মঙ্গলবার (২৭ মার্চ) সকাল সাড়ে ১১টার দিকে পল্লবীর (মিরপুর ১২ নম্বর সেকশন) ডি ব্লকের ১৯ নম্বর সড়কের ১৯/৪৩ ছয় তলা ওই বাড়ির নিচতলার গ্যারেজের রিজার্ভ পানির ট্যাংকে এই বিস্ফোরণ ঘটে।
দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বাড়িটির গ্যারেজে ছড়ানো-ছিটানো পোড়া জামাকাপড়, চুল, সিমেন্টের ব্যাগ, বৈদ্যুতিক তার, জুতাসহ বিভিন্ন বস্তু। প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ট্যাংকের আশপাশে থাকা মানুষগুলো দগ্ধ হন।
প্রত্যক্ষদর্শী জাকির হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমার বাসা পাশেই। বিস্ফোরণের শব্দ পেয়েই এখানে চলে আসি। এসে দেখি, রাস্তায় এক ব্যক্তি গড়াগড়ি করছে। ভেতর থেকে দগ্ধ অবস্থায় বাড়ির মালিক ইয়াকুব আলী (৭০) ও তার স্ত্রী হাসিনা আরা খানম (৬০) গ্যারেজের দিক থেকে চিৎকার করতে করতে বের হচ্ছেন। তাদের পেছনে এই বাড়িটির নিচতলার ভাড়াটিয়া ইয়াসমিন আক্তার (২৭) ও তার মেয়ে রুহীকেও (৩) কাপড় পেঁচিয়ে বের করে আনা হচ্ছে। এরপর তাদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়।’
জাকির হোসেন বলেন, ‘পানির ট্যাংকের ভেতর থেকে আগুন বের হয়ে বাইরে আসে। বিস্ফোরণে ট্যাংকের একটি ঢাকনা উড়ে উল্টে আগুন বের হয়ে আসে। দগ্ধদের সবার শরীরের চামড়া খসে খসে গেছে। মেয়েদের চুল পুড়ে গেছে।’
মামুন আরও বলেন, ‘পানির রিজার্ভ ট্যাংকটি অনেক বড়। অনেকদিন পর আজ পরিষ্কার করার জন্য শ্রমিক হাসানকে আনা হয়েছিল। সে ট্যাংকের ঢাকনা খুলে বৈদ্যুতিক বাল্ব দিয়ে ভেতরে দেখছিল। এসময় বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন নিচতলার ভাড়াটিয়াদের কাছ থেকে মোম নিয়ে তা জ্বালিয়ে মই দিয়ে ভেতরে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। মোম নিয়ে ট্যাংকের সামনে উঁকি দেওয়া মাত্রই বিস্ফোরণ ঘটে।’
ট্যাংক পরিষ্কারের কাজ তদারকির জন্য সেখানে ছিলেন বাড়িওয়ালা ও তার স্ত্রী। নিচতলার ভাড়াটিয়া ইয়াসমিন আক্তার ও তার তিন বছরের মেয়ে রুহীও সেখানে দাঁড়িয়ে কাজ দেখছিলেন বলে জানান তিনি।
দগ্ধদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। হাসপাতালে বসে বাড়িওয়ালা ইয়াকুব আলীর শ্যালক মো. মারুফ জানান, ট্যাংকের মুখের সামনে মোমবাতি জ্বালানোয় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটেছে। এতে সেখানে থাকা সবাই দগ্ধ হন। পরে আশপাশের লোকজন তাদের উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে, পরে সেখান থেকে দ্রুত ঢামেকে নিয়ে যান।
পানির ট্যাংকের ভেতরে এমন বিস্ফোরণে বাড়িটির পাশের প্রতিবেশীরা সবাই আতঙ্কিত। অনেকেই বিস্ফোরণের পর সেখানে দেখতে আসেন। গ্যারেজের দেয়াল, স্লিং ফ্যান, সিসি ক্যামেরা সব পুড়ে গেছে। আগুন নেভানোর জন্য দেয়ালে নিজের শরীর ঘষায় রক্তের ছোপ ছোপ দাগ দেখা গেছে। বিস্ফোরণের পর যখন আগুন লাগে, ওই সময় অনেকেই খুব বিটকুটে গন্ধও পেয়েছেন বলে জানান।
ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের পরিচালক (অপারেশন ও মেইনটেন্যান্স) মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পানির ট্যাংক দীর্ঘদিন ধরে পরিষ্কার না করলে অথবা মাঝে মধ্যে ঢাকনা না খুলে রাখলে মিথেন গ্যাস জমে থাকে। এই মিথেন জ্বালানি হিসেবে খুব ভালো। আগুনের স্পর্শ পেলেই বদ্ধ জায়গায় এই বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে।’
তিনি বলেন, রাজধানীতে এর আগেও একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পল্লবীর ঘটনাও মিথেন গ্যাসের কারণে বিস্ফোরণ হয়েছে বলে আমরা ধারণা করছি।
মেজর শাকিল বাড়িওয়ালাদের অনুরোধ করে বলেন, ‘ট্যাংক নিয়মিত পরিষ্কার করা উচিত। তা না হলে দীর্ঘদিনে মিথেন গ্যাস জমে যায়। অনেক দিন পর পর পরিষ্কার করলে ট্যাংকের মুখের ঢাকনা অন্তত এক ঘণ্টা বা তার বেশি সময় আগেই খুলে রাখতে হবে। তাহলেই দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে।’
এই ট্যাংকটিতেই ঘটেছিল বিস্ফোরণ। ভিডিওতে দেখুন ট্যাংকটি:
আরও পড়ুন-
রাজধানীতে বাসের ধাক্কায় মেয়ের মৃত্যু, মা আহত