প্রতিদিনই বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী

 

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী

কয়েকদিন থেকে রাজধানীর হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আগের দিনের তুলনায় পরের দিন যেনো রোগীর সংখ্যা আরও বেশি হতে হবে, পাল্লা দিয়ে এই সংখ্যা বাড়ছে। প্রথম দিকে ডেঙ্গু রোগীদের জন্য পৃথক ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব হলেও এখর আর তা সম্ভব হয়ে উঠছে না। হাসপাতালের ওয়ার্ড থেকে শুরু করে বারান্দা পর্যন্ত সব জায়গাতেই এখন জায়গা হচ্ছে রোগীদের। শুরুতে শুধু ঢাকায় এই রোগের প্রকোপ দেখা দিলেও এখন তা সারা দেশে ছড়াতে শুরু করেছে।

বৃহস্পতিবার (২৫ জুলাই) সিলেট এমএজি ওসমানি মেডিক্যাল কলেজের ৪৭তম ব্যাচের ছাত্রী ডা. তানিয়া সুলতানা ডেঙ্গু শক সিন্ড্রোমে আক্তান্ত হয়ে মারা গেছেন। তিনি আনোয়ার খান মডার্ন মেডিক্যালের আইসিউইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। এ নিয়ে ডেঙ্গুতে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৩৩ জন। যদিও স্বাস্থ্য অধিদফতর বলছে, এই সংখ্যা ৮। 

ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসার জন্য গঠিত ‘ন্যাশনাল গাইডলাইন ফর ক্লিনিক্যাল ম্যানেজমেন্ট অব ডেঙ্গু সিন্ড্রোম-২০১৮’ এর প্রধান সম্পাদক এবং ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. কাজী তারিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘গত ২২ জুলাই ডেঙ্গু রোগী ছিল ৪০৩ জন, ২৩ জুলাই ছিল ৪৭৩ জন এবং ২৪ জুলাই ছিল ৫৬০ জন। হঠাৎ করেই ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা বাড়ছে।’

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী

স্বাস্থ্য অধিদফতরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন্স সেন্টার অ্যান্ড কন্ট্রোল রুমের হিসাব অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছে ৫৪৭ জন, ঢাকার বাইরে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১১ জন। এর মধ্যে চট্রগ্রামে ৯ জন, খুলনায় এবং বরিশালে ১ জন করে। সেই হিসেবে প্রতি ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছে ২৩ জন।  

বাংলাদেশে ডেঙ্গুর অবস্থা উদ্বেগজনক বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও।

এখন পর্যন্ত পুরো দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ৯ হাজার ২৫৬ জন। ঢাকার ভেতরে ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের চার, পাঁচ এবং ছয়তলায় ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, বর্তমানে এই হাসপাতালে ভর্তি আছেন ১১২ জন। মিটর্ফোড হাসপাতালে ৫৮, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ৬৩, শিশু হাসপাতালে ২৭, হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ৩২, বারডেমে ১০, রাজারবাগ পুলিশ হাসপাতালে ১৮, মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ৪২ এবং বিজিবি হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৭ জন।

এছাড়াও ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে গত ২৪ ঘণ্টায় ভর্তি হয়েছে ১৬৭ রোগী। আর বেসরকারি ৩৬টি হাসপাতালে বর্তমানে ভর্তি আছেন ৯৩১ জন। বেসরকারি হাসপাতালে এখন পর্যন্ত ভর্তি হওয়া রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৪৭৫ জন, চিকিৎসা নিয়ে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৩ হাজার ৫৩৭ জন।

হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগী

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুরুতেই ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন ডেঙ্গু প্রতিরোধে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এতো ভয়াবহ হতো না। তারা বলছেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয়ভাবে একটি কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা জরুরি। ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করলে এর প্রকোপ কমে আসবে বলে আশা প্রকাশ করেন তারা।

বিভিন্ন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রথমদিকে ডেঙ্গু রোগী ম্যানেজমেন্টের জন্য তারা পৃথক ব্যবস্থাপনা করলেও পরে আর তা সম্ভব হয়নি। কোনও কোনও হাসপাতালে শিশুদের নির্ধারিত ওয়ার্ডে জায়গা দিতে না পেরে রাখা হয়েছে নারীদের ওয়ার্ডে, সার্জারি ওয়ার্ডে, স্ট্রোক সেন্টারে, সিসিইউতে, বারান্দায়, লবিতে।

ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল একেএম নাসির উদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এক হাজার ৩২১ জন। এর মধ্যে ছাড়পত্র নিয়েছেন ৮৬৫ জন আর বর্তমানে ভর্তি আছেন ৪৫৬ জন, যা এই হাপসাতালের জন্য রেকর্ড।’

স্বাস্থ্য অধিকার আন্দোলনের সভাপতি এবং বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ডা. রশীদ-ই-মাহবুব বলেন, ‘ঢাকা শহর এখন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। ডেঙ্গুর যে প্রাদুর্ভাব, তাতে করে একটি কঠিন ক্রাইসিসের মধ্যে দিয়ে আমরা যাচ্ছি, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।’

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, আমাদের দেশে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব বেশি দেখা যায়। এবার আর্লি ব্রেকআউট হয়েছে বলেই এই সময়ে এতো বেশি মানুষ আক্রান্ত হয়েছে। তাই স্বাভাবিক যে নিয়ম রয়েছে, সেই নিয়ম অনুযায়ী সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে, সেটা অস্বাভাবিক কিছু নয়।