ডিএমপি মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার মো. ওবায়দুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ৩৭ নম্বর সিরিয়ালের মামলাটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে দণ্ডবিধির ৪৩৬/৩০৪(ক)/৪২৭/১০৯ ধারায়।
দণ্ডবিধি অনুযায়ী, ৪৩৬ নম্বর ধারাটি গৃহ ইত্যাদি ধ্বংস করার অভিপ্রায়ে অগ্নি বা বিস্ফোরক দ্রব্য ব্যবহার করে অনিষ্ট সাধন বিষয়ে। এই ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি সচরাচর উপাসনালয় হিসেবে ব্যবহৃত বা মনুষ্য বসবাসের স্থান বা সম্পত্তি হেফাজতের স্থানরূপে ব্যবহৃত হয় এমন কোনও গৃহ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে বা সে অনুরূপ ধ্বংস করতে পারে বলে জেনে অগ্নি বা কোনও বিস্ফোরক দ্রব্যের সাহায্যে অনিষ্ট সাধন করে তা হলে সেই ব্যক্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা যেকোনও বর্ণনার কারাদণ্ডে (যার মেয়াদ দশ বছর পর্যন্ত হতে পারে) দণ্ডিত হবেন এবং এছাড়াও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
৩০৪ (ক) ধারাটি অবহেলার ফলে সংঘটিত মৃত্যু বিষয়ক। এ ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি পাঁচ বছরের কারাদণ্ড। এ ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি দণ্ডনীয় নরহত্যা বলে গণ্য নয় এমন কোনও বেপরোয়া বা অবহেলাজনক কাজ করে কোনও ব্যক্তির মৃত্যু ঘটায়, তাহলে সে ব্যক্তি যেকোনও বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ পাঁচ বৎসর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
৪২৭ নম্বর ধারায় সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছরের কারাদণ্ড। এই ধারায় বলা হয়েছে, যদি কোনও ব্যক্তি অনিষ্ট সাধন করে এবং এতে ৫০ টাকা বা তার বেশি লোকসান বা ক্ষতি হয় হলে সেই ব্যক্তি যেকোনও বর্ণনার কারাদণ্ডে যার মেয়াদ সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত হতে পারে বা অর্থদণ্ডে বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
১০৯ ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি স্পষ্ট করে বলা হয়নি। এই ধারাকে বলা হয়েছে দুষ্কর্ম সহায়তার ফলে সহায়তাকৃত কাজটি সম্পাদিত হওয়ার বেলায় এবং এর দণ্ডদানের কোনও বিধান না থাকার ক্ষেত্রে দুষ্কর্মে সহায়তার শাস্তি। এই ধারা অনুসারে কোনও ব্যক্তি কোনও অপরাধে সহায়তা করলে যদি সহায়তার ফলে সাহায্যকৃত কাজটি সম্পাদিত হয় এবং এই বিধিতে অনুরূপ দুষ্কর্মে সহায়তার জন্য দণ্ডদানের কোনও স্পষ্ট বিধান না থাকে, তা হলে ওই ব্যক্তির ওই অপরাধের জন্য ব্যবস্থিত শাস্তির বিধান করা হবে।
অগ্নিকাণ্ডে হতাহত এবং ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় হওয়া মামলার আসামিরা হলেন- এসএমএইচ আই ফারুক, রুপায়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান ও তাসভির উল ইসলাম।
এদের মধ্যে এফ আর টাওয়ারের বর্ধিত অংশের মালিক বিএনপি নেতা তাসভির উল ইসলামকে গ্রেফতার করেছে ডিবি পুলিশ। শনিবার (৩০ মার্চ) রাত ১০টা ৪৫ মিনিটের দিকে তাসভিরের বারিধারার বাসা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। ডিবি (উত্তর) পুলিশের এডিসি সাজাহান সাজু বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
তাসভির উল ইসলাম কুড়িগ্রাম জেলা বিএনপির সভাপতি ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। পাশাপাশি তিনি কাশেম ড্রাইসেলস কোম্পানি লিমিডেট নামে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নির্বাহী কর্মকর্তা। ২০০১-২০০৬ সালের মধ্যে বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে তিনি ওই ১৮ তলা ভবনটিকে ২৩ তলায় উন্নীত করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র বিষয়টি বাংলা ট্রিবিউনকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
বনানীতে এই অগ্নিকাণ্ডের পর শুক্রবার (২৯ মার্চ) সকাল ১০টার দিকে এফ আর টাওয়ার পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী শ ম রেজাউল করিম বলেন, ‘আমাদের কমিটি তদন্ত করছে। ওই কমিটির তদন্ত প্রতিবেদন সবার সামনে প্রকাশ করবো। আমার মতে, এটা দুর্ঘটনা নয়, হত্যাকাণ্ড। এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবো।’
একইদিন বিকেলে আগুনের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত ভবন ও উদ্ধার অভিযান পরিদর্শন করেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী। পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ভবনটির মালিকদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। ভুক্তভোগী, নিহতদের স্বজনরা মামলা করবেন। তারা যদি না করেন তবে রাষ্ট্রপক্ষ অর্থাৎ পুলিশ বাদী হয়ে মামলা হবে। যেসব ধারায় মামলা করলে নন বেইলেবল (অজামিনযোগ্য) হবে সেইসব ধারা পর্যালোচনা করে মামলা করা হবে।’
আইজিপি আরও বলেন, ‘ইতোমধ্যে ভবনের মালিককে শনাক্ত করা হয়েছে। মালিকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। রাজউক কর্তৃপক্ষ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী বলেছেন ইমারত কোড অমান্য করে ভবনের ১৮ তলার বিপরীতে ২২ তলা করা হয়েছে। সুতরাং এটি আইনের ব্যত্যয়। এখানে যারা মারা গেছেন তাদের প্রত্যেকের জীবনের মূল্য ও বাঁচার অধিকার রয়েছে। সেটার ব্যত্যয় ঘটেছে। এ বিষয়ে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
২৯ মার্চ দুপুরে বনানী ঘটনাস্থলে এসে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘এ ঘটনায় যে ব্যক্তি যে জন্য দায়ী, তার বিরুদ্ধে সেই সংশ্লিষ্ট ধারায় মামলা করা হবে। ভবনের মালিককে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। এ ঘটনায় আরও লোকের দায়িত্বে অবহেলা থাকতে পারে। বেশ কয়েকটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর, জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ ধারায় মামলা করা হবে।’
উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে ২৩ তলা বনানীর এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট আগুন নেভানো ও হতাহতদের উদ্ধারের কাজ করে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, রেড ক্রিসেন্টসহ ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত অনেক স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কাজে অংশ নেয়। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর রাত ৭টায় আগুন নেভানো সম্ভব হয়। এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জন মারা গেছেন।