‘গাড়ি রাখবো কোথায়?’

সড়কে পার্কিং‘গাড়ি থেকে কেবল গাড়ির মালিক আর মেয়েকে নামিয়ে দিয়েছি। তারা ব্যাংকের ভেতরে প্রবেশ করেছে। গাড়ি নিয়ে কোথাও দাঁড়াতে পারছি না। মার্কেটের নিরাপত্তাকর্মী, পুলিশ সবাই গাড়ি ধাওয়া করে। অথচ এখানে পার্কিংয়ের কোনও জায়গা নেই। সড়কের পাশে একটু দাঁড়ালেও মামলা। গাড়ি রাখবো কোথায়?’ বৃহস্পতিবার (৯ জানুয়ারি) বিকালে কাওরান বাজারের ওয়ান ব্যাংকের সামনে মো. সালাম নামে একজন প্রাইভেটকার চালক এভাবেই তার অভিযোগের কথা বলেন।
যানবাহন অনুপাতে রাজধানীতে পার্কিংয়ের জায়গা না থাকায় প্রায়ই এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয় চালকদের। নতুন আইন অনুযায়ী, অবৈধ পার্কিংয়ের জরিমানা বেড়েছে। কিন্তু বাড়েনি পার্কিংয়ের জায়গা।

নতুন সড়ক পরিবহন আইনে সঠিক স্থানে মোটর যান পার্কিং না করলে কিংবা নির্ধারিত স্থানে যাত্রী বা পণ্য ওঠানামা না করলে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানার বিধান করা হয়েছে। কিন্তু ঢাকায় পার্কিংয়ের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। তাই নগরীতে ৮০ শতাংশ গাড়ি যত্রতত্র পার্কিং করতে বাধ্য হয়।

পার্কিং ব্যবস্থা নিয়ে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ব্যর্থতায় জরিমানা গুনতে হয় গাড়ির মালিকদের। এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যানবাহন মালিক ও নগরবিদরা।

বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ, পার্কিং নীতিমালা তৈরি করা উচিৎ। নীতিমালা অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পার্কিং নিশ্চিত করতে হবে। তবে রাজউক ও সিটি করপোরেশনের দাবি, তারা চেষ্টা করছে। ধীরে ধীরে অবস্থার পরিবর্তন হবে।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সরওয়ার জাহান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘অবৈধ দখল ও অবৈধ পার্কিং সব জায়গায়। ঢাকার আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনে শতভাগ পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারছে না রাজউক। ঠিক তেমনি দুই সিটি করপোরেশনও সড়কে গাড়ি রাখার কোনও ব্যবস্থা করতে পারছে না। তাই অবৈধ পার্কিং হচ্ছেই। শহরে পার্কিং বলতে কিছু নেই। মানুষ জানে না, কোথায় পার্কিং।’

সিটি করপোরেশন ঢাকায় মতিঝিলে সাধারণ বীমা অফিসের উল্টো দিকে একটি বহুতল ভবনে ৩৭০টি গাড়ি পার্কিং-এর ব্যবস্থা করেছে। এর পাশাপাশি ৩৭ তলা সিটি সেন্টারেও প্রায় সাড়ে ৫০০টি গাড়ি পার্ক করার ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া বসতবাড়ি এবং কিছু কিছু অফিসে নিজস্ব গাড়ি রাখার ব্যবস্থা আছে ঢাকায়। এর বাইরে পুরো রাজধানীতে আর কোনও সুনির্দিষ্ট পার্কিং ব্যবস্থা নেই। তাই অফিস এবং ব্যবসা চলাকালীন সময়ে ৮০ ভাগ গাড়ি রাস্তায় যত্রতত্র পার্কিং করা হয়। শুধু তাই নয়, সেগুলো থেকে নিয়মিত টোলও আদায় করা হয়। এছাড়াও সিটি করপোরেশন ও ডিএমপি-র ট্রাফিক বিভাগের উদ্যোগে রাজধানীর প্রশস্ত কিছু সড়কে পার্কিং করা হয়েছে। তবে এতে সমস্যার সমাধান হয়নি।

অধ্যাপক ড. সরওয়ার জাহান বলেন, ‘সমস্যার যেভাবে সমাধান করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তা আসলে পর্যাপ্ত না। পার্কিংয়ের জন্য একটি নীতিমালা থাকা দরকার। ঢাকায় গাড়ি নিয়ে বের হলে মানুষ জানে না সে কোথায় এটি নিরাপদে পার্কিং করতে পারবে। পুলিশ একেক সময় একেক সড়কের জন্য একেক নিয়ম তৈরি করে। কখনও বলে এই সড়কে পার্কিং করা যাবে, আবার বলা হয়, যাবে না। তাই কখন কোথায় চালক জরিমানায় পড়বে, তা কেউ জানে না।’

গত ২২ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনাল (ডিআই) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যক্তিগত গাড়িতে চলাচলকারী ছয় শতাংশ মানুষ ঢাকার ৭৬ ভাগ সড়ক দখল করে আছে। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মোট সড়কের ৬০ থেকে ৬৫ ভাগ থাকে ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে। গণপরিবহনের দখলে থাকে ৬ থেকে ৮ শতাংশ। সড়কের বাকি অংশ বিভিন্নভাবে অবৈধ দখল ও অবৈধ পার্কিয়ের দখলে থাকে।

ব্যক্তিগত গাড়ি সড়কের অর্ধেকের বেশি জায়গা দখল করে রাখে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিচার্জ ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পার্কিংয়ের জন্য শাস্তি বড় হলেও এখনও জায়গা বাড়ানো যায়নি। পার্কিংয়ের বিষয়টি সমাধান হওয়া উচিৎ। ভবন মালিকরা ভবনের নিচে কোনও পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখেন না। রাজউক থেকে অনুমোদন নেওয়ার সময় যে নকশা দেখানো হয় পরে তা ঠিক রাখেন না তারা। ভবনের পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান করে রাখেন। এসব বিষয়ে রাজউককে নজরদারি করতে হবে।’  

গত শনিবার রাজধানীর নিউমার্কেটের চন্দ্রিমা সুপার শপের সামনে একটি প্রাইভেট কার পার্কিং করে মালিক ভেতরে প্রবেশ করেন। কিছুক্ষণ পর সেখানে কর্তব্যরত ট্রাফিক পুলিশের সার্জেন্ট ওই সড়কে রাখা সব যানবাহনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেন। এমন সময় অনেককেই দ্রুত সেখান থেকে গাড়ি নিয়ে চলে যেতে দেখা যায়। এদের মধ্যে একজন প্রাইভেট কার চালকের নাম জাকির। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোনও শপিং মলে পার্কিং ব্যবস্থা নেই। মানুষ কোথায় গাড়ি রাখবে? পার্কিংয়ের কোনও ব্যবস্থা নেই শহরে। কিন্তু মামলা আছে।’

ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. মফিজ উদ্দিন আহম্মেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা রাজউককে এর আগে চিঠি দিয়ে জানিয়েছিলাম, যাতে রাজধানীর ভবনগুলোতে পর্যাপ্ত পার্কিং ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু আমরা দেখছি অনেক ভবনে সেই ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। এজন্য মানুষ বাধ্য হয়ে সড়কে গাড়ি পার্কিং করে। যানজট তৈরি হয়। ভবনের পার্কিং ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যেসব সড়কে সহনীয় পর্যায়ে জায়গা রয়েছে সেখানে কেউ চাইলে সিটি করপোরেশনের অনুমোদন নিয়ে পার্কিং ব্যবস্থা করতে পারে। তবে আইনগতভাবে নির্ধারিত স্থানেই গাড়ি পার্কিং করতে হবে।’

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন পুলিশের চাহিদা অনুযায়ী তাদের এলাকায় ১৩টি স্থান চূড়ান্ত করে। পরে বিভিন্ন ধরনের অভিযোগের কারণে ৯টি স্থানের পার্কিং ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। দক্ষিণেও বেশ কয়েকটি সড়কে পার্কিং ব্যবস্থা করা হলেও পরে নানা কারণে তা বাতিল করা হয়। বর্তমানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ছয়টি পার্কিং ব্যবস্থা রয়েছে। তবে পুলিশ যেসব সড়ক পার্কিংয়ের জন্য চিহ্নিত করেছিল সেগুলোর অনুমোদন দেয়নি সিটি করপোরেশন।

সড়কে গাড়ি পার্কিংয়ের বিষয়ে ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলামের বক্তব্যের জন্য তাকে একাধিকবার ফোন ও ম্যাসেজ দিলেও তিনি কোনও উত্তর দেননি।

রাজউকের মেম্বার (উন্নয়ন) মেজর (অবসর) শামসুদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ভবনগুলোতে নকশা অনুযায়ী পার্কিং ব্যবস্থা রাখার কথা। কিন্তু অনেকে অর্থের লোভে পার্কিংয়ের জায়গায় দোকান তৈরি করে। আমরা প্রায়ই এসব ভবনে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি। এটা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক। গুলশান ও হাতিরঝিলে দুটি পার্কিং বানিয়েছি। এছাড়া আরও কিছু পার্কিং তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে আমাদের।’