নিমতলী ট্রাজেডির সাক্ষী আরমান বলেন, ‘২০১০ সালে নিমতলির ঘটনা আমি দেখেছি। ১ সপ্তাহ কিংবা এক মাসব্যাপী নানা কর্মসূচি হয়েছে, কিন্তু কোনও কাজ হয়নি। প্রশাসন চাইলেই পুরান ঢাকাকে কেমিক্যালের গোডাউনমুক্ত করতে পারে, কিন্তু করে না। সাধারণ মানুষ করতে গেলে বলে- এটা আইনের কাজ। নিমতলীর ঘটনার পর ভেবেছিলাম, সবাই সচেতন হবে, কিন্তু হয়নি; যার ফলশ্রুতিতে চকবাজারের ঘটনা। আমরা স্বাভাবিক মৃত্যুর নিশ্চয়তা চাই। এভাবে আগুনে পুড়ে মরতে চাই না।’
নিমতলীর ঘটনায় স্বজন হারানো রিপন বলেন, ‘পুরান ঢাকা থেকে অনেক দূরে কেমিক্যালের গোডাউন সরানো হোক। এখানকার বাড়িওয়ালারা অনেক লোভী। একটু বেশি লাভের আশায় বাড়ির নিচে গোডাউন ভাড়া দেয়। আমরা যারা মা-বোন হারিয়েছি, তারাই জানি ভেতরে কত যন্ত্রণা।’
প্রতিবাদ যাত্রার সঙ্গে সংহতি জানায় ছাত্র ইউনিয়ন, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, বাংলাদেশ ছাত্র ফেডারেশনসহ কয়েকটি ছাত্র সংগঠন। এসময় কৈফিয়ত চাওয়া জনগণের পক্ষ থেকে মৃত্যুর মিছিল থামাতে জরুরি ভিত্তিতে পাঁচটি দাবি তুলে ধরা হয়। দাবি তুলে ধরেন মাহতাব উদ্দিন আহমেদ।
দাবিগুলো হলো- বাসাবাড়ি থেকে অবৈধ রাসায়নিকের গুদাম অপসারণ, রাসায়নিকের ব্যবসার ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বীমা চালু, মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার অপসারণ ও ফিটনেসবিহীন মোটরযানের চলাচল কঠোরভাবে বন্ধ করা, পুরান ঢাকার গলিতে গলিতে যথেষ্ট পরিমাণে অগ্নিনির্বাপণ সিলিন্ডার ও ফায়ার হাইড্রেন্টের ব্যবস্থা তৈরি করা, যানজট নিরসনে গণপরিবহন-নির্ভর কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া, ভিআইপি চলাচলের নামে রাস্তা আটকে দেওয়া আইন করে নিষিদ্ধ করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, ঝুঁকিপূর্ণ ট্রান্সফরমার ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা অপসারণ করা।
পথসভায় নারী মৈত্রী কেন্দ্রের সভাপতি সীমা দত্ত বলেন, ‘আগুনের জন্য যারা দায়ী, তাদের শাস্তি এবং ভবিষ্যতে যেন না ঘটে সেই দাবিতে এই সমাবেশ। আগুনে পুড়ে মরার ঘটনা কি নিহত হওয়া নাকি হত্যাকাণ্ড? সরকার বা সিটি করপোরেশনের কর্তা ব্যক্তিরা পুরান ঢাকার মানুষের নিরাপত্তার বিষয় দেখেনি বলে এই ঘটনা ঘটেছে। আজকে ঘরে বসে থাকার সময় নেই, প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। পুরান ঢাকায় কেমিক্যালের গোডাউনসহ যেভাবে রাস্তাঘাট হচ্ছে, সেই অনিয়মের বিরুদ্ধে সোচ্চার হোন।’
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আনু মোহাম্মদ বলেন, ‘একটি দেশে প্রতিটি নাগরিকের কিছু অধিকার আছে। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত একজন নাগরিকের কি কি অধিকার আছে, তা সংবিধানে স্পষ্ট রয়েছে। পুরান ঢাকার আবাসিক ভবনে কেমিক্যালের গোডাউন সব অবৈধ। আবাসিক এলাকায় এসব থাকতে পারে না। আইন কানুন লেখার আর বাস্তবায়ন করার বহু লোক আছে। মানুষের ট্যাক্সের টাকায় সবার বেতন হয়, তাদের দায়িত্ব হচ্ছে নাগরিকরা যেন নিরাপদে থাকে, কাজ পায় , খাবার পায় এবং স্বাভাবিকভাবে মারা যায়। সেই অধিকার বাংলাদেশের মানুষ পাচ্ছে না।’
সাবেক ছাত্র নেতা বাকি বিল্লাহ বলেন, ‘পুরান ঢাকায় আগুনে এতগুলো মানুষ পুড়ে মরার জন্য দায়ী কারা, আমরা জানতে চাই। ঢাকার দূষিত বাতাসের মধ্যে কেমিক্যাল নিয়ে পুরান ঢাকা আস্ত একটি বোমার মতো দাঁড়িয়ে আছে। কিভাবে আমাদের সন্তানরা নিরাপদে বাঁচতে পারবে?’
নিমতলীর ৪৩ নম্বর বাড়ির সামনের স্মৃতিস্তম্ভ থেকে প্রতিবাদ যাত্রা শুরু হয়। নাজিমউদ্দিন রোড হয়ে জেলখানার মোড় হয়ে কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে সংক্ষিপ্ত পথসভা করা হয়। এরপর চকবাজার থানার পাশে সংক্ষিপ্ত পথসভা করে চুড়িহাট্টায় গিয়ে শেষ হয় প্রতিবাদ যাত্রা।