ছিনতাইকারী-ম্যানহোল চোরকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান র‌্যাবের ডিজি’র

সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রাখছেন র‌্যাবের ডিজি বেনজির আহমেদ

ছিনতাইকারী-ম্যানহোল চোরকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ান (র‌্যাব) এর ডিজি বেনজীর আহমেদ। বৃহস্পতিবার (৩০ জানুয়ারি) ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি নির্বাচনের আইনশৃঙখলা পরিস্থিতি নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে এ মন্তব্য করেন তিনি। তিনি আরও বলেছেন, ‘যেসব নির্বাচনি কেন্দ্র ঝুঁকিপূর্ণ, সেদিকে আমাদের দৃষ্টি রয়েছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অপকর্মের দুঃসাহস কেউ দেখাবেন না। আমরা এটা প্রত্যাশা করি না। যদি করেন, তবে অবশ্যই ইলেক্টোরাল ল’ এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী আমরা কঠোর ব্যবস্থা নেবো।’  এসময় তিনি বলেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় যাতে কেউ অপপ্রচার করতে না পারে, সেজন্য আমরা খেয়াল রাখছি।

তিনি বলেন, ‘আমরা আইন শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করেছি। যাতে নগরবাসী নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে পারেন। এবং যার যাকে ইচ্ছা এবং ভীতিমুক্ত পরিবেশে ভোট দিতে পারেন। গত নির্বাচনের চাইতেও এবার বেশি সংখ্যক র‌্যাব মোতায়েন থাকবে। ঢাকায় যে পাঁচটি ব্যাটালিয়ন রয়েছে, সেখানে স্ট্রাইকিং ফোর্স থাকবে। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আমাদের কমান্ডো, হেলিকপ্টার, বোম্ব ও ডগ স্কোয়াড রেডি থাকবে। আমরা ২৪ ঘণ্টা মনিটরিংয়ে রাখবো। আজকে থেকেই আমরা নির্বাচনি দায়িত্ব শুরু হয়েছে। এখন থেকে ৫৬ ঘণ্টা আমরা সার্বক্ষণিক মনিটরিং করবো।’

বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা এই নির্বাচন উপলক্ষে ইতোমধ্যে সব ধরনের হুমকি এবং ঝুঁকি পর্যালোচনা করেছি। কোনও ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সৃষ্টি যাতে হতে না পারে, সেজন্য আমরা সতর্ক রয়েছি। আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করছি। সোশ্যাল মিডিয়ায় যাতে কেউ অপপ্রচার করতে না পারে, সেজন্য আমরা খেয়াল রাখছি। তাছাড়া ইলেকশন আসলে যেসমস্ত অপকর্মের চেষ্টা করা হয়, সবকিছুর বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে। এ ধরণের চেষ্টা কেউ করলে আমরা নির্বাচন কমিশনের আইন ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী যেখানে যা প্রয়োজন তা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।’

আগামী শনিবার ঢাকার দুই সিটির মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত আসনের কাউন্সিলর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দুই সিটিতে মোট ১২৯ টি ওয়ার্ড রয়েছে। এসব ওয়ার্ডে নির্বাচনের জন্য ১ হাজার ২৮২টি ভেন্যুতে মোট ২ হাজার ৪৬৮টি ভোট কেন্দ্র স্থাপন করেছে ইলেকশন কমিশন। দুই সিটিতে মোট ৫৪ লাখ ভোটার ৬৩ হাজার চার শতাধিক ভোটার রয়েছেন। এই নির্বাচন উপলক্ষে ১৩ জন মেয়র প্রার্থী, সংরক্ষিত ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ১৫৯ জন, সাধারণ কাউন্সিলর পদে ৫৭৭ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।

অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার র‌্যাবের এই কর্মকর্তা বলেন, ‘প্রতিটি ওয়ার্ডের পাশাপাশি চারটি ওয়ার্ডের জন্য একজন করে অফিসার নিয়োগ করেছি। যাতে সে প্রোপারলি সুপারভাইজ করতে পারে। আমরা শহরের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে চেকপোস্ট করবো। ভোটকেন্দ্রের আশেপাশের রাস্তাগুলো যাতে নিরাপদ থাকে সেদিকে আমরা দৃষ্টি রাখবো। যাতে লোকজন নিরাপদে ভোট দিয়ে বাসায় ফিরতে পারে। এই পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করবো। যদি প্রয়োজন মনে করি তাহলে যেখানে প্রয়োজন সেখানে মেটাল ডিটেক্টরের মাধ্যমে তল্লাশি করবো।’

র‌্যাব প্রধান বলেন, ‘ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তার পাশাপাশি ফলাফল গণনা ও রিটার্নিং অফিসারের কাছে ফলাফল না যাওয়া পর্যন্ত আমাদের কার্যক্রম চলবে। কেউ নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নিবৃত্ত করা হবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কাউকে কোনও গলোযোগ সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। আমরা ভোটকেন্দ্রগুলোতে কোনও অবাঞ্ছিত লোকজন জড়ো হোক তা চাই না। সেটা আমরা আজ রাত থেকেই খেয়াল রাখবো।’

ছিনতাইকারী-ম্যানহোল চোরকে ভোট দেবেন না

বেনজীর আহমেদ বলেছেন, ‘আমাদের প্রত্যাশা, নগরবাসী খেয়াল রাখবেন যাতে কোনও ছিনতাইকারী, ম্যানহোলের ঢাকনা চোর শ্রেণির কোনও লোকজন যাতে নির্বাচিত হয়ে না আসতে পারে। যদি স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও যদি ম্যানহোলের ঢাকনা চোর যদি কাউন্সিলর হয়ে নির্বাচিত হয়ে আসে তাহলে সেটা আমাদের জন্য খুবই দুঃখজনক।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, চলমান সামাজিক যে যুদ্ধগুলো রয়েছে, বিশেষ করে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ, এসব যুদ্ধের বিরুদ্ধে, যারা জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাদের প্রত্যেককেই আমরা সঙ্গে পাবো। সেজন্য আমরা আশা করবো যে যথাযোগ্য লোক নির্বাচিত হয়ে আসবেন। আমরা একসঙ্গে কাজ করবো দেশ থেকে মাদক স্থায়ীভাবে দূর করবার জন্য, জঙ্গি সন্ত্রাস দূর করবার জন্য এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে কাজ করবার জন্য।’

বহিরাগতদের ঢাকা ছাড়ার আহ্বান

নির্বাচনের ক্যাম্পেইনের জন্য ঢাকার বাইরে থেকে প্রার্থীরা যাদের এনেছিলেন তাদের ঢাকা ছেড়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। শান্তিপূর্ণ ভোট প্রত্যাশা করে তিনি বলেন,‘আগামীকাল ও ভোটের দিন এই নগর উন্মুক্ত থাকে শুধু ভোটারদের জন্য। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা ক্যাম্পেইন করার জন্য ঢাকার বাইরে থেকে আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে এসেছেন। ক্যাম্পেইন শেষ। আমরা আশা করবো আপনাদের কাজ শেষ, আপনারা এখন ঢাকা ছেড়ে যাবেন। যেহেতু আপনাদের ভোটিং রাইট নাই, খামাখা এখানে থাকার কোনও যুক্তি আছে বলে আমরা মনে করি না।’

আগামী দুই দিন জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঢাকা সফরের জন্য দেশবাসীকে নিরুৎসাহিত করে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘আগামী দুই দিন ঢাকায় যারা চলাফেরা করবেন, দয়া করে তারা পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখবেন, এটা আমাদের পরামর্শ। যাতে আমরা বুঝতে পারি আপনি নগরবাসী নাকি বাইরের কেউ। আমাদের অনুরোধ, ঢাকাবাসী যারা ঠিকানা সম্বলিত আইডি সঙ্গে রাখবেন। তাতে সুবিধা হবে, আমরা অবাঞ্ছিত ও অনাকাঙ্ক্ষিত লোকজনকে এবং অপ্রয়োজনীয় অপৎতপরতা রুখতে সহায়তা করবে। এটি মূলত নির্বাচনি পরিবেশকে শান্তিপূর্ণ ও সুসঙ্গত রাখার জন্য।’

প্রার্থীদের আত্মীয়-স্বজন ঢাকায় থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হবে কিনা এই প্রশ্নের উত্তরে র‌্যাব মহাপরিচালক বলেন, ‘কেউ থাকলেই তাতে জেলে পাঠিয়ে দেবো সেরকম না। আমরা আমাদের নাগরিকদের সহজেই জেলে পাঠাতে চাই না। প্রত্যেকটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রয়েছে যে কোনও জায়গায় থাকার। জেল-জুলুমের  ভীতি দেখাতে চাই না। আমরা একটা আহ্বান রেখেছি। যাতে এই শহরের জেনুইন ভোটার তারা শৃঙ্খলভাবে ভোট দিতে পারে। যদি কেউ জেলে ঢোকার কাজ করে তাহলে সে জেলে যাবে।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকার বাইরে থেকে ক্যাম্পেইন করতে যারা এসেছেন। ওকে ক্যাম্পেইন শেষ, গো ব্যাক। আর যদি কেউ থেকেই যান, তবে যেখানে আছেন সেখানেই থাকবেন। ভোটারদের চলাচলের পথ সুগম করবেন। ঝামেলা করবেন না, কোনও ধরনের হাঙ্গামা করবেন না।’

যা ঘটেছে তা তুচ্ছ ঘটনা

নির্বাচনি ক্যাম্পেইনকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া সংঘর্ষগুলোকে তুচ্ছ ঘটনা অভিহিত করে র‌্যাবের ডিজি বলেন, ‘যেগুলো ঘটেছে তা খুবই সামান্য। প্রিভিয়াস হিস্টোরি (অতীত ইতিহাস) যদি দেখেন তাহলে সেই তুলনায় এগুলো তুচ্ছ ঘটনা। পার্শ্ববর্তী দেশেও দেখেন। এগুলো তুচ্ছ ঘটনা। এগুলো যেমন বড় করে দেখার কিছু নেই, তেমনি এগুলো উপেক্ষা করা যাবে না। কেউ যদি ইলেক্টোরাল ল’ ভাঙে, তাহলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি নির্বাচন কমিশন, ম্যাজিস্ট্রেট ও থানায় গিয়ে অভিযোগ করতে পারেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে প্রতিটা কেন্দ্রই গুরুত্বপূর্ণ। বিবাদমান প্রতিদ্বন্দ্বী যারা আছেন তারা কোনও ধরনের ঝামেলা করার চেষ্টা করবেন না। কেউ যদি কোনও ধরনের সংক্ষুব্ধ হন, তারা আইনের আশ্রয় নিতে পারবেন। আগের মতো কোনও সাংঘর্ষিক কাজে আবার লিপ্ত হবেন না। আর যদি লিপ্ত হন। আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেবো। মনে রাখতে হবে, আমরা আগে যে পরিমাণ ক্যাপাসিটি ছিল তার চেয়ে এখন বেশি ক্যাপাসিটি আছে।’