সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির ২০১৯-২০২০ সেশনের নির্বাচন পরিচালনার জন্য জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ ওয়াই মশিউজ্জামানকে আহ্বায়ক করে ৭ সদস্য বিশিষ্ট সাব-কমিটি এরইমধ্যে গঠন করা হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল অনুসারে, আগামী ১৩ ও ১৪ মার্চ ভোট অনুষ্ঠিত হবে।
আসন্ন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য ইতোমধ্যে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে সরকার সমর্থকদের সাদা প্যানেল। সাদা প্যানেলের সভাপতি পদে সমিতির সাবেক সম্পাদক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ এম আমিন উদ্দিন ও সম্পাদক পদে বাংলাদেশ আইন সমিতির সাবেক সম্পাদক আইনজীবী আবদুন নুর দুলালের নাম ঘোষণা করা হয়। আর বিএনপি সমর্থিত নীল প্যানেলের আইনজীবীদের মধ্যে সভাপতি হিসেবে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী এবং সম্পাদক হিসেবে প্রার্থী হয়েছেন ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, এর আগের নির্বাচনে আওয়ামীপন্থী আইনজীবীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিভেদ ছিল ভীষণ রকমের। আওয়ামী আইনজীবী পরিষদ ও বঙ্গবন্ধু আইনজীবী পরিষদ নামে দুটি পৃথক সংগঠন থাকায় এক প্যানেলে নির্বাচন করলেও ঈর্ষা কাতরতাসহ বিভিন্ন কারণে সংগঠন দুটির নেতারা পরস্পরবিরোধী আচরণ করায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতাসীন থাকলেও সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায়। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচনে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহর নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি অনুসন্ধান কমিটি গঠন করেন। এরপর কমিটির প্রতিবেদনে উঠে আসে নির্বাচনে হারের বেশ কিছু কারণ। কারণগুলো ছিল, আওয়ামী লীগের সিনিয়র আইনজীবীদের বিরোধিতা, নতুন আইন কর্মকর্তা নিয়োগে বিরূপ প্রভাব, অ্যাটর্নি জেনারেল ও আইন কর্মকর্তাদের অতিমাত্রায় প্রচারণা, সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী দুজনের ব্যক্তিগত সমস্যা ও নির্বাচনি প্রচারণায় থাকা আইনজীবী নেতাদের সক্রিয় না থাকা।
নিজেদের মধ্যকার সে বিভেদ কাটিয়ে উঠে আসা সম্ভব হয়েছে কিনা জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের যুগ্ম আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘আমাদের মধ্যে যে মতানৈক্য আছে তা হলো ‘আর্টিফিসিয়াল’ মতানৈক্য। কিছু লোক থাকেন যারা নিজের ব্যর্থতা স্বীকার করেন না। আমাদের মাঝে এ ধরনের মানসিকতা ছিল। কিন্তু, আমি নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে বলেছি।’
এবারের নির্বাচনকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা। এ বিষয়ে সমিতির বর্তমান সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, ‘এই নির্বাচনটিকে অবশ্যই চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছি। কারণ, চারদিকে যেভাবে ভোট নিয়ে যায় (আওয়ামী লীগ) সেক্ষেত্রে এখানে কী হবে, তা তো বোঝা যায় না। ভোট বলতে কী বোঝায় তা তো বিদায় করে দেওয়া হয়েছে। সুতরাং ভোটের ব্যাপারে দেশে আর কোনও নিশ্চয়তা নেই। আগে মানুষের ভোটের অধিকার ছিল, এখন সব ভোট সরকারের ওপর নির্ভর করে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ‘সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিতে আইনজীবীদের পরিধি বাড়ায় তাদের বসার জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে। তবে আইনজীবীদের জন্য নতুন ভবন নির্মাণের নকশা পাস হয়ে থাকলেও সমিতিতে বিএনপি সমর্থিত আইনজীবীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে কোনও বাজেট বরাদ্দ হচ্ছে না। তাই আইনজীবীদের জন্য ভবন নির্মাণ, কোর্টের সার্বিক উন্নয়ন প্রত্যক্ষ করাসহ অ্যাটর্নি অফিসে নতুন আইন কর্মকর্তা নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা করে অনেকেই এবার আওয়ামী সমর্থিত আইনজীবীদের বিজয়ী করতে চান।’
তবে এর উল্টো মতও আছে। বিএনপি চেয়ারপরসন খালেদা জিয়াকে দুর্নীতি মামলায় জামিন না দেওয়া এবং বিএনপি নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও গায়েবি মামলার দমন পীড়নের অভিযোগ এনে অনেকেই বিএনপি প্রার্থীকেই ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন অনেক আইনজীবী।
সাদা প্যানেল থেকে এবারের সম্পাদক প্রার্থী আবদুন নুর দুলাল। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অতীতে আমাদের মধ্যে কোনও মতানৈক্য ছিল কিনা সে নিয়ে আমার কোনও ধারণা নেই। তবে এবার আমাদের মধ্যে কোনও মতানৈক্য প্রত্যক্ষ হয়নি। এবার নমিনেশন (মনোনয়ন) নিয়ে উঁচু স্তর থেকে নিম্ন স্তরের কোনোখানেই বিতর্ক সৃষ্টি হয়নি। সকলেই আমাদের প্যানেলকে সর্বসম্মতভাবে গ্রহণ করেছেন। আশা করছি এবারের নির্বাচনে আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত হতে পারবো। আর আমি নির্বাচিত হলে সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতিকে অবশ্যই দলীয় রাজনীতিমুক্ত রাখার চেষ্টা করবো।’
নির্বাচনি প্রচারণার কৌশল বিষয়ে আবদুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘এবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্মের ওপর আমরা বেশি জোর দিয়েছি। তাই আমরা সভাপতি পদে নতুন প্রার্থীকে মনোনীত করেছি। আশা করবো, একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে এবং আমাদের সাদা প্যানেল জয় লাভ করবে।’
সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির কার্যালয় সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুসারে, সুপ্রিম কোর্ট বারের সদস্য সংখ্যা হচ্ছে ৮ হাজার ৮৮ জন। কার্যনির্বাহী কমিটির মোট ১৪টি পদে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
আবদুল বাসেত মজুমদার জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশে যে বিজয় সূচিত হয়েছে তার ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আর জয়নুল আবেদীন মনে করছেন, ‘সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে ভোটের দিক দিয়ে তারাই সবসময়ই এগিয়ে আছেন।’
অন্যদিকে, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার মনে করেন, ‘আসন্ন নির্বাচনটি প্রতিযোগিতামূলক হবে।’ তবে এ নির্বাচনে বিএনপির জয় নিয়ে আশঙ্কা প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনকে ঘিরে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা হয়ত ভোটারদের ভোট দিতে আসতে অনুৎসাহিত করবেন। ভোটকেন্দ্রে ঢুকতে দিবেন না বা তাদের বিরুদ্ধে মামলা করবেন। আগে থেকেই বিরোধী প্রার্থীরা আইন শৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে বিএনপির প্রার্থীদের ওপর বাধা সৃষ্টি করতে পারে। তবে সরকার বা তারা (আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা) হস্তক্ষেপ না করলে নির্বাচন সুষ্ঠ হবে এবং আমরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে জয়যুক্ত হবো বলে আশা করছি।’