গত ২৯ মে খিলক্ষেত থানায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধান ফটক বন্ধ। কাছে যেতেই নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্য পরিচয় জানতে চান। কার কাছে, কেন যাবেন, কি কাজ এসব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার পর প্রধান ফটকে থাকা এন্ট্রি খাতায় নাম, ঠিকানা ও মোবাইল নম্বর লিখে থানার ভেতরে ঢোকার অনুমতি দেওয়া হয়। এদিকে বনানী, গুলশান, ভাটারা, বাড্ডা, মতিঝিল, শাহবাগ, উত্তরা পশ্চিম থানা, উত্তরা পূর্ব থানা, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানাসহ বিভিন্ন থানায় একই চিত্র দেখা গেছে।
এই বাড়তি সতর্কতার কারণ জানতে চাইলে দায়িত্বরত পুলিশ সদস্যরা জানান, প্রতিদিন থানায় শতশত মানুষ আসা-যাওয়া করেন। কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেন, কেউ আইনি সহায়তা চান। কে ভালো, কে মন্দ তা দেখে বোঝার উপায় থাকে না। সেজন্য বাড়তি সতর্কতা হিসেবে সবার নাম ঠিকানা লিখে রাখার নিয়ম করা হয়েছে।
এ বিষয়ে রাজধানীর তেজগাঁও, তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল, বনানী, খিলক্ষেত, পল্টন ও শাহবাগসহ বিভিন্ন থানার একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ‘থানায় যারা আসেন তাদের অধিকাংশ প্রথমে আসেন ডিউটি অফিসারের কক্ষে। পরে প্রয়োজন অনুযায়ী থানার অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ কারণে থানার গেটের বাইরে, গেটের ভেতরে, ডিউটি অফিসারের কক্ষসহ প্রয়োজনীয় স্থানগুলোকে সিসিটিভি ক্যামেরায় মনিটর করা হয়ে থাকে। আগে থেকেই থানা সিসিটিভি ক্যামেরার আওতায় ছিল। কিন্তু বর্তমানে বিভিন্ন ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে নজরদারির বিষয়টি জোরদার করা হয়েছে।’
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আলী হোসেন খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘মালিবাগ ও গুলিস্তানের ঘটনার পর আমরা নিজেরাই সতর্ক রয়েছি। এই দুটি ঘটনার কারণে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া যেকোনও ঘটনা ঘটলে আমরা থানার নিরাপত্তা বাড়ানোর পাশাপাশি পুলিশ সদস্যদের সতর্ক করে থাকি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকায় নিরাপত্তা বাড়াই।’
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘দুই-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটলেও পুলিশ সদস্যরা সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। রাজধানীর থানাগুলোকে নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।’
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, একের পর এক পুলিশি অভিযানের মাধ্যমে জঙ্গিদের বিপর্যস্ত করে দেওয়ার কারণে তারা এখন পুলিশকে টার্গেট করেছে। পুলিশ সদস্যদের মনে ভয় ধরিয়ে দিতে জঙ্গিরা পুলিশ সদস্যদের টার্গেট করে হামলার চেষ্টা করছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) মতিঝিল বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মো. আনোয়ার হোসেন বলেন, রাজধানীর থানাগুলোর নিরাপত্তা জোরদারের বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার কেন্দ্রীয়ভাবে যে নির্দেশনা দিয়েছেন সেটি মেনেই থানার নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া পুলিশের সব ইউনিটের সঙ্গে সমন্বয় করে সার্বিকভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এদিকে সোমবার (৩ জুন) রাজধানীর নিরাপত্তা নিয়ে এক ব্রিফিংয়ে মালিবাগ ও গুলিস্তানে পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা উল্লেখ করে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য না থাকলেও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটের কারণে আমাদেরও সতর্ক থাকতে হবে। তবে পুলিশের ওপর ককটেল মেরে শত শত পুলিশ সদস্যের মনোবল দুর্বল করা যাবে না। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্র দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। তারা বাংলাদেশের অগ্রগতি থামিয়ে দিতে চায়।’
এর আগে, গত ২৯ এপ্রিল রাজধানীর গুলিস্তানে একটি ট্রাফিক বক্সের পাশে হাতে তৈরি বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এই ঘটনায় ট্রাফিক পুলিশের দুই সদস্য ও একজন কমিউনিটি পুলিশ সদস্য আহত হন। এই ঘটনার ঠিক ২৮ দিন পর গত ২৬ মে রাতে রাজধানীর মালিবাগের পলওয়েল ফিলিং স্টেশনের বিপরীতে ফ্লাইওভারের নিচে রাখা পুলিশের বিশেষ শাখার একটি পিকআপ ভ্যানে বোমার বিস্ফোরণ ঘটে। এ ঘটনায়ও ট্রাফিক পুলিশের এক সহকারী উপ-পরিদর্শকসহ (এএসআই) তিনজন আহত হন। মালিবাগে পুলিশের গাড়িতে বিস্ফোরণের ঘটনার পাঁচ ঘণ্টা পর এর দায় স্বীকার করে আন্তর্জাতিক জঙ্গি গোষ্ঠী আইএস। তবে পুলিশ বলছে, এই ঘটনার সঙ্গে আইএস’র কোনও সম্পৃক্ততা এখনও পাওয়া যায়নি। পরে ওই গাড়ির চালক এসবি’র কনস্টেবল শফিক চৌধুরী বাদী হয়ে পল্টন থানায় একটি মামলা করেন। গুলিস্তান ও মালিবাগের হামলার ঘটনায় জড়িত কাউকে শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
আরও পড়ুন: মালিবাগ মোড়ে পুলিশের গাড়িতে বিস্ফোরণ, আহত ৩
গুলিস্তান ও মালিবাগে বোমা বিস্ফোরণে যোগসূত্র এখনও পাওয়া যায়নি: ডিএমপি কমিশনার