রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনে অর্ধেকেরই বেশি সড়কে চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এ কারণে সড়কগুলোর বেশি অংশ দিয়ে যানবাহন চলাচল করতে পারছে না। আবার কোনও কোনও সড়কে সংস্কার কাজ শেষ না করেই বন্ধ রাখা হয়েছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই এসব সড়কে জলাবদ্ধতার পাশাপাশি ময়লা আর কাদামাটিতে একাকার হয়ে যায়। ঈদ সামনে, বিষয়টি নিয়ে সিটি করপোরেশনও বেশ উদ্বিগ্ন। সংস্থার মেয়র সংশ্লিষ্ট সেবা সংস্থাগুলোকে একাধিকবার তাগাদা দিলেও কেউই তা আমলে নিচ্ছে না।
সরেজমিন দেখা গেছে, পল্টন মোড় থেকে জাতীয় প্রেসক্লাব, দোয়েল চত্বর থেকে টিএসসি, শাহবাগ ও বাংলামোটর হয়ে সোনারগাঁও হোটেল পর্যন্ত মেট্রোরেল কর্তৃপক্ষের নির্মাণকাজের জন্য সড়কের অর্ধেক জায়গা কেটে রাখা হয়েছে। নগরবাসীকে এই সড়কগুলোতে চলতে গিয়ে সীমাহীন যানজটসহ দুর্ভোগ পোহাতে হয়। দুই থেকে তিন লেনের সড়কগুলোর দুটি লেনই বন্ধ রয়েছে। বাকি এক বা দুই লেন দিয়ে যানবাহনগুলোকে ধীরগতিতে চলাচল করতে হচ্ছে। দিনভর পুরো সড়কে যানজট লেগেই থাকে। পল্টন ও প্রেসক্লাব পর্যন্ত সড়কের বেহাল দশার কারণে যানবাহনগুলোকে বিকল্প সড়ক হিসেবে সেগুনবাগিচা এলাকার বিভিন্ন সড়ক ব্যবহার করতে হয়। এতে ওই এলাকায় যানজট লেগেই থাকে।
মোহাম্মদপুরে শারীরিক শিক্ষা কলেজের সামনে থেকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বর সড়কের আগ পর্যন্ত পুরো সড়কটির দুই পাশে ড্রেন নির্মাণের কাজ চলছে। স্থানীয় বাসিন্দা অভি জানান, এ বছরের শুরু থেকেই সড়কটির এই বেহাল অবস্থা। তিনি অভিযোগ করেন—এলাকাবাসীকে প্রতিদিনই ভোগান্তি পোহাতে হয়। এক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে আধঘণ্টার বেশি সময় লেগে যায়।
কাওরানবাজার থেকে ফার্মগেট পর্যন্ত সড়কের ডানপাশের লেনে খোঁড়াখুঁড়ির পর পর্যাপ্ত মাটি ভরাট না করায় এই অংশটি যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। খামারবাড়ি থেকে চন্দ্রিমা উদ্যান সংলগ্ন সড়ক, শেরেবাংলা নগর, আগারগাঁও, কাজীপাড়া, মিরপুর ১০ ও ১২ পর্যন্ত দুই লেনজুড়ে ড্রেন নির্মাণের জন্য পুরো রাস্তায় গর্ত করে রাখা হয়েছে। এই সড়কে যানজট লেগেই থাকে। সড়কটির বাকি অংশে মেট্রোরেলের কাজ চলমান থাকায় রাস্তা সংকুচিত হয়ে পড়েছে। সড়কটিতে সামান্য বৃষ্টি হলেই তীব্র যানজট লেগে যায়।
এছাড়া, গত কয়েকদিন ধরে একই ধরনের কর্মযজ্ঞ চলছে রাজধানীর মিরপুর, বনশ্রী, মালিবাগ, মগবাজার, রামপুরা, হাজীপাড়া, বাড্ডা, গুলশান, বনানী, বারিধারা, উত্তরার বিভিন্ন সেক্টর, গাবতলী, মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা, ধানমন্ডি, খিলগাঁও, বাসাবো, মধ্য বাসাবো, মাদারটেক, ছায়াবীথি, পদ্মকানন, ওয়াসা রোড, মদিনা সড়ক, পাটোয়ারী গলি, এলাহীবাগ, শরিফবাগ, সরকারপাড়া, শান্তিপাড়া, পাবনা গলি, বাগানবাড়ি, নতুনপাড়া, আদর্শপাড়া, সিলেটি গলি, মোহাম্মদপুর, জাকির হোসেন রোড, জহুরি মহল্লা, বিজরি মহল্লা, লালমাটিয়া, পুরান ঢাকার কবি নজরুল ইসলাম কলেজ থেকে লক্ষ্মীবাজার, সোহরাওয়ার্দী কলেজ মোড়, টিকাটুলি, হাটখোলাসহ বিভিন্ন এলাকা, যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ, মালিবাগ, খিলগাঁও, বাসাবো, মতিঝিল, আরামবাগ, মৌচাক, সেগুনবাগিচা, কমলাপুরসহ নগরীর বিভিন্ন এলাকায়। এ সময় এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, রাস্তাগুলো কাটা হয়েছে। কোথাও চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। কোথাও অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে সংস্কার কাজ। যেন দেখার কেউ নেই। ফলে এসব সড়কে যানজটের পাশাপাশি বাড়ছে দুর্ঘটনাও।
নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নগরীর সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা ও সড়ক খনন নীতিমালা অনুযায়ী কাজ না করায়, প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে যানজট ও জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। আর সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, আইন অনুযায়ী সেবা সংস্থাগুলো কাজ না করায় প্রতিবছরই এমন পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয় নগরবাসীকে। আর নগরবাসীর অভিযোগ—ঢাকার প্রায় সবক’টি কাজ গুটিকয়েক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে রয়েছে। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যাপ্ত পরিমাণ লোকবল নেই। যে কারণে কাজে ধীরগতি হচ্ছে।
জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ মোবাশ্বের হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নগরীতে একাধিক সেবা সংস্থা কাজ করে। প্রতিটি সংস্থাই তার নিজের মতো করে কাজ করছে। কারও সঙ্গে কারও কোনও সমন্বয় নেই। সমন্বিত কাজ না হলে জনগণের দুর্ভোগ বাড়বেই।’
ঢাকার দুই সিটিতে সব মিলিয়ে রাস্তার পরিমাণ দুই হাজার ৫০০ কিলোমিটার। এরমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটির ২৭টি প্রধান সড়ক এবং ২৫০টির মতো অভ্যন্তরীণ সড়কে চলছে বিভিন্ন সেবা সংস্থার খোঁড়াখুঁড়ি। আর সংস্থাটির নিজস্ব অর্থায়নে ২৬৯টি রাস্তায় চলছে উন্নয়ন কাজ। অন্যদিকে, দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের এক হাজার কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে ১৫টি প্রধান সড়কেই চলছে খোঁড়াখুঁড়ি। এরমধ্যে ২৫৯ দশমিক ৬১ কিলোমিটার সড়ক, ২৬১ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার ড্রেন এবং ৫১ দশমিক ৫১ কিলোমিটার ফুটপাতের নির্মাণকাজ চলছে। সব মিলিয়ে এমন অবস্থা প্রায় সড়ে ৫০০ কিলোমিটারে রাস্তায়। এছাড়া, সংস্থাটিতে নতুন যুক্ত হওয়া শ্যামপুর, দনিয়া, মাতুয়াইল, ও সারুলিয়া ইউনিয়নে ৭৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫২ দশমিক ৩৪ কিলোমিটার রাস্তা, ৬ দশমিক ১০ কিলোমিটার ফুটপাত, ১৫৮ দশমিক ৫০ কিলোমিটার নর্দমা, ১৪৩ দশমিক ৪৭ কিলোমিটার রাস্তায় উন্নয়ন কাজ চলছে। ফলে এসব সড়কে যানজট লেগেই থাকে।
সরেজমিন দেখা গেছে, খোঁড়াখুঁড়ির সময়ে সড়কের অর্ধেকটা জুড়ে ভেঙে ফেলা অংশের ধ্বংসাবশেষ, মাটি, বালু, ইট ফেলে রাখা হয়। দীর্ঘ সময়েও সেগুলো সরানো হয় না। ফলে বৃষ্টির সময় কাদামাটিতে ভরে যায় পুরো সড়ক। সৃষ্টি হয় দুঃসহ যানজট। সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না থাকায় উন্নয়ন কাজের প্রতি সাধারণ মানুষের বিরক্তি সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, সিটি করপোরেশনের সড়ক খনন নীতিমালা অনুযায়ী কোনও সড়ক কাটতে হলে সিটি করপোরেশন থেকে অনুমোদন নিতে হয়। অনুমোদনের ২৮ দিনের মধ্যে কাজ শেষে রাস্তা পুনরায় মেরামত করে দিতে হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো ২৮ দিনের জন্য অনুমোদন নিলেও মাসের পর মাস খনন করা অংশ মেরামত করে না।
সম্প্রতি নগরীর সেবা সংস্থাগুলো নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সমন্বয় সভায় মেয়র সাঈদ খোকন সেবা সংস্থাগুলোকে রাস্তা খোঁড়ার চাহিদাপত্র অন্তত বর্ষা মৌসুমের ছয় মাস আগে দেওয়ার নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, ‘বর্ষা মৌসুমে কোনও সড়ক খননের অনুমোদন দেওয়া হবে না।’
জানতে চাইলে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মোহাম্মদ বিলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা জরুরি প্রয়োজনে অন্য সেবা সংস্থাগুলোকে বিভিন্ন শর্তসাপেক্ষে সড়ক কাটার অনুমতি দিয়ে থাকি। কিন্তু অনেক সংস্থা আছে, যারা শর্তগুলোর সঠিক বাস্তবায়ন করে না। তাছাড়া, সরকারের বড় বড় উন্নয়ন কাজের জন্যও সড়ক কাটতে হয়। সেক্ষেত্রে আমরা যতদূর সম্ভব চেষ্টা করি জনগণের দুর্ভোগ কমিয়ে কম সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করতে।’
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী সৈয়দ কুদরাতুল্লাহ বলেন, ‘বিশেষ প্রয়োজনে সড়ক খননের অনুমোদন দেওয়া হয় ওয়ানস্টপ সেল থেকে। তবে ওই সেল থেকে এই নির্দেশনাও দেওয়া হয়, খননের কারণে যেন জনদুর্ভোগ সৃষ্টি না হয়।