স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী জাহিদ মালেকের সদ্য সাবেক সহকারী একান্ত সচিব (এপিএস) ড. আরিফুর রহমান সেখ ও তার ১০ সহযোগীর বিরুদ্ধে প্রায় ৮ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগের প্রমাণ পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। সংস্থাটির চার মাসের অনুসন্ধানে এমন তথ্যই বেরিয়ে এসেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত বছর (২০১৯) চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি খাত কর্মসূচির (এইচপিএনএসপি) আওতায় চিকিৎসা শিক্ষা ও স্বাস্থ্য জনশক্তি উন্নয়ন (এমই অ্যান্ড এইচএমডি) শাখা থেকে জনস্বাস্থ্য ও ক্লিনিক্যাল বিভিন্ন বিষয়ের ওপর চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর নামে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়। তাদের মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কায় পাঠানোর নামে এই টাকা আত্মসাৎ করা হয়।
টাকা আত্মসাতের ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে আরিফুরের থাইল্যান্ড প্রবাসী ভাই ড. আলতাফুর রহমান সেখের নামও আছে। আলতাফুর থাইল্যান্ডের থমসট ইউনিভার্সিটির স্কুল অব গ্লোবাল স্টাডিজের ফ্যাকাল্টি মেম্বার।
আরেক থাইল্যান্ড প্রবাসী বাংলাদেশি সরফরাজ নেওয়াজ জিউস ও তার ঢাকার এজেন্ট ডা. আনোয়ার জাবেদও টাকা আত্মসাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন বলে দাবি করেন দুদকের এক কর্মকর্তা।
আরিফুরের অন্য সহযোগীরা হলেন মেডিকেল অ্যাডুকেশন অ্যান্ড হেলফ ম্যানপাওয়ার ডেভেলপমেন্ট শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. নাছির উদ্দিন, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শামীম আল মামুন ও ডা. মোস্তফা কামাল পাশা, কম্পিউটার অপারেটর (আউট সোর্সিং) সুভাষ চন্দ্র দাশ, অফিস সহকারী মো. আলমগীর ও কম্পিউটার অপারেটর কাম-সাঁট মুদ্রাক্ষরিক লায়েল হাসান।
তবে এ বিষয়ে মুখ খোলেননি ড. আরিফুর রহমান সেখ। আর দুদকের অনুসন্ধানে অন্য যাদের নাম এসেছে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গত বছরের ১৩ অক্টোবর আরিফুর ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের ফাইল অনুসন্ধানের জন্য অনুমোদন করে দুদক। এর আগে গত বছরের জুলাইয়ে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এ বিষয়ে অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত হয়। অভিযোগ অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান দুদকের উপপরিচালক মো. আলী আকবর।
পরে অবশ্য অনুসন্ধানের দায়িত্ব পায় স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি অনুসন্ধানে গঠিত দুদকের বিশেষ দল। এই দলের দলনেতা হলেন সংস্থার উপপরিচালক সামছুল আলম। তিন সদস্য বিশিষ্ট অনুসন্ধান টিমের অন্য দুই সদস্য হলেন উপ সহকারী পরিচালক সহিদুর রহমান ও ফেরদৌস রহমান।
দুদকের উপপরিচালক মো. আলী আকবর অনুসন্ধানের শুরুতেই গত বছরের ১৪ অক্টোবর স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের বক্তব্য নেন। ১৫ অক্টোবর অভিযোগ ওঠা কর্মকর্তাদের ই-মেইল জব্দ করেন।
২০ অক্টোবর মেডিক্যাল অ্যাডুকেশন অ্যান্ড হেল্প ম্যানপাওয়ার ডেভেলপমেন্ট শাখার লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. নাজমুল ইসলাম, প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. মো. নাছির উদ্দিন, ডেপুটি প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শামীম আল মামুন ও ডা. মোস্তফা কামাল পাশা এবং ২১ অক্টোবর কম্পিউটার অপারেটর (আউট সোর্সিং) সুভাষ চন্দ্র দাশ, অফিস সহকারী মো. আলমগীর ও কম্পিউটার অপারেটর কাম-সাঁট মুদ্রাক্ষারিক লায়েল হাসানকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন দুদকের উপপরিচালক মো. আলী আকবর।
গত ১৪ জানুয়ারি ড. আরিফুর রহমান সেখকে তলব করে নোটিশ পাঠান দুদকের উপপরিচালক মো. সামছুল আলম। তলবি নোটিশে ২০ জানুয়ারি দুদকে হাজির হতে বলা হয় তাকে।
নোটিশে বলা হয়, ‘তার বিরুদ্ধে বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ লোপাট এবং বিভিন্ন সরকারি হাসপাতাল ও মেডিক্যাল কলেজে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান চলছে। এ বিষয়ে বক্তব্য দেওয়ার জন্য তাকে দুদক প্রধান কার্যালয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলো।’ দুদক পরিচালক কাজী শফিকুল আলমের বিশেষ অনুসন্ধান-তদন্ত শাখা-১ থেকে নোটিশটি দেওয়া হয়। এতে সই করেন অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা উপপরিচালক সামছুল আলম।
নোটিশ হাতে পাওয়ার পর সময় চেয়ে আবেদন করেন ড. আরিফুর। পরে ২৩ জানুয়ারি হাজির হতে বলা হয় তাকে। সেই অনুযায়ী হাজির হলে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় তাকে। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আড়াই ঘণ্টা ধরে চলে জিজ্ঞাসাবাদ। এসময় আরিফুর গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন বলে জানান দুদকের এক কর্মকর্তা।
বিসিএস ইকোনমিক ক্যাডারের কর্মকর্তা আরিফুর রহমান স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এপিএস হিসেবে দায়িত্ব নেন গত বছরের ২২ জানুয়ারি। এর আগে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সহকারী প্রধান (স্বাস্থ্য-৭) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি। গত ১৪ জানুয়ারি দুদক তলবি নোটিশ পাঠানোর পরদিন ১৫ জানুয়ারি তাকে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এপিএস এর দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখার সিনিয়র সহকারী সচিব শাহাদাত হোসেন কবিরের সই করা এক অফিস আদেশে এই অব্যাহতি দেওয়া হয়।
অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট দুদকের এক কর্মকর্তা জানান, গেল বছর এইচপিএনএসপি’র আওতায় এমই অ্যান্ড এইচএমডি শাখা থেকে জনস্বাস্থ্য ও ক্লিনিক্যাল বিভিন্ন বিষয়ের ওপর চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিদেশে প্রশিক্ষণে পাঠানোর জন্য ১৯টি বিষয়ের আওতায় ৩১টি প্যাকেজে ৪২৬ জনের নামে সরকারি আদেশ জারি করা হয়। এতে প্রশিক্ষণার্থীদের সম্মানী ভাতা বাবদ ৪ কোটি ৯৭ লাখ ৯৭ হাজার ৬৭৫ টাকা ও বিমান ভাড়া বাবদ ২ কোটি ২৭ লাখ ৮৬ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়। টিউশন, ইনস্টিটিউশনাল ও প্রোগ্রাম ডেভেলপমেন্ট ব্যয় দেখানো হয় ১৪ কোটি ৩৭ লাখ ১১ হাজার ৪৭২ টাকা। সব মিলে ব্যয় দেখানো হয় ২১ কোটি ৭২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৭ টাকা। দুদকের পর্যালোচনায় দেখা গেছে প্রশিক্ষণের জন্য জনপ্রতি ৪ হাজার মার্কিন ডলার (৩ লাখ ৪০ হাজার টাকা) ব্যয় দেখানো হয়েছে। পৃথক দেশের প্রতিষ্ঠান হলেও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যয় একই ধরা হয়েছে।
দুদকের ওই কর্মকর্তা বলেন, আগের বছরগুলোতে একই কর্মসূচিতে গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার ডলার ব্যয় হলেও গত বছর জনপ্রতি গড়ে ২ হাজার ডলার অতিরিক্ত ব্যয় ধরা হয়।