‘দেশ এখন স্বৈরতন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে’

‘ত্বকী একটি বিচারহীনতার প্রতীক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকদেশ এখন স্বৈরতন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন সাংবাদিক কালাম লোহানী। তিনি বলেন, ‘‘আমরা এক অদ্ভুত সময়ের মধ্য দিয়ে চলেছি। আমরা দীর্ঘদিন যাবৎ শুনে আসছি, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘বিচার আজ  হোক, কাল হোক, এক মাস-দুমাস হোক, ছমাসে হবেই।’ সেটি এখন ছয় বছর হয়ে গেছে, হয়নি। হবার সেরকম কোনও আশাও ব্যক্ত করতে পারছি না।’’

‘ত্বকী একটি বিচারহীনতার প্রতীক’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব মন্তব্য করেন। বৃহস্পতিবার (৭ মার্চ) জাতীয় প্রেসক্লাবে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে সন্ত্রাস নির্মূল ত্বকী মঞ্চ এ আয়োজন করে।

কামাল লোহানী বলেন, ‘‘এই দেশ এখন স্বৈরতন্ত্রের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। মওলানা ভাসানী একটা কথা বলতেন, ‘বাঘের পিঠে চড়ো না।’ শেখ হাসিনা বাঘের পিঠে চড়ে আছেন। কখন যে কি ঘটবে, বলা বড় কঠিন। সুতরাং আমার মনে হয় মিথ্যাচারের মধ্যে বা কপটতার মধ্যে, তার কাছে আবেদন (ত্বকী হত্যার বিচার চেয়ে) করে কোনও লাভ নেই। আমরা যদি চাই, তাহলে এ ধরনের আন্দোলন চলতে থাকুক এবং আইনের আশ্রয় গ্রহণ করি। প্রয়োজন হলে সেটাকে সংগঠন করে গণ আন্দোলনে পরিণত করার চেষ্টা করি।’

কামাল লোহানী আরও বলেন, ‘‘আমরা জানি, সেলিম ওসমান ও সেলিনা হায়াৎ আইভী দুইজনের উপস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘কে হত্যা করেছে, কারা হত্যা করেছে, সমস্ত গোয়েন্দা তথ্য আমার কাছে আছে।’ তখন শামীম ওসমান বলছিলেন, ‘তাহলে বিচার করেন না কেন?’ তখন তিনি বলেছেন, ‘বিচার হবে।’ কিন্তু তার কিছুদিন পরেই যখন নাসিম ওসমান মারা গেলেন, তখন পার্লামেন্টে শোক বক্তব্য দিতে গিয়ে বললেন, ‘ওসমান পরিবারের দায়িত্ব আমার।’ তিনি (প্রধানমন্ত্রী) এক সময় বলেছিলেন, ‘শামীম ওসমানকে আমার আওয়ামী লীগ করার জন্য প্রয়োজন।’ যাই হোক, যেখানে প্রধানমন্ত্রী কপটতার আশ্রয় নিচ্ছেন, সেখানে তার কাছে গিয়ে কি চাইবেন, আমি জানিনা। আমার মনে হয়, আইনজীবীদের মাধ্যমে আলোচনা করে হাইকোর্ট সুপ্রিমকোর্ট গিয়ে আপিল করতে পারি, তাহলে একটা পথ বোধহয় বের হতে পারে।’

অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী যেহেতু খুনি পরিবারের সঙ্গে, ওসমান পরিবারের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। সে কারণেই আর কোনও প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা নেই- সেটা আদালত হোক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হোক। ওই যে কথাটা বলা হয়, আইন তার নিজের গতিতে চলে। এর চাইতে ভুল আর কিছু বাংলাদেশ নাই। আইন কখনোই নিজের গতিতে চলে না, আইন ক্ষমতাবানদের ইচ্ছা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী চলে। প্রধানমন্ত্রীর সমর্থন দান, খুনিদের প্রতি এটাই হচ্ছে ত্বকী হত্যার বিচার না হওয়ার প্রধান কারণ।’

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘ত্বকী হত্যা একটি রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। তাহলে তো রাজনৈতিক সমাধান লাগবে।’

বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের সাধারণ সম্পাদক খালেকুজ্জামান বলেন, ‘তনু, সাগর-রুনি, কল্পনা চাকমা ইত্যাদি যেসব হত্যাকাণ্ডের বিচার ঝুলে আছে, এগুলো নানাভাবে বিচার বিভাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আর ত্বকী হত্যার ব্যাপারটা স্থায়ী অনাস্থার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।’

গণসংহতির প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘ত্বকীকে ত্বকীর কারণে হত্যা করা হয়নি। ত্বকীকে হত্যা করা হয়েছে তার বাবার কারণে। কারণ, জনমানুষের দাবির পক্ষে তৌকির বাবা দাঁড়িয়েছিলেন। যার ফলে ওইখানের একটি বিশেষ পরিবার ধন সম্পদ, জবর দখল, সন্ত্রাস, আধিপত্য সবকিছু কায়েম করে, তাদের বাধা তৈরি করেছিলেন। বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করেছে। জনগণের আন্দোলনের একটা দাবি ছিল, সেই দাবি তারা পূরণ করেছে। কিন্তু, যে বিষয়ের মধ্যে তাদের রাজনীতি আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে, সে বিষয়ে তারা বিচারে যাচ্ছে না।’

গোলটেবিল বৈঠকে আরও উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত রাজনীতিবিদ পঙ্কজ ভট্টাচার্য, অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক মিজানুর রহমান খান, কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম, সুশাসনের জন্য নাগরিক এর সভাপতি বদিউল আলম মজুমদার প্রমুখ।