ি নং ২৮৮, রসুল ভিলা) একই ধরনের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এ নিয়ে গত দেড় বছরে রাজধানীতে বাড়ি ভাড়ার নামে পাঁচটি হত্যার ঘটনা ঘটানো হলো। 

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বাসা ভাড়া সংক্রান্ত কারণ দেখানো, হত্যার ধরন, ঘটনার সময় ও নিহতের কাছে থেকে স্বর্ণালংকার নেওয়া— এসব বিষয় বিবেচনা করে পাঁচটি হত্যাকাণ্ডের ধরন একই মনে হচ্ছে। তবে সব দিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানান তারা। সবগুলোর ক্ষেত্রে হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং আসামি অজ্ঞাত। এর মধ্যে অবশ্য দুটি ক্ষেত্রে ফাইনাল রিপোর্ট (চূড়ান্ত প্রতিবেদন) দিয়েছে পুলিশ।

পশ্চিম নাখালপাড়ায় গৃহকর্ত্রী হত্যা

তেজগাঁওয়ের পশ্চিম নাখালপাড়ার গত বৃহস্পতিবার (৮ মার্চ) দুপুরে বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে ভেতরে ঢুকে গৃহকর্ত্রী আমেনা বেগমকে (৬৫) কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পরে ওই গৃহকর্ত্রীর গলার চেইন ও হাতে থাকা স্বর্ণের চুড়ি খুলে নিয়ে যায় হত্যাকারী।

আমেনা বেগম হত্যার ঘটনায় এখনও কোনও ক্লু (যোগসূত্র) পাননি তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। তবে সবদিক বিবেচনায় নিয়ে তদন্ত করছে থানা পুলিশ। পাশাপাশি গোয়েন্দা পুলিশ ও র‌্যাবসহ পুলিশের সব ইউনিট ‘ছায়াতদন্ত’ করছে। 

তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) সত্যকি কবিরাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত করছি। এখনও কোনও ক্লু পাওয়া যায়নি। তবে সবদিক বিবেচনা করে ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে।’ 

দক্ষিণখানে চার খুন 

২০১৬ সালের ৮ সেপ্টেম্বর দুপুরে দক্ষিণখান গাওয়াইরের দক্ষিণপাড়ার ৭১৫ নম্বর বাড়িতে বাসা ভাড়া নেওয়ার কথা বলে ভেতরে ঢুকে ওয়াহিদা আক্তারকে (৫৫) খুন করে এক দুর্বৃত্ত।

ঘটনাটি তদন্ত করে দক্ষিণখান থানা পুলিশ কোনও ক্লু না পাওয়ায় মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নিহত ওয়াহিদা আক্তারের দেবর ইলিয়াস মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, “হত্যাকাণ্ডের দেড় বছর পার হয়ে গেলেও কোনও আসামিকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। এছাড়াও এমন একই ধরনের ঘটনা দক্ষিণখানে আরও কয়েকটি ঘটেছে। কিন্তু কোনোটারই আসামি গ্রেফতার হয়নি। পুলিশ খালি বলে, ‘এই ঘটনাগুলোর আসামি একজনই’।” 

এ বিষয়ে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও গোয়েন্দা পুলিশের ক্রাইম ইউনিটের পরিদর্শক মো. হাবিব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই ঘটনাটি ক্লুলেস (ক্লু বা যোগসূত্র পাওয়া যায়নি)। এখনও তদন্ত চলছে। আমরা আসামিকে শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছি।’ 

এর কিছুদিন আগে ৩১ আগস্ট দক্ষিণখানের আজমপুরের এ ব্লকের ৩/এ রোডের একটি বাড়িতে (৮১/৩৯ নম্বর) জেবুন্নিসা চৌধুরীকে (৫৫) একইভাবে কুপিয়ে আহত করে স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় হত্যাকারী। প্রায় দেড় বছর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩০ জানুয়ারি মারা যান তিনি।

নিহতের ছেলে আব্দুল কাইয়ুম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার সাক্ষ্য দিতে আদালত থেকে আমাদের তলব করেছিল। কিন্তু বিষয়টি থানা পুলিশ আমাদের জানায়নি। সে কারণে সাক্ষ্য দেওয়া হয়নি। তবে এই হত্যাকাণ্ডের আসামিকে পুলিশ শনাক্ত করতে পারেনি।’ 

২০১৬ সালের ২১ আগস্ট দক্ষিণখানের পূর্ব মোল্লারটেকের তেঁতুলতলায় গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগমকে (৫৫)একইভাবে হত্যা করা হয়। এটারও কোনও ক্লু পায়নি পুলিশ। 

একই বছরের ২৪ জুলাই দক্ষিণখানের উত্তর গাওয়াইরে গৃহকর্ত্রী শাহিদা বেগমকে (৫০) খুন করে স্বর্ণালঙ্কার নিয়ে পালিয়ে যায় হত্যাকারী।

নিহত শাহিদার ছেলে নাজমুল হুদা শাওন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেড় বছরেও আমার মায়ের খুনিকে ধরতে পারেনি পুলিশ। প্রায় সময় কর্মকর্তারা এসে কথা বলে যান, কিন্তু হত্যাকারীকে ধরতে পারেন না।’ 

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ চারটি বাসায় হত্যাকাণ্ড ঘটানো ছাড়াও হত্যাকারী আশপাশের আরও কয়েকটি বাসায় ঢুকেছিল। নিহতদের পরিবারের সদস্যের কাছে খুনির শারীরিক বর্ণনা শুনে এবং অন্যান্য বাড়ির সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ পর্যালোচনা করে তারা জানতে পেরেছেন, হত্যাকারীর বয়স ২৩ থেকে ২৬ বছরের মধ্যে হবে। তার কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ ছিল। সেই ব্যাগেই হয়তো ধারালো অস্ত্র বহন করতো সে।  

এ চার হত্যাকাণ্ডের তদন্তের অগ্রগতি প্রসঙ্গে দক্ষিণখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তপন চন্দ্র সাহা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চারটি হত্যাকাণ্ডের কোনোটিরই আসামি শনাক্ত হয়নি। তবে দুটি মামলার তদন্ত করছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এবং হত্যাকারী শনাক্ত না হওয়ার কারণে দুটি মামলায় ফাইনাল রিপোর্ট দেওয়া হয়েছে।’