পছন্দমতো চিকিৎসক পাবেন খালেদা জিয়া, বিএসএমএমইউতে ভর্তির নির্দেশ


খালেদা জিয়া


দুর্নীতির মামলায় কারাদণ্ডপ্রাপ্ত বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পছন্দমতো চিকিৎসকদের দ্বারা নিজের চিকিৎসা করাতে পারবেন মর্মে নির্দেশনা দিয়েছেন হাইকোর্ট। একইসঙ্গে দ্রুত সময়ের মধ্যে সরকার, কারা কর্তৃপক্ষ ও বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে এই নির্দেশনা বাস্তবায়ন করতে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এছাড়াও খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য গঠিত মেডিক্যাল বোর্ড পুনর্গঠন করে সেখানে বিএসএমএমইউ এর ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. বদরুন্নেসা আহমেদকে রেখে স্বাচিপ বা ড্যাবের সদস্য বা কর্মকর্তা নয় এমন আরও তিনজনকে যুক্ত করে ৫ সদস্যের বোর্ড গঠন করতে বলেছেন আদালত। আর এ বোর্ডের অধীনে খালেদা জিয়া তার পছন্দমতো ফিজিওথেরাপিস্ট বা গাইনোকলোজিস্ট বা মেডিক্যাল টেকনিশিয়ান নিযুক্ত করতে পারবেন বলেও আদালত তার নির্দেশে বলেছেন।  
বৃহস্পতিবার (৪ অক্টোবর) বিচারপতি শেখ হাসান আরিফ ও বিচারপতি রাজিক আল জলিলের হাইকোর্ট বেঞ্চ এ আদেশ দেন।

আদালতে খালেদা জিয়ার পক্ষে উপস্থিত ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী, অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন, এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, বদরুদ্দোজা বাদল, এ কে এম এহসানানুর রহমান প্রমুখ। অন্যদিকে, রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
এরপর খালেদা জিয়ার পক্ষে তার আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন সাংবাদিকদের বলেন, আদালত খালেদা জিয়ার চিকিৎসার জন্য  নতুন করে পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর তিন জন চিকিৎসক থাকবেন খালেদা জিয়ার পছন্দ অনুযায়ী এবং বাকি দুজন থাকবেন নিরপেক্ষ চিকিৎসক।

এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই আইনজীবী সাংবাদিকদের বলেন, এর আগে সরকার যে পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করেছিল তার তিন জন সদস্য ছিল স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সদস্য। এটি আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের সংগঠন। তাই তাদের ব্যাপারে খালেদা জিয়া আপত্তি জানিয়েছেন। এটা আদালতকে আমরা বলেছি। অ্যাটর্নি জেনারেলও এ বিষয়ে কোনও ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। এরপর আদালত দল নিরপেক্ষ দুই চিকিৎসকসহ খালেদা জিয়ার নিজের পছন্দের আরও তিন চিকিৎসককে নিয়ে মোট পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের আদেশ দিয়েছেন।
এছাড়াও খালেদা জিয়াকে দ্রুত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির কথাও বলেছেন আদালত জানিয়ে এই আইনজীবী বলেন, আমরা খালেদা জিয়ার ইচ্ছা অনুযায়ী বেসরকারি বিশেষায়িত হাসপাতালের কথা বলেছিলাম। কিন্তু আদালত সবদিক বিবেচনা করে বিএসএমএমইউতে খালেদা জিয়াকে দ্রুত ভর্তির আদেশ দিয়েছেন।

এদিকে রায়ের পর অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘কারাবন্দি খালেদা জিয়ার চিকিৎসার ব্যাপারে সরকার আন্তরিক। তার চিকিৎসা নিয়ে সরকার কখনোই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল দেশের শ্রেষ্ঠ হাসপাতাল। গত এপ্রিলে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি সেখানে চিকিৎসা নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন।’  তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়ার পক্ষ থেকে যে রিট পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল, যাতে আদেশ চাওয়া হয়েছিল, তাকে যেন তার ইচ্ছা ও পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে দেওয়া হয়। এছাড়া রিটে খালেদা জিয়ার জন্য যে মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল, সেই বোর্ড করা হয়েছিল। তার মধ্যে তিনজন ডাক্তারের বিষয়ে তারা আপত্তি জানিয়েছিল যে, তারা স্বাচিপের (স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের) সঙ্গে যুক্ত। তাই এ মামলাটির ওপর গত দুই দিন শুনানি হয়েছে। আজকে এই মামলায় আদালত আদেশ দিয়েছেন।’
এই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করা হবে কিনা, জানতে চাইলে মাহবুবে আলম বলেন, ‘আমরা এই আদেশের বিরোধিতা করিনি। তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। তাই তার পছন্দমতো বা ইচ্ছামতো হাসপাতালে চিকিৎসা হতে পারে না। তাকে চিকিৎসা সরকার দেবে। তবে তা সরকারে অধীনে রেখে। তাই তার নিরাপত্তার কথা ভেবেই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আদালত বলেছেন, যেহেতু তিনি একজন দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, তাই তাকে সরকারের পছন্দমতো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হবে।’
প্রসঙ্গত, গত ৯ সেপ্টেম্বর বিশেষায়িত হাসপাতালে খালেদা জিয়ার চিকিৎসার নির্দেশনা চেয়ে উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়। তবে রিটটির শুনানি বারেবারে পিছিয়ে যায়।
এদিকে ওই দিনই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে দেখা করে কারাবন্দি খালেদা জিয়ার পছন্দ অনুযায়ী রাজধানীর কোনও বিশেষায়িত হাসপাতালে তার চিকিৎসা করানোর অনুরোধ জানায়। এরপরই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় মেডিক্যাল বোর্ড গঠনের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এরপর ১৩ সেপ্টেম্বর পাঁচ সদস্যের মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করে বিএসএমএমইউ। ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ডা. মো. আব্দুল জলিল চৌধুরীকে বোর্ডের প্রধান করে গঠন করা বোর্ডের অন্য সদস্যরা হলেন, কার্ডিওলজি বিভাগের অধ্যাপক হারিসুল হক, অর্থোপেডিক সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবু জাফর চৌধুরী বীরু, চক্ষু বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. তারিক রেজা আলী ও ফিজিক্যাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক বদরুন্নেসা আহমেদ।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে গঠিত এই মেডিক্যাল বোর্ডের চিকিৎসকরা ১৫ সেপ্টেম্বর বিকালে পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডে অবস্থিত পুরনো কারাগারের দোতলার কারাকক্ষে গিয়ে ২০ মিনিট ধরে খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। পরদিন ১৬ সেপ্টেম্বর সেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন প্রকাশ করে বিএসএমএমইউ। তবে এ বোর্ডের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে বিএনপি থেকে বারবার প্রশ্ন তোলা হয়। মেডিক্যাল বোর্ডের সব চিকিৎসক আওয়ামীপন্থী স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সদস্য, তাই তাদের চিকিৎসায় খালেদা জিয়ার শঙ্কা ও আপত্তি রয়েছে আলোচনায় আসে এমন বিষয়ও।

বন্দি থাকা অবস্থায় তার স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য এর আগেও একবার মেডিক্যাল বোর্ড গঠন করা হয়েছিল। সেসময়েও স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর মেডিক্যাল বোর্ড বলেছিল, খালেদা জিয়ার অবস্থা গুরুতর নয়। তখন চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শারীরিক পরীক্ষা করতে ৭ এপ্রিল খালেদা জিয়াকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে নেওয়া হয়েছিল।
উল্লেখ্য, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় পাঁচ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে এই বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে পুরনো ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি রয়েছেন খালেদা জিয়া।