রাষ্ট্র কখনও নিরাপত্তার অজুহাতে নাগরিকদের উৎসব-অনুষ্ঠান পালনে ও অংশগ্রহণে সময় বেঁধে দিতে পারে না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব ২৪ ঘণ্টা নাগরিকদের নিরাপত্তা বিধান করা ও সুরক্ষা দেওয়া। রাষ্ট্রের এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবেই নির্যাতনকারীদের কাছে নতি স্বীকার করার শামিল।
বৃহস্পতিবার (১২ এপ্রিল) সকালে জাতীয় প্রেসক্লাবের কনফারেন্স লাউঞ্জে নারী নিরাপত্তা জোট আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন এই জোটের আহ্বায়ক, মানবাধিকার কর্মী এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা সুলতানা কামাল।
তিনি বলেন, ‘পহেলা বৈশাখ একটি সর্বজনীন উৎসব। এ উৎসবে রাষ্ট্রের যেখানে নারীকে সুরক্ষা দেওয়ার কথা ছিল, তার প্রতিফলন না ঘটিয়ে বরং নারীকে আরও বদ্ধ করার মনোভাব প্রকাশ করছে,যা কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয়। আজ বিভিন্নভাবে নারীদের চলাচলকেও সংকুচিত করা হচ্ছে। যারা ভয়-ভীতি দেখায়,নির্যাতনের সংস্কৃতিকে বিশ্বাস করে,তারাই ২৪ ঘণ্টা মাঠে থাকবে। তাদের জন্য কোনও নির্দেশনা না রেখে সরকার পরোক্ষভাবে অপরাধীদের সমর্থন দিচ্ছে। অপরাধীর কাছেও হার মানছে। নারীকে ঘরেও অবরুদ্ধ করে রাখার এই সিদ্ধান্তের জন্য আমরা নিন্দা জানাই।প্রতিবাদ জানাই। অবিলম্বে এই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করতে সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই আমরা।’
অ্যাসিড সারভাইভারস ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক সেলিনা আহমেদ বলেন, ‘উন্নয়নের কথা বলে নারীকে আমরা আবদ্ধ করছি। নারীর চলাচলের স্থান বদ্ধ করে ফেলছি। আমরা উল্টো দিকে হাটছি কিনা? বাইরের নিরাপত্তার জন্য প্রশাসন সময় দিয়ে নারীকে সুরক্ষা করতে চায়। কিন্তু প্রতিনিয়ত ঘরে যে নির্যাতন চলছে,যে নিপীড়ন চলছে,চলন্ত বাসে যেভাবে নারীদের ধর্ষণ করা হচ্ছে,শিশুকন্যাও যেখানে রেহাই পাচ্ছে না— সেসব থেকে নারীকে কিভাবে সুরক্ষা দেবে সরকার? নারীকে বন্দি রেখে উন্নয়ন সম্ভব নয়। নারীকে নির্যাতন করে,অবরুদ্ধ করে মধ্যম আয়ের দেশ হওয়া কখনও সম্ভব নয়।’
মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন-এর কর্মসূচি সমন্বয়কারী মহুয়া লেয়া ফলিয়া নারী নিরাপত্তা জোটের পক্ষ থেকে অবস্থান পত্র পেশ করেন এবং দাবিগুলো তুলে ধরেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিকাল পাঁচটার পর জনগণ উন্মুক্ত স্থানে থাকতে পারবে না, এ ধরনের প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাতিল করা হোক। উন্মুক্ত স্থানগুলো যেন নারীপুরুষ সবার চলাচলের উপযোগী থাকে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। নারীর নিরাপত্তার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে গ্রহণ করতে হবে এবং নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে হবে। প্রতিটি নারী নির্যাতনের ঘটনায় অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।
এর আগে সংবাদ সম্মেলনে ‘আমরা পারি পারিবারিক নির্যাতন প্রতিরোধ জোট’ থেকে মিডিয়া স্ক্যানিংয়ের একটি চিত্র তুলে ধরা হয়। সেখানে মার্চ ২০১৭ থেকে ডিসেম্বর ২০১৭ পর্যন্ত ৯ মাসে ১৮৮৭টি নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে বলে উল্লেখ করা হয়। আরও বলা হয়— ২০১৭ সালের ৯ মাসে ৪৯৩টি ধর্ষণ, ৪৩০টি হত্যা এবং ১৭৯টি আত্মহত্যার ঘটনা ঘটেছে। শতকরা হিসাবে ধর্ষণ ২৬%, হত্যা ২৩% এবং আত্মহত্যা ১০%। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে রাজধানী ঢাকাতে, যার পরিমাণ ৯২৭টি।