বিদ্যুৎ-পানি ছাড়াই চলছে ডিএসসিসি’র ‘আধুনিক’ বর্জ্যঘর

বাইরে থেকে বর্জ্যঘরের চিত্রবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য নগরীর বিভিন্ন স্থানে ৫০টি আধুনিক বর্জ্যঘর (সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন-এসটিএস) নির্মাণের উদ্যোগ নেয় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসি। এরইমধ্যে নির্মাণ শেষে ২১টি এসটিএস চালু করা হয়েছে।  এ ধরনের দু’টি এসটিএস রয়েছে হাজারীবাগের বেড়িবাঁধ সংলগ্ন এলাকায়। প্রায় পাঁচ কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ওই এসটিএস দু’টিতে উদ্বোধনের পর থেকে বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ বিচ্ছিন্ন রয়েছে। এ কারণে সুষ্ঠুভাবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা করা যাচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।  উপরন্তু, বর্জ্যের দুর্গন্ধের  কারণে এলাকাবাসীকে অসহনীয় দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।  

বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে আরবান পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হেল্থ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (ইউপিইএইচএসডিপি) আওতায় নির্মিত এসটিএস দুটিতে সরেজমিনে দেখা গেছে, পানি ও লিফটার মোটরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, দরজা-জানালা ভাঙা, বৈদ্যুতিক বাল্ব নষ্ট,দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ছাদের টিন মরিচা ধরে ফুটো হয়ে গেছে,অফিস রুমের বৈদ্যুতিক পাখা বিকলসহ নানান সমস্যা বিরাজ করছে। এ নিয়ে ডিএসসিসি’র কোনও উদ্যোগ নেই। অভিযোগ উঠেছে, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার এসটিএস দু’টি নির্মাণ করায় এমন অবস্থা বিরাজ করছে। এ দু’টি এসটিএস ছাড়া বাকিগুলোতে কিছু সমস্যা থাকলেও সেগুলো অপেক্ষাকৃত ভালো অবস্থায় দেখা গেছে।

হাজারীবাগে বর্জ্যঘরের ছাদের টিন মরিচা ধরে ফুটো হয়ে গেছেডিএসসিসি’র সংশ্লিষ্ট বিভাগের সূত্র জানায়, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে বিশ্ব ব্যাংকের  অর্থায়নে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে আরবান পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হেল্থ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (ইউপিইএইচএসডিপি) আওতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় ৫০টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন (এসটিএস) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই প্রকল্পের আওতায় হাজারীবাগের বেড়িবাঁধের পাশে দু’টিসহ অন্যান্য এলাকায় মোট ২১টি এসটিএস-এর নির্মাণ এরইমধ্যে শেষ হয়েছে। বাকি ২৯টির নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ১৯ এপ্রিল হাজারীবাগের ২২ নম্বর ওয়ার্ডের কালুনগর বেড়িবাঁধের পাশে একটি বর্জ্যঘর নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। প্রায় দু’বছর পর ২০১৬ সালের ৯ মার্চ ডিএসসিসি’র মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ওই বর্জ্যঘর উদ্বোধন করেন। এছাড়া, ২০১৭ সালের ১৪ ডিসেম্বর একই ওয়ার্ডের মেটাডোর এলাকায় আরেকটি বর্জ্যঘর (এসটিএস)  উদ্বোধন করা হয়। এটিও উদ্বোধন করেন মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকন ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। চার হাজার ২০০ বর্গফুট আয়তনের প্রতিটি বর্জ্যঘর নির্মাণে খরচ হয়েছে দুই কোটি ৮৪ লাখ টাকা।

লিফটারের বিকল মোটরডিএসসিসি’র সূত্র মতে, প্রকল্পের লক্ষ্য হচ্ছে— নগরীর বাসাবাড়ি, ইলেক্ট্রনিক ও মেডিক্যাল বর্জ্য সংগ্রহ করে প্রথমে বর্জ্যঘরে এনে রাখা হবে। রাত ১০টার পর থেকে ভোর চারটা পর্যন্ত প্রাথমিক ব্যবস্থাপনা শেষে করপোরেশনের ডাম্পিং স্টেশনে নিয়ে যাওয়া হবে। বর্জ্যঘর দুটি নির্মাণ শেষে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পর যারা এতে কাজ করবে, তাদের পরবর্তী এক বছরের বেতন,বর্জ্যঘরের বিদ্যুৎ ও পানির বিল সরবরাহসহ অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।  উল্লেখ্য,এমএস বিলাল অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এই দুটি এসটিএস নির্মাণ করে। অভিযোগ রয়েছে, উদ্বোধনের পরের দিন থেকেই উল্লিখিত বর্জ্যঘর দু’টির পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এরইমধ্যে এসটিএস দুটিতে পানি ও লিফটার মোটরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে, দরজা-জানালা ভেঙে গেছে, বৈদ্যুতিক বাল্ব নষ্ট,দেয়ালে ফাটল ধরেছে, ছাদের টিন মরিচা ধরে ফুটো হয়ে গেছে,অফিস রুমের বৈদ্যুতিক পাখা বিকলসহ নানান সমস্যা বিরাজ করছে। এতে করে বর্জ্যের গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হওয়ার পাশাপাশি পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিয়েছে। 

বর্জ্যঘরের দেয়ালে দেখা দিয়েছে ফাটলবেড়িবাঁধ সংলগ্ন হাজারীবাগ মেটাডোর বর্জ্যঘরের কাছেই অবস্থিত করিমের চায়ের দোকান। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এসটিএসটি নির্মাণের সময় আমরা খুবই আশাবাদী ছিলাম। অন্তত এলাকার পরিবেশ বাঁচবে। কিন্তু এখন দেখি ময়লার গন্ধে দোকানে বসা যায় না। কাস্টমার আসে না। দুর্গন্ধে বমি আসে। কাউন্সিলরসহ সিটি করপোরেশনের লোকজনকে অনেকবার অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু কোনও কাজে আসছে না। ’ 

এই এসটিএস-এর তদারকির দায়িত্বে থাকা মো. আদম আলী নূরু বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এক বছর আগে মেয়র সাহেব ও এমপি সাহেব এই স্টেশনটি উদ্বোধন করে গেছেন। যেদিন উদ্বোধন করেছেন তার পরের দিন থেকে পানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বিল বাকি থাকায় বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন এসে লাইন কেটে দিয়ে গেছে। যে দু’টি ভ্যান ও  লিফটার রয়েছে তাও নষ্ট। ফলে গাড়িতে করে আনা বর্জ্যগুলো এখানে অপসারণ করা যায় না। পানির ব্যবস্থা না থাকায় টয়লেটের অবস্থা খুবই খারাপ। পরিচ্ছন্ন কর্মীরা টয়লেট ব্যবহারের পর পানি ব্যবহার করতে পারেন না। ময়লা নিয়ে যাওয়ার পর স্টেশনের ফ্লোর পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলার কথা থাকলেও ধোয়া যাচ্ছে না।’

তিনি বলেন,  ‘ছাদের টিনে মরিচা ধরে ফুটো হয়ে গেছে। সামান্য বৃষ্টি হলেই স্টেশনের ভেতর পানিতে সয়লাব হয়ে যায়। এ অবস্থায় কাজ করতে কর্মীদের সমস্যা হয়। বিষয়টি অনেকবার সিটি করপোরেশনের স্যারদের জানিয়েছি। তারা কোনও ব্যবস্থা নেন না।’ গত এক বছর ধরে  কোনও বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না বলে জানান কেয়ারটেকার আদম আলী নূরু।

মেটাডোর এলালাকার বর্জ্যঘরের ভেতরের চিত্রতিনি জানান, ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান তাদের বেতন-ভাতা দেওয়ার কথা থাকলেও দিচ্ছে না। তারা (ঠিকাদার) বলেছে, ‘আমরা  এগুলো সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছি। এখন দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।’ কিন্তু সিটি করপোরেশনও কোনও ব্যবস্থা নিচ্ছে না।

এ বিষয়ে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের দাবি,সিটি করপোরেশনের অব্যবস্থাপনা ও তহবিল না থাকার কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। জানতে চাইলে ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান এমএস বিলাল অ্যান্ড ব্রাদার্সের স্বত্বাধিকারী বিলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘প্রকল্পটি এডিবির অর্থায়নে নির্মিত হয়েছে। কিন্তু কথা ছিল নির্মাণ শেষে এসটিএসের যন্ত্রগুলো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য একজন লিফট ম্যান ও একজন ম্যানেজার নিয়োগ করা হবে। কিন্তু সিটি করপোরেশন তা করেনি। ভুল অপারেটের কারণে যন্ত্রপাতি নষ্ট হয়েছে।’

ছাদের টিনে মরিচা ধরার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘সেখানে অনেক বর্জ্য জড়ো হয়। বর্জ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের গ্যাস ছড়ায়।  সে কারণে টিনে মরিচা ধরতে পারে। ’

বর্জ্যঘরের এই ময়লা থেকে প্রতিনিয়তই ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ২০১৬ সালে ডিএসসিসি’র একটি  প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘এসটিএস দু’টির ভ্যান ও লিফটার মোটরের বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ, বৈদ্যুতিক বাল্ব নষ্ট, অফিসের বৈদ্যুতিক পাখা সাইট ওয়ালে স্থাপন ও স্টোর রুমের দরজা না লাগানোসহ একাধিক ত্রুটি রয়েছে।’ জানা গেছে, এ প্রতিবেদনের পর এসটিএসের নির্মাণকাজ কয়েকদিন বন্ধও ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পুরো কাজের বিল তুলে নিয়ে যায়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকল্পটির দায়িত্বে থাকা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর)  মো. তৌহিদ সিরাজ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এসটিএস দু’টিতে যে অনিয়ম হয়েছে, সেটা আমার সময়ে হয়নি। এগুলো আগে নির্মাণ হয়েছে। এর সঙ্গে আমি জড়িত নই।’

ডিএসসিসি’র অতিরিক্ত প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা খন্দকার মিল্লাতুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এটা আমাদের নজরে এসেছে। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা নেবো।’