গত ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশি নাগরিক সূর্য মনিকে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোর উপকণ্ঠের মাউন্ট লাভিয়ানা এলাকা থেকে ৩২ কেজি হেরোইনসহ আটক করে দেশটির পুলিশ। সূর্য মনি গত অক্টোবরের শুরুতে মালয়েশিয়া থেকে কলম্বো যায় বলে মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর তথ্য পেয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, ‘সূর্য মনি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার একটি প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে। তার বাবার নাম মো. সাত্তার। বাবা কৃষি কাজ করে। তারা দুই ভাই-বোন।’
তিনি বলেন, ‘বাবার আর্থিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় সূর্য মনিরা দুই ভাই-বোন ঢাকায় চলে আসে। সূর্য মনি প্রথমে গৃহকর্মী হিসেবে উত্তরা ও গুলশানের কয়েকটি বাসায় কাজ করে। ভাইটি কয়েক বছর পোশাক কারখানায় কাজ করে বাড়ি ফিরে যায়। পরে সূর্য মনি পোশাক কারখানায় কাজ করতে থাকে। সেসময় পরিচয় হয় চয়েজ আহম্মেদ নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে। এই ব্যক্তির গুলশানে একটি বায়িং হাউজ রয়েছে। চয়েজ আহম্মেদ তার বায়িং হাউজে সূর্য মনিকে চাকরি দেয় এবং নিজের বাসায় তার সঙ্গে থাকতে বাধ্য করে। সূর্য মনিকে পাসপোর্ট করে দেয়। এরপর মালয়েশিয়া ও শ্রীলঙ্কা রুটে যাত্রীবেশে কয়েকবার পাঠানো হয় সূর্য মনিকে। সে চার বার কলম্বো যায়। এই যাতায়াতের সময় তাকে মাদকের বাহক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে বলে ধারণা করছে পুলিশ।’
কলম্বোয় সূর্য মনি গ্রেফতারের পর তার বিষয়ে বাংলাদেশকে প্রাথমিক তথ্য দেয় শ্রীলঙ্কা। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে শ্রীলঙ্কা পুলিশ গত ৩১ ডিসেম্বর মো. জামাল উদ্দিন ও দেওয়ান রাফিউল ইসলাম নামে আরও দুজনকে একই এলাকা থেকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে ২৭২ কেজি হেরোইন ও ৫ কেজি কোকেন উদ্ধার করা হয়। আটক মাদকের দাম বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ১৫২ কোটি টাকা।
এই চক্রটি আফগানিস্তান, করাচি, কুয়ালালামপু, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কায় মাদক আনা-নেওয়া করতো বলে শ্রীলঙ্কান পুলিশ দাবি করেছে।
শ্রীলঙ্কায় হেরোইন ও কোকেনসহ বাংলাদেশি গ্রেফতারের ঘটনায় ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় সিআইডি’র এএসপি মো. ইকবাল বাদী হয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করে। এর আগে গত ৫ জানুয়ারি উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার একটি বাড়ি থেকে চয়েজ আহম্মেদকে গ্রেফতার করে সিআইডি ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের যৌথ টিম। সে বর্তমানে কারাগারে রয়েছে।
অপরদিকে শ্রীলঙ্কায় গ্রেফতার অপর দুই ব্যক্তির মধ্যে জামাল উদ্দিনের গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়। বগুড়ার পুলিশের নথিতে সে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী। তার বিরুদ্ধে মাদকের একটি মামলা বগুড়ার আদালতে বিচারাধীন। অন্যজন জয়পুরহাটের দেওয়ান রাফিউল ইসলাম অবস্থাপন্ন কৃষক পরিবারের সন্তান। সেখানে তার বা তার পরিবারের কারও বিরুদ্ধে কোনও মামলা নেই।
শ্রীলঙ্কায় ধরা পড়ার আগে জামাল উদ্দিন ২০১৭ সালের ১২ আগস্ট বগুড়া জেলা গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে ৩০টি ইয়াবা বড়িসহ গ্রেফতার হয়েছিল। এ ঘটনায় ডিবির তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি মামলা করেছিলেন। তদন্ত শেষে বগুড়া সদর থানার উপপরিদর্শক নাছিম উদ্দিন একই বছরের ১৬ সেপ্টেম্বর এ মামলায় জামাল উদ্দিনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেন। মামলাটি বগুড়ার একটি আদালতে বিচারাধীন।
ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ থেকে ৬ সদস্যের একটি দল গত ১৬ জানুয়ারি শ্রীলঙ্কায় যায়। এই দলে রয়েছেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন, সিআইডির একজন, র্যা বের একজন, স্পেশাল ব্রাঞ্চের (এসবি) একজন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের দুজন কর্মকর্তা। তারা ২১ জানুয়ারি ঢাকায় ফিরে আসেন।
এই প্রতিনিধি দলে ছিলেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) আব্দুর রাজ্জাক। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা শ্রীলঙ্কার পুলিশের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছি। আমরা যাওয়ায় তারা খুব খুশি হয়েছে। আমাদের তদন্তের অগ্রগতি তাদের জানিয়েছি। পাশাপাশি তারাও তাদের বিষয়গুলো আলোচনা করেছে। আমরা গ্রেফতার তিনজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। গ্রেফতার তিনজনই চয়েজে আহম্মেদের বায়িং হাউজে একসময় কাজ করতো। তারা মূলত বাহক। আমাদের সিআইডি মামলাটি তদন্ত করছে। তারা এবিষয়ে অগ্রগতি জানাবে।’
শ্রীলঙ্কার পুলিশের বরাত দিয়ে তিনি জানান, শ্রীলঙ্কার মোট জনসংখ্যার দুই শতাংশ মানুষ হিরোইনে আসক্ত। মাদক চোরাকারবারীরা আফগানিস্তান, করাচি হয়ে শ্রীলঙ্কায় মাদক ঢোকায়। কিছু কিছু মাদক মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড হয়েও প্রবেশ করে।
সিআইডির এক কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুবাই, থাইল্যান্ডে আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারীরা দক্ষিণ এশিয়াতে মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করে। শ্রীলঙ্কায় হিরোইনের চাহিদা থাকায় স্থল ও নৌপথে অবৈধভাবে প্রবেশ করানো হয়।’
আরও পড়ুন...