১৩ দিনেও গ্রেফতার হননি প্রাইম কারখানার মালিক

প্রাইম কারাখানার আগুন নেভানোর দৃশ্য (ফাইল ছবি)




ঢাকার অদূরে কেরানীগঞ্জের অবৈধ ‘প্রাইম প্লাস্টিক কারখানা’র অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে এখন পর্যন্ত মারা গেছেন ২২ জন শ্রমিক। এছাড়াও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন ১০ জন। ১১ ডিসেম্বর অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে ১৩ দিন পার হলেও এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি কারখানা মালিককে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাটি সিলাগালা করে রাখা হয়েছে।

পুলিশ বলছে, এই ঘটনায় কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। কারখানার মালিক নজরুল ইসলামকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে।

এদিকে এতো শ্রমিক নিহত-আহত হওয়ার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ক্ষতিগ্রস্তদের কোনও পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি বলে জানিয়েছেন স্বজনরা। এমনকি ১৩ দিনেও কারখানা মালিক গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।

তবে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগুনের ঘটনায় নিহত একজন শ্রমিকের ছোট ভাই বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা দায়ের করেছেন। আমরা প্রাইম প্লাস্টিক কারখানার মালিককে গ্রেফতারের চেষ্টা চালাচ্ছি। আগুনের ঘটনার পর থেকে তিনি পলাতক রয়েছেন।’  

ইতোপূর্বে অবৈধ কারখানার বিষয়ে পুলিশ কোনও ব্যবস্থা নেওয়া নিয়েছিল কিনা জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘কল-কারখানা বৈধ-অবৈধ কিনা তা দেখার জন্য সরকারের আলাদা বিভাগ কাজ করে। সেটা আমাদের দেখার বিষয় না। তবে যদি কেউ অভিযোগ করে, তখন আমরা তা খতিয়ে দেখতে পারি। এই কারখানার কোনও অনুমোদন ছিল না। গত চার-পাঁচ বছর ধরে অবৈধভাবেই চলছিল। তবে ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাটি প্রশাসন সিলগালা করেছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন কমিটির তদন্ত চলছে। পাশাপাশি যেসব অবৈধ কারখানা এখনও পরিচালিত হচ্ছে, সন্ধান পেলেই সংশ্লিষ্ট বিভাগকে অবহিত করা হচ্ছে। সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, কেরানীগঞ্জের চুনকুটিয়ায় অবস্থিত এই প্রাইম প্লাস্টিকের কারখানা। বিশাল জমির ওপর গড়ে ওঠা কারখানায় প্লাস্টিকের ওয়ানটাইম প্লেট ও কাপ তৈরির কাজে নিয়োজিত ছিলেন অন্তত দেড় শতাধিক শ্রমিক। ১১ ডিসেম্বর বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে কারখানার গ্যাস চেম্বারের লিকেজ থেকে ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। দগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মাহবুব নামে একজনের মৃত্যু হয়। এছাড়াও কারখানার দগ্ধ ৩১ জন শ্রমিককে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের (ঢামেক) হাসপাতালের বার্ন ইউনিট ও শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। ঘটনাস্থলে নিহত মাহবুব ছাড়াও এখন পর্যন্ত হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ২১ জনের মৃত্যু হয়েছে।

শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, ‘এখানে ১০ জন লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। ৮ জন মারা গেছেন। বর্তমানে দুজন আইসিইউতে রয়েছেন। অবস্থার উন্নতি হওয়ায় কয়েকদিন আগেই তাদের লাইফ সাপোর্ট খুলে নেওয়া হয়েছে।’   




এদিকে কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত এবং ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানতে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদফতর এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে পৃথক দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কারখানা সিলগালা করে দেওয়ায় তদন্তে কিছুটা বেগ পাচ্ছেন ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের তদন্ত কমিটির সদস্যরা।

এবিষয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান ও ফায়ার সার্ফিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স অধিদফতরের উপ-পরিচালক (অ্যাম্বুলেন্স) মো. আবুল হোসেন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কারখানাটি জেলা প্রশাসক সিলগালা করে রেখেছেন। একারণে আমাদের কাজ করার কোনও সুযোগ নেই। এছাড়াও কারখানার মালিকপক্ষ ও শ্রমিকদের কাউকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাই তদন্ত এখনও সম্পন্ন হয়নি।’

তবে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে তিনি বলেন, ‘ওই কারখানায় আগুনের ভায়বহতা ও নমুনা এবং ঘটনাস্থল থাকা আলামত দেখে ধারণা করা যাচ্ছে- কারখানার গ্যাস চেম্বারের লিকেজ থেকেই আগুনের সূত্রপাত ঘটে। এরপরও সম্পূর্ণ তদন্ত না হলে সুনির্দষ্টভাবে কারণ বলা সম্ভব হচ্ছে না।’  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রাইম প্লাস্টিক কারখানায় ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে একবার আগুন লেগেছিল। এরপর ২০১৯ সালের এপ্রিল মাসেও আগুনের ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও শ্রমিকদের অভিযোগ, কারখানায় তিনবার বড় ধরণের আগুনের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও প্রায়ই কারখানাটিতে ছোটখাটো আগুনের ঘটনা ঘটতো। এর আগে কারখানার ফায়ার সেফটির বিষয়ে মালিককে বলা হয়েছিল কিন্তু তিনি পাত্তা দেননি।