‘ভিডিওতে সব দেখা যাচ্ছে, অথচ চোর শনাক্ত হচ্ছে না’






চুরির দৃশ্য (ভিডিও থেকে নেওয়া)রাজধানীর নিউমার্কেট থানা এলাকার চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলায় পাঁচটি দোকানে একই রাতে চুরি হয়। সাটার ভেঙে দোকান চুরির এই দৃশ্য মার্কেট ও দোকানের সিসি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে। এরপরও ঘটনার ১৯ দিনেও কোনও অপরাধী ধরা পড়েনি। এমনকি থানায় কোনও মামলাও হয়নি। পুলিশ বলছে, তারা বিষয়টি তদন্ত করছে।
গত ১৮ এপ্রিল রাত ৯ টা ৩৫ মিনিটের দিকে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের তৃতীয় তলার ‘নিউ ওয়ান ইন্টারন্যাশনাল’ নামের ৮, ৯ ও ১০ নম্বর দোকানের সাটার ভেঙে চুরি হয়। দোকানগুলোতে শিশুদের খেলনা আইটেম বিক্রি হয়। দোকানের মালিক রেজাউল করীম। চুরির পুরো দৃশ্য সিসি ক্যামেরায় ধারণ হয়েছে।
ভিডিওতে দেখা যায়, মার্কেটের সামনের বারান্দায় প্রথমে তিন যুবক মোবাইলে কথা বলতে বলতে হাঁটে। তারা মুখোশ পরা। নিউ ইন্টারন্যাশনাল দোকানের পেছনে তারা দাঁড়ায়। এদের মধ্যে দুজন একটি কালো চাদর বের করে সাটার ঘেঁষে দাঁড়ায়, আরেকজন দোকানের কোণে দাঁড়িয়ে পাহারা দেয়। এরপর এক তরুণ এসে চাদরের আড়ালে বসে সাটার ভেঙে ফেলে। এরপর ভেতরে ঢুকে দোকানের ড্রয়ার ভেঙে টাকা ব্যাগে ভরে নেয়। পুরো কাজটি করতে তাদের ১৫ মিনিটেরও কম সময় লেগেছে। এরপর তারা চলে যায়।
দোকানের মালিক রেজাউল করীমের ভাই মাসুদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা প্রতিদিন ৯টার দিকে দোকান বন্ধ করে থাকি। দোকান বন্ধ করতে করতে আধাঘণ্টা সময় লাগে। এরপর বাসায় চলে যাই। ১৮ এপ্রিল রাত ৯ টা ৩৫ মিনিটে দোকান বন্ধ করে বাসায় যাই। এর আগে দোকানের আশেপাশে দেখেছি কয়েকটা ছেলে মোবাইলে কথা বলছে আর হাঁটছে, আমরা ভাবছি তারা কাস্টমার। তাদের দেখলাম কয়েকজন স্টাফের সঙ্গেও কথা বলছে। তাই আর সন্দেহ হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘পরদিন সকালে আমাদের দোকানের কর্মচারী নূরে আলম দোকান খোলে। সে দোকান খুলে দেখতে পায় সবকিছু এলোমেলো। এরপর আমাদের ফোন দেয়। আমরা এসে দেখলাম ক্যাশের ড্রয়ার ভাঙা। কাগজপত্র এলোমেলো। বিষয়টি আমার ভাইকেও জানালাম। এরপর পুলিশকেও বিষয়টি আমরা জানাই। তবে পুলিশ এসে ভিডিওগুলো দেখে চলে যায়। মার্কেট সমিতির নেতাদেরও ভিডিওগুলো দেখানো হয়েছে।’

মামলা করছেন কিনা? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মামলা করে কী হবে? এর আগেও এরকম ঘটনা ঘটেছিল, কিন্তু তার কূলকিনারা কিছুই হয়নি। পুলিশের পেছনে দৌড়ে আরও সময় শেষ। ভিডিওতে সবকিছু দেখা যাচ্ছে, সব চকচকে, তারপরও শনাক্ত হচ্ছে না।’
মাসুদুর রহমান বলেন, ‘ঘটনার দৃশ্য সিসি ক্যামেরার ফুটেজে সব আছে। ভিডিওগুলো দেখলেই তাদের চিহ্নিত করা সম্ভব। কিন্তু এই কাজ কে করবে? আমাদের প্রায় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে গেছে।’
একই রাতে ওই মার্কেটের আরও দুটি দোকানে চুরি হয়। এর একটির নাম ‘জান্নাতি এন্টারপ্রাইজ’, অন্যটি ‘খান ইন্টারন্যাশনাল’। তবে দোকান দুটিতে টাকা কম ছিল। দোকান দুটির মালিকেরাও মামলা করেননি।
নিউ ওয়ান ইন্টারন্যাশনাল দোকানের ম্যানেজার আক্কাস আলী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের মার্কেটের নিরাপত্তা কড়া। তার ভেতরেও এই ঘটনা ঘটলো। আমরা পরদিন দোকানে এসে এমন অবস্থা দেখতে পাই। তবে ভিডিওতে দেখা লোকগুলোর কাউকে চিনি না।’
এবিষয়ে চন্দ্রিমা সুপার মার্কেটের দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হাফিজুর রহমান রাজু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঘটনার পর দোকানের মালিকই পুলিশকে খবর দিয়েছিল। পুলিশ এসেছিল, তারা ভিডিও দেখেছে ও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। তারা ভিডিওগুলোও নিয়েছে বলে আমি জানি। তবে এরপর আমি দেশের বাইরে চলে যাওয়ায় পরবর্তীতে কী হয়েছে তা বলতে পারবো না।’ তিনি বলেন, ‘এ ঘটনার পর আমাদের মার্কেটের নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে। এখন রাত ৯টার পর আর কাউকে মার্কেটে থাকতে দেওয়া হয় না। যদি কাউকে কাজের জন্য থাকতে হয় তাহলে তাকে মার্কেট কর্তৃপক্ষের লিখিত অনুমতি নিতে হয়।’
মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘এই ঘটনাটা নিয়ে আমার দোকানের স্টাফ ও নিরাপত্তাকর্মীদের সন্দেহ হচ্ছে। কারণ আমাদের এই মার্কেটের দোকানের মালিকরা কেউ ক্যাশে টাকা রাখে না। কারণ, এর আগেও চুরির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এই দোকানের ক্যাশে টাকা আছে, এটা জানলো কীভাবে তারা? আরও বড় বড় দোকান আছে, সেগুলোতে চুরি হলো না, বেছে এটাতেই চুরি হলো? এই বিষয়টি নিয়েই আমার সন্দেহ হয়। ঘটনার পর দোকান মালিককে ভিডিও দিয়ে পোস্টার বানিয়ে প্রকাশ করতে বলছিলাম। এদের শাস্তি হওয়া উচিত।’
বিষয়টি নিয়ে নিউমার্কেট থানা পুলিশ তদন্ত করছে বলে দাবি করেছে সংশ্লিষ্ট থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মতলুবুর রহমান। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘আমরা ভিডিও দেখেছি। মালিককে বলেছি, কেউ শনাক্ত হলে জানাতে। আমরাও তদন্ত করছি। তবে এখনও কেউ গ্রেফতার হয়নি। মালিক এখনও মামলা করেননি। তবে এই ঘটনায় মামলা হবে।’