মোটরসাইকেলের লক ভাঙতে লাগে ২৫ সেকেন্ড!





আটক হওযা গাড়িচোর চক্রের সদস্যরা

মাত্র ২৫ সেকেন্ড সময়ের মধ্যে একটি মোটরসাইকেলের লক ভাঙতে পারে আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বাধীন গাড়িচোর চক্র। রাত ১২টার পর থেকে শুরু করে ভোররাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসা-বাড়ির গ্যারেজসহ বিভিন্ন মার্কেট, হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজের সামনে থেকে গাড়ি চুরি করে চাঁদপুরসহ কয়েকটি এলাকায় নিয়ে বেচে তারা।
এই চক্রটির একটি মোটরসাইকেল চুরি করতে খরচ হয় এক থেকে দেড় হাজার টাকা। আর বেচা হয় ৭০ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত।
গত ২৯ জুলাই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ১২ জনকে ১০টি চোরাই মোটরসাইকেল ও একটি সিএনজিসহ আটক করা হয়। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তাদের কাছ থেকে এসব তথ্য জানতে পেরেছে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ।
আটক হওয়া ব্যক্তিরা হলো আবুল কামার আজাদ, মাহবুব মানিক, রাশেদুল ইসলাম অরফে রাসেল, মো. বাবুল, জামাল আহমেদ, আনোয়ার হাওলাদার, সোহেল নিয়াজী, মো. শহিদুল্লাহ, মো. রুবেল, মো. সালাউদ্দিন, ফারুক ও কামরুল হাসান ওরফে আশিক।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তারা জানান, এই গাড়িচোর চক্রের প্রধান আবুল কালাম আজাদ। বাকিরা তার সহযোগী হিসেবে কাজ করে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার সদস্যরা এই চক্রের সঙ্গে জড়িত। তারা মোটরসাইকেল চুরির আগে রেকি করা থেকে শুরু করে বেচা পর্যন্ত— বিভিন্ন পর্যায়ে যুক্ত থাকে।
চোরচক্রের প্রধান আবুল কালাম আজাদ ও মাহবুব মানিক গাড়ির লক ভাঙার কাজে পারদর্শী বলে জানান গোয়েন্দারা। তাদের দাবি, একটি বিশেষ ধরনের চাবি রয়েছে তাদের কাছে। যা ‘এলেংকি’ নামে পরিচিত। এই চাবি দিয়ে যেকোনও ধরনের মোটরসাইকেলের লক ভাঙা যায়। একটি মোটরসাইকেলে লক ভাঙতে সময় লাগে মাত্র ২৫ সেকেন্ড। পরিস্থিতি অনুযায়ী সময় বাড়ে। তবে মূল বিষয় হলো, লক ভাঙা এই চক্রের সদস্যদের কাছে অনেকটা বাম হাতের খেলার মতো। একটি গাড়ি চুরি থেকে বেচা পর্যন্ত খরচ হয় সর্বোচ্চ দেড় হাজার টাকা। আর চোরাই একটি মোটরসাইকেল বেচা হয় ৭০ হাজার থেকে শুরু করে এক লাখ ৩০ হাজার টাকা।
ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ওবায়দুর রহমান আটক হওয়া ব্যক্তিদের বরাত দিয়ে জানান, বাবুল সিএনজি চালিত অটোরিক্সা চালিয়ে মানিক, কালাম ও রাসেলকে নিয়ে বিভিন্ন মার্কেট, বাসা-বাড়িতে মোটরসাইকেল চুরি করার জন্য রেকি করে। রেকির একপর্যায়ে পছন্দমতো মোটরসাইকেলের আশেপাশে বাবুল সিএনজি চালিত অটোরিক্সা নিয়ে অপেক্ষা করে এবং সিএনজি থেকেই লোকজনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করে।
উদ্ধার হওয়া মোটরসাইকেল ও সিএনজি

চুরি থেকে বেচা— পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে গোয়েন্দা জানান, সংঘবদ্ধ এই চোরচক্রের সদস্যদের মধ্যে আবুল কালাম আজাদ ও মাহবুব মানিক লক ভাঙা ও চুরির কাজটি করে থাকে। রাত ১২টার পর থেকে ভোর পর্যন্ত বাসা-বাড়ির গ্যারেজ থেকে এবং দিনের বেলায় বিভিন্ন মার্কেট, হাসপাতাল ও স্কুল-কলেজের সামনে থেকে গাড়িগুলো চুরি করে তারা। টার্গেট করা মোটরসাইকেলটি চুরি করার পর একই চক্রের সদস্য জামাল ও আনোয়ার গাড়িটি নির্দিষ্ট গন্তব্যে নিয়ে যায়। তারা রুবেল ও ফারুকের কাছে সেটি হস্তান্তর করে। পরে রুবেল ও ফারুক চাঁদপুরের শাহরাস্তি এলাকায় পৌঁছে দেয়। সেখান থেকেই মোটরসাইকেলটি বেচে টাকা বিকাশের মাধ্যমে চোরচক্রের প্রধান আজাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আজাদ সেই টাকা প্রাপ্য অনুযায়ী সবার মধ্যে ভাগ করে দেয়।
আজাদকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, গত ছয় বছর ধরে মোটরসাইকেল চুরির সঙ্গে জড়িত আবুল কালাম আজাদ। এরই মধ্যে অন্তত ছয়বার জেল খেটেছে সে। তার বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে অন্তত ১২টি। আর এই সময়ের মধ্যে ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করেছে ৮ শতাধিক।
ডিএমপি গোয়েন্দা দক্ষিণ বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার রাজিব আল মাসুদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এই চক্রের সদস্যরা দুটি উপায়ে গাড়ির লক ভেঙে থাকে। একটি পদ্ধতি হলো ‘মাস্টার কি’ দিয়ে লক ভেঙে চুরি। আর অন্যটি হলো মোটরসাইকেলের ইঞ্জিনের ভেতর থেকে দুটি তার এক করে ম্যানুয়ালি স্টার্ট করা। খুব কম সময়ে তারা এই কাজ করতে পারে।’
মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের গাড়ি চুরি প্রতিরোধ টিমের তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, এসব সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্যরা আটক হওয়ার পর আদালত থেকে সহজে জামিন পেয়ে যায়। তাদের জন্য নির্ধারিত প্যানেল ল’ইয়ার রয়েছে। আসামি আদালতে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্যানেল ল’ইয়াররা তাদের পক্ষে দাঁড়িয়ে যান। যে কারণে এ চক্রের সদস্যরা সহজেই ছাড় পেয়ে যায়।