সহকর্মীদের বাঁচাতে আগুনের পুরোটা সময় এফ আর টাওয়ারের ছাদে ছিলেন কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজের কর্মকর্তা ইবনে হাসনাত সালাউদ্দিন। বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টার যখন ছাদ থেকে আটকে পড়াদের উদ্ধার করছিল, তখন সুযোগ পেয়েও তিনি ছাদ থেকে নামেননি। তিনি সেখানে অবস্থান করেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সহযোগিতার জন্য। আগুন নিয়ন্ত্রণের পর ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সঙ্গে তিনিই প্রথম ওই ভবনের ভেতরে প্রবেশ করেন।
রবিবার (৩১ মার্চ) স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত টিমের কাছে সাক্ষ্য দিতে এসে ইবনে হাসনাত সালাউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে একথা বলেন। এ সময় আগুনের সময় ওই ভবনে থাকা আরও কয়েকজন সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেন।
ইবনে হাসনাত সালাউদ্দিন সেদিনের আগুন লাগার পরের ঘটনা প্রসঙ্গে বলেন, ‘ওই দিন আমি নিচ থেকে লিফটে ২১ তলায় উঠে আমার অফিসের সামনেই দেখি ধোঁয়া। ধোঁয়ায় টিকতে না পেরে আমরা কয়েকজন দৌড়ে ছাদে উঠি। সিঁড়িতে তখন প্রচণ্ড ধোঁয়া, চোখে কিছুই দেখছিলাম না। তাই ২১ তলা থেকে আমরা কয়েকজন দৌড়ে সিঁড়ি দিয়ে উপরে চলে আসি। ছাদে উঠে অফিসের অনেককেই দেখছিলাম না। ধারণা করছিলাম তারা হয়তো বের হয়েছে। অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। কিন্তু কেউ কারও খবর জানাতে পারছিলো না। আমরা তখন বুঝতে পারছিলাম না কী করতে হবে। ফের অফিসের দিকে আসার চেষ্টা করছিলাম, কিন্তু ধোঁয়ার তীব্রতায় আর সাহস করিনি। যদি আমার সঙ্গে একটা গ্যাস সিলিন্ডার এবং দুজন স্বেচ্ছাসেবক থাকতো তাহলে আমি অন্তত পাঁচজনকে বাঁচাতে পারতাম। আমরা তিনঘণ্টা ধরে অক্সিজেন চেয়েছিলাম। তারপরও একজনকে দড়ি দিয়ে বের করি।’
তিনি বলেন, ‘আমি আগুনের পুরোটা সময় ভবনের ছাদেই ছিলাম। আগুন নিয়ন্ত্রণের পরে ৭টা ১০ মিনিটে নিখোঁজ সহকর্মীদের খুঁজতে ২১-তলায় আমাদের অফিসে ফায়ার সার্ভিস কর্মীদের সঙ্গে প্রবেশ করি। প্রথমেই দেখি সহকর্মী মঞ্জুর হাসান তার চেয়ারে বসে আছেন। তার পালস চেক করি, কিন্তু কোনও সাড়া পাইনি। তিনি দমবন্ধ হয়ে সেখানেই মারা গেছেন। আমরা তাকে রক্ষার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু ভেতরে আর প্রবেশ করতে পারিনি।’
সেদিনের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করে কাশেম ইন্ডাস্ট্রিজের তথ্যপ্রযুক্তি (আইটি) কর্মকর্তা তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘২০০৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে মঞ্জুর হাসান চলৎশক্তি হারান। এরপরও তাকে আমাদের গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেব কাজের সুযোগ করে দিয়েছেন। তার ছেলেমেয়ের লেখাপড়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। তিনি হাঁটতে পারেননি বলেই সেদিন অফিস থেকে বের হতে পারেননি।’
ইউরো সার্ভিস লিমিটেডের আইটি বিভাগের কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ফারুক রূপায়ণ (এফ আর) টাওয়ারের ১১-তলায় রয়েছে ইউরো সার্ভিসের অফিস। আগুনের ঘটনায় এই ফ্লোরে পাঁচজনের মৃত্যু হয়। ১১-তলায় আগুন না লাগলেও ধোঁয়া ও আগুনের তাপে অফিসের ল্যাপটপ, কম্পিউটারসহ সকল নথিপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।’
তিনি বলেন, ‘আগুনের খবর শুনে আমি দৌড়ে ছাদে উঠে যাই। একটুও সময় নষ্ট করিনি। ছাদে উঠে আমি বাকি সহকর্মীদের ফোন করে বলি ছাদে উঠে আসতে। পরে এফ আর টাওয়ারের ছাদ থেকে পাশের আহমেদ টাওয়ারের ছাদ দিয়ে নিচে নেমে আসি। আমার অফিসের পাঁচ সহকর্মী এই আগুনের ঘটনায় মারা গেছেন। তখন যদি আমি পাঁচ মিনিট দেরি করতাম তাহলে হয়তো সহকর্মীদের সঙ্গে আমিও মারা যেতাম। আমাদের ফ্লোর সে সময় ধোঁয়ায় ভরে গিয়েছিল।’
আপনাদের ফ্লোরে কোনও অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা ছিল কি? এ প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, ‘আমি দেড় বছর এই অফিসে কাজ করছি, কিন্তু কয়েকটি এক্সটিংগুইশার ছাড়া আর কোনও যন্ত্র দেখিনি। সেগুলোর মেয়াদ আছে কিনা, সেটাও আমার জানা নেই। অফিসে ওঠানামার জন্য সাধারণত লিফট ব্যবহার করতাম। কখনও সিঁড়ি ব্যবহার করিনি। আমাদের অফিসে এক্সিট সিঁড়ি থাকলেও সেটি কখনও ব্যবহার করা হয়নি না। কোনদিকে আছে তাও আমার জানা নেই।’
এফ আর টাওয়ারের পাশের ভবনের সিকিউরিটি গার্ড মো. আসলাম হোসেন বলেন, ‘দুপুরে আমি রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ এফ আর টাওয়ারের ৮ তলায় এসির তার দিয়ে ধোঁয়া দেখতে পাই। এর দুই মিনিট পরেই ৮ তলার দু-তিনটি গ্লাস ভেঙে আগুন বের হয়। আগুন লাগার ৩০ মিনিট পর ফায়ার সার্ভিস এসে কাজ শুরু করে। তার আগেই আগুন বাড়তে থাকে। আমি নিচে দাঁড়িয়ে না থেকে আমাদের ভবনের থেকে ৪-৫টি এক্সটিংগুইশার রেডি করে সেখানে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হই। সেগুলো নিয়ে আমি এফ আর টাওয়ারের নিচে যাই। তখন চারজনকে ওই ভবনের তার বেয়ে নামতে গিয়ে পড়ে যেতে দেখি। এরপর রাস্তায় ধোঁয়ার কারণে অন্ধকার হয়ে যায়। তখন আমি ফায়ার সার্ভিসকর্মীদের সঙ্গে উদ্ধার কাজে নেমে পড়ি।’
আগুন নেভানোর কিছু না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এফ আর টাওয়ারে পর্যাপ্ত এক্সটিংগুইশার ছিল না। সেখানকার সিকিউরিটি গার্ডরা এক্সটিংগুইশার চালাতে পারতো না।’
প্রসঙ্গত গত বৃহস্পতিবার (২৮ মার্চ) দুপুর ১২টা ৫৫ মিনিটে এফ আর টাওয়ারে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ২৫টি ইউনিট আগুন নেভানো ও হতাহতদের উদ্ধারে কাজ করে। পাশাপাশি সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, রেড ক্রিসেন্টসহ ফায়ার সার্ভিসের প্রশিক্ষিত অনেক স্বেচ্ছাসেবী অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধার কাজে অংশ নেন। প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টা চেষ্টার পর সন্ধ্যা সাতটার দিকে আগুন নেভানো সম্ভব হয়। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ২৬ জন মারা গেছেন।
পরে এ ঘটনায় শনিবার (৩০ মার্চ) রাতে বনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ উপ-পরিদর্শক (এসআই) মিল্টন দত্ত বাদী হয়ে ৪৩৬/৩০৪(ক)/৪২৭/১০৯ ধারায় মামলা (নম্বর ৩৭) করেন। এতে এসএমএইচআই ফারুক, রূপায়ণ গ্রুপের চেয়ারম্যান লিয়াকত আলী খান ও তাসভিরুল ইসলামকে আসামি করা হয়েছে।