চিকিৎসকরা জানান, অস্ত্রোপচার কক্ষ জীবাণুমুক্ত রাখা রোগীর নিরাপত্তার জন্য জরুরি। তাই সেখানে দক্ষ কর্মী খুবই প্রয়োজন। পাশাপাশি অস্ত্রোপচার কক্ষে যেন ধুলা-ময়লা না জমে সেদিকেও লক্ষ রাখা দরকার। এমনকি ওই কক্ষে ব্যবহৃত টাইলসের ফাঁকে জমে থাকা ধুলা থেকেও হতে পারে সংক্রমণ। অস্ত্রোপচার কক্ষে ব্যবহৃত প্রতিটি জিনিস পুরোপুরি জীবাণুমুক্ত করার পরই কেবল সেটি ব্যবহার উচিত।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের সার্জারি বিভাগের রেজিস্ট্রার ডা. রাজীব দে সরকার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘চিকিৎসক ছাড়া আমাদের অস্ত্রোপচার কক্ষের স্টাফরা (সিস্টার, ওটি বয়, ক্লিনার) কেউই প্রশিক্ষিত না। তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষতা বাড়ানো দরকার। একজন চিকিৎসক অস্ত্রোপচারের পর ওটিতে রোগীর যে রক্ত, মলমূত্র বা অন্যান্য নোংরা পড়ে থাকে সেগুলো পরিষ্কার করার দায়িত্ব ওটির স্টাফদের। রক্ত পড়ে থাকলে সিস্টারের দায়িত্ব হচ্ছে সঙ্গে সঙ্গে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করা। সিস্টারের হয়তো তা খেয়ালই নেই। তিনি একঘণ্টা পরে পরিষ্কারের ব্যবস্থা করলেন। রক্ত কিছুক্ষণ পড়ে থাকার পরে সেটা জীবাণুর খাবার হতে পারে। আবার রক্তেও জীবাণু থাকতে পারে। তাই একজন রোগীর জীবাণু দ্রুত না সরিয়ে ফেললে অন্য রোগীদের মধ্যেও তা ছড়িয়ে পড়ে। তবে সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওটির অবস্থা খুবই ভালো। এছাড়া ওটিতে রোগীর স্বজনরা ঢুকে পড়ে জীবাণু নিয়ে আসেন। এ কারণে ওটির ভালো নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলা দরকার। হাসপাতালের ৪০ ভাগ পদ খালি থাকায় প্রয়োজনীয় লোকবল পাওয়া যাচ্ছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমি যে শার্টটি পরে আছি এটাতে যে জীবাণু আছে সেটা আমাকে আক্রান্ত করছে না, কিন্তু রোগীকে সহজেই আক্রান্ত করতে পারে। কারণ রোগীর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। তবুও আমি বলব, এখন বাংলাদেশের অস্ত্রোপচার কক্ষ অনেক ভালো। কারণ, একজনের ইনফেকশন হলে তো সেটা আমার উপরও বর্তায়। কাউকে অ্যাপেন্ডিসাইটিসের অস্ত্রোপচার করালাম, কিছুদিন পরে সে সেপ্টিসেমিয়ায় মারা গেল। এটা তো আমার জন্যও কষ্টের।’
স্বাস্থ্য অধিদফতরের মেডিক্যাল অফিসার ডা. মারুফুর রহমান অপু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের দেশের অপারেশন থিয়েটারগুলো প্রতিষ্ঠাকাল, মালিকানা, অবস্থান ইত্যাদি ভেদে বিভিন্ন রকম। বড় শহরের ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে অপারেশন থিয়েটার যথেষ্ট বৈজ্ঞানিক উপায়েই নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করার চেষ্টা করা হয়। নতুন প্রতিষ্ঠিত সরকারি হাসপাতালগুলোও প্রায় একই। তবে পুরনো সরকারি হাসপাতাল, বিশেষ করে, যেখানে প্রচুর রোগীর অপারেশন হয় সেসব স্থানে অপারেশন থিয়েটার ব্যবস্থাপনা খুবই নাজুক। একদিকে রোগীর চাপ, অন্যদিকে লোকবলের অভাব। লোকের অভাবে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নেওয়া কর্মীদের কর্মদক্ষতার অভাব, তাদের তৈরি করা সিন্ডিকেট ইত্যাদির কারণে অপারেশন থিয়েটারের জীবাণুমুক্ত অবস্থা নিশ্চিত করা যায় না। জীবাণুমুক্ত পোশাক ছাড়াই রোগী, রোগী বহনকারী কর্মী, রোগীর আত্মীয়-স্বজন বাইরের পোশাকে ঢুকে পড়েন বা ওটির পোশাক পরে বাইরে গিয়ে আবার ভেতরে ঢোকেন। ফলে জীবাণু সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে, গাইনি ও অবস্টেট্রিক্স বিভাগের অপারেশন থিয়েটারগুলোতে এই সমস্যা প্রবল। কর্মী স্বল্পতা বা অদক্ষতার কারণে অপারেশনে ব্যবহৃত সরঞ্জামাদি জীবাণুমুক্তকরণ ও পরিচ্ছন্নতা প্রক্রিয়া ত্রুটিপূর্ণ থেকে যায়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার নীতিমালাও ঠিকমতো মানা হয় না।’
তিনি আরও বলেন, ‘শহরের বাইরে তো বটেই এমনকি খোদ ঢাকাতেই অনেক বেসরকারি হাসপাতালেও এ ধরনের সমস্যা রয়েছে। ওটি নিরাপদ ও জীবাণুমুক্ত রাখতে যে সকল নীতিমালা মেনে চলা দরকার তা মানা হচ্ছে না। উপজেলা বা জেলাতেও নিবন্ধিত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্টাফ ছাড়াই চলছে ছোট ছোট ক্লিনিক। অপারেশন থিয়েটারের ন্যূনতম মানও এসব স্থানে নেই। এগুলো রুখতে আলাদাভাবে অপারেশন থিয়েটার লাইসেন্স ও গ্রেডিং পদ্ধতি চালু করা প্রয়োজন। আলাদাভাবে অপারেশন থিয়েটার ক্লিনিক্যাল অডিট হওয়া প্রয়োজন। তাহলেই রোগীর সুস্থ্তা নিশ্চিত করা যাবে।’
এ প্রসঙ্গে রাজীব দে সরকার বলেন, ‘আমাদের সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজে আলাদা পাঁচ সদস্যের কমিটি করা আছে। তারা ওটির বিষয়টি তদারক করে। আমরা রোগী ও স্টাফ এই দুই গ্রুপকে যদি শিক্ষিত করতে না পারি তাহলে যতই আধুনিক ব্যবস্থা আনি না কেন ওটিকে জীবাণুমুক্ত রাখতে পারব না। একটি জীবাণুর কারণে আমাদের সারাদিনের পরিশ্রম জলে যাবে। তাই ওটির সঙ্গে যুক্তদের অবশ্যই আগে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এটা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানও দিতে পারে। আবার স্বাস্থ্য অধিদফতরও দিতে পারে।’
বাংলাদেশ হেলথ রাইটস মুভমেন্টের ন্যাশনাল কমিটির প্রেসিডেন্ট ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উপরই নির্ভর করে ওটির অবস্থা। পুরো সিস্টেম যদি ঠিক না থাকে তাহলে ওটি ভালো হবে, এমনটি আশা করা যায় না। আমাদের পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার যত দ্রুত উন্নয়ন হবে তত দ্রুত ওটিরও উন্নয়ন হবে।’