বাড়ি যাচ্ছেন নুসরাত

নুসরাতের মরদেহ গাড়িতে ওঠানো হচ্ছে
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের পর ফেনীর নিজ বাড়িতে ফিরছেন নুসরাত জাহান রাফি। তবে কফিনবন্দি পোড়া দেহ নিয়ে নুসরাতের এ যাত্রা কেউ মেনে নিতে পারছেন না। স্বজনরা ছাড়াও নুসরাতের মৃত্যুতে পুরো জাতি আজ শোকস্তব্ধ।  

সকালে ময়নাতদন্তের কাজ শেষ হলে বৃহস্পতিবার (১১ এপ্রিল) দুপুর সোয়া ১২টায় নুসরাতের স্বজনরা তার মরদেহ নিয়ে বাড়ির পথে রওনা হন।

নুসরাতের মরদেহ বহনে গাড়ির ব্যবস্থা ঢামেক কর্তৃপক্ষ করে দিয়েছে বলে জানান ঢামেক পরিচালক। এসময় নুসরাতের স্বজনরা অন্য একটি গাড়িতে করে বাড়ির পথে রওনা হন।

ময়নাতদন্ত শেষে ঢামেক পরিচালক বলেন, আজ পুরো জাতির সঙ্গে ঢামেক পরিবার মর্মাহত। আমাদের তিন সদস্যের একটি টিম ছিল যারা ময়নাতদন্তের কাজটি সম্পন্ন করেছেন। যেহেতু ময়নাতদন্তের সঙ্গে কিছু আনুষঙ্গিক বিষয় আছে যেমন ডিএনএ, মাইক্রোবায়োলজিক্যাল টেস্ট করতে হয়, তাই এই মুহূর্তে আমরা কোনও রিপোর্ট দিচ্ছি না। আমরা ডিএনএ নমুনা ও অন্যান্য যা প্রয়োজন তা সংগ্রহ করেছি। আমরা জানি ওনার এক্সটেন্সিভ বার্ন ছিল। আমরা এখন মৃতদেহ তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করে দিয়েছি। একটি ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে তার মরদেহ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।  

এরআগে, সকাল সাড়ে ১০টার কিছু পরে নুসরাতের সুরতহাল সম্পন্ন হয়। সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন শাহবাগ থানার এস এই শামছুর রহমান। এরপরই তিন সদস্যের বোর্ড ময়নাতদন্ত কাজ শুরু করেন। ঢামেক ফরেনসিক বিভাগের প্রধান সোহেল মাহমুদকে প্রধান করে গঠিত বোর্ডের অন্য দুই সদস্য ছিলেন- প্রদীপ বিশ্বাস ও জান্নাতুল ফেরদৌস।

নুসরাতের মরদেহ গাড়িতে ওঠানো হচ্ছেনুসরাতের মৃত্যুতে শাহবাগ থানায় করা সাধারণ ডায়েরির (জিডি নম্বর-৬০২) বিপরীতে পুলিশ সদস্যরা মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করেন। পরে ময়নাতদন্তের কাজ শুরু করা হয়।

বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টার দিকে নুসরাত ঢামেকে মৃত্যুবরণ করেন। ঢামেকের বার্ন ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত। এরপর কৌশলে তাকে পাশের ভবনের ছাদে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বোরকাপরা ৪/৫ ব্যক্তি তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে তার শরীরের ৮৫ শতাংশ পুড়ে যায়। পরে তাকে উদ্ধার করে স্বজনরা প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পর তাকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়।

ফ্রিজিং অ্যাম্বুলেন্সে করে নুসরাতের মরদেহ ফেনী নিয়ে যাওয়া হচ্ছেওই ছাত্রীর ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, শনিবার সকালে তার বোনের আরবি প্রথম পত্রের পরীক্ষা ছিল। তাকে পরীক্ষাকেন্দ্রে নিয়ে যান তিনি। তবে কেন্দ্রের প্রধান ফটকে নোমানকে আটকে দেন নিরাপত্তাকর্মী মোস্তফা। এরপর তার বোন একাই কেন্দ্রে প্রবেশ করেন। এ সময় নোমান কেন্দ্র থেকে একটু দূরে চলে আসেন। এর ১৫-২০ মিনিট পরই মোবাইল ফোনে তিনি তার বোনের অগ্নিদগ্ধের খবর পান। ফের কেন্দ্রে ছুটে গিয়ে বোনকে দগ্ধ অবস্থায় দেখতে পান তিনি।

উল্লেখ্য, নুসরাত সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরছান্দিয়া গ্রামের মাওলানা একেএম মানিকের মেয়ে। অভিযোগ আছে, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৗলা এর আগে ওই তাকে যৌন নিপীড়ন করেন। এ কারণে গত ২৭ মার্চ অধ্যক্ষকে আটক করে পুলিশ। এ ঘটনায় নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সোনাগাজী থানায় মামলা করেন। মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা বর্তমানে ফেনী কারাগারে আছেন। এদিকে মাদ্রাসাছাত্রীকে পুড়িয়ে হত্যাচেষ্টার ঘটনার তিন দিন পর থানায় মামলা হয়। সোমবার (৮ এপ্রিল) বিকালে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলাটি করেন ভিকটিমের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান। মামলার সংশোধিত এজাহারে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে প্রধান আসামি করা হয়। এছাড়া মুখোশধারী চারজন এবং তাদের সহযোগীদের আসামি করা হয়। এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এ পর্যন্ত মোট আটজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

ছবি: সাজ্জাদ হোসেন