দেশে প্রথমবারের মতো তৈরি করা হয়েছে ভ্রাম্যমাণ এক্সরে গাড়ি। এই গাড়িতে বিনামূল্যে যক্ষ্মা নির্ণয়ের ব্যবস্থা আছে। বাংলাদেশ থেকে যক্ষ্মা নির্মূলের উদ্যোগ হিসেবে প্রাথমিকভাবে দুটি গাড়ি তৈরি করা হয়েছে। জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি (এনটিপি) ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের উদ্যোগে এটি চালু করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। গাড়ি দুটির একটি দিয়ে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে এবং অপরটি দিয়ে শহরের নিম্ন আয়ের মানুষদের সেবা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছে ব্র্যাক।
সংস্থাটি জানায়, যক্ষ্মা শনাক্তকরণে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এই ভ্রাম্যমাণ গাড়ি। এর মাধ্যমে বিনামূল্যে সেবা পাবেন রোগীরা। যক্ষ্মা রোগ শনাক্তকরণে উন্নত প্রযুক্তি সংযোজিত ভ্রাম্যমাণ এক্সরে গাড়ি দুটির সেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে আজ রবিবার (১ মার্চ) থেকেই। রাজধানীর হাতিরঝিলের মুক্তমঞ্চে বিকালে সেবা দেওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করে এই ভ্রাম্যমাণ গাড়ি। সেখানে এই চিকিৎসাসেবার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।
নগরে সেবা দেওয়া ভ্রাম্যমাণ গাড়িটির মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে নগরীর বিভিন্ন বস্তি, পোশাক কারখানার কর্মীরা উপকৃত হবেন। এর পাশাপাশি কাশিমপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেট কারাগারে এই গাড়ি দিয়েই বিনামূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে। আর অন্যটির মাধ্যমে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী চিকিৎসাসেবা পাবে।
ভ্রাম্যমাণ একটি গাড়ির ভেতর ঢুকে দেখা যায়, এতে দুটি রুম আছে। একটি এক্সরে মেশিন সম্বলিত এবং আরেকটি টেকনিশিয়ান মনিটর করার ব্যবস্থা আছে। এক্সরে রুমে পোশাক পরিবর্তনের ব্যবস্থাও আছে। পুরো ভ্রাম্যমাণ গাড়িটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত। এক্সরে তেজস্ক্রিয়তা নিঃসরণ রোধে এই গাড়ির দেয়ালে দুই মিলিমিটার পুরু লেড এর আবরণ ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় রুমে জিন এক্সপার্টের ব্যবস্থাও আছে। আছে এক্সরে ফিল্ম প্রিন্ট করার মেশিন। অসুস্থ ও শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য আছে হুইল চেয়ারের ব্যবস্থা। দুটি গাড়ির মধ্যে যেটি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্য ব্যবহার করা হবে সেটির গায়ে মিয়ানমারের ভাষায় এর পরিচিতি মুদ্রিত হয়েছে।
ব্র্যাক জানায়, এক্সরে ও জিন এক্সপার্ট সংযুক্ত বিশেষ ধরনের এই ভ্রাম্যমাণ গাড়ির মাধ্যমে প্রতিদিন ৫০-৮০ জন রোগী এক্সরে করার সুযোগ পাবেন। একজন ল্যাব টেকনিশিয়ান ও রেডিওগ্রাফার এর মাধ্যমে সম্ভাব্য রোগীকে তাৎক্ষণিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে অনলাইন পদ্ধতিতে দ্রুত ফল জানিয়ে দেওয়া হবে। বিপুল সংখ্যক মানুষের চাহিদা মাথায় রেখে এই বছরের জুলাই-আগস্টের মধ্যে এরকম আরও দুটি গাড়ি চালু করার কথাও জানান উদ্যোক্তারা।
ব্র্যাকের যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ প্রোগ্রামের সিনিয়র সেক্টর স্পেশালিস্ট ডা. রিজওয়ানা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমরা যাদের যক্ষ্মায় আক্রান্ত বলে ধারণা করি বা যাদের দুই সপ্তাহের বেশি কাশি আছে সেসব রোগী রেজিস্ট্রেশন করে এই সেবা গ্রহণ করতে পারবেন। আমাদের এখানে এক্সরে এবং জিন এক্সপার্ট করার ব্যবস্থা আছে। আমরা মূলত এক্সরে করবো, এই রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী জিন এক্সপার্ট করবো। উভয় ধরনের সুবিধাই গাড়িটিতে আছে।
তিনি আরও বলেন, এই সেবার মাধ্যমে ১৫-৩০ মিনিটের মধ্যে এক্সরে রেজাল্ট পাওয়া যাবে। আর জিন এক্সপার্টের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন দুই ঘণ্টা সময় লাগবে। রিপোর্টিং সিস্টেম পুরোটাই অনলাইন। এখান থেকে প্রাপ্ত ফল অনলাইনের মাধ্যমে সরাসরি যাবে চিকিৎসকের কাছে। তার পরামর্শ ও মন্তব্যসহ রিপোর্ট রোগীদের দেওয়া হবে।
ভ্রাম্যমাণ এই গাড়িগুলো সংযোজন করেছে জিএমই গ্রুপ। প্রতিষ্ঠানটির সরকারি বিভাগ বিষয়ক অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার ইকবাল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গাড়িগুলো এলসি করে আমরাই এনেছি। জাপানের হিনো গাড়ির মধ্যে যন্ত্রপাতি সংযোজন করে এই এক্সরে ভ্যান তৈরি করা হয়েছে। এর ভেতরের মেশিনগুলো শিমাদজু কোম্পানির আর এক্সরে মেশিনের প্রিন্টার ফুজিফিল্মের। এই গাড়িতে যেহেতু এক্সরে মেশিন আছে তাই তেজস্ক্রিয়তার একটি বিষয় আছে। এ কারণে গাড়ির বডিতে দুই মিলিমিটার পুরু লেডের আস্তর ব্যবহার করা হয়েছে। এটি দেখতে ছোট একটি গাড়ি মনে হলেও এর ভেতরে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি আছে। গাড়ি দুটি তৈরিতে এক বছরের বেশি সময় লেগেছে ।
তিনি আরও জানান, হিনো গাড়ির এই মডেলটি বাংলাদেশে প্রথম। গাড়িগুলো আলাদা তৈরি করে নিয়ে আসা হয়েছে জাপান থেকে। আর মেশিনগুলো আনাই হয়েছে যাতে গাড়িতে বসানো যায়।
প্রসঙ্গত, জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির (এনটিপি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে ২ লাখ ৯২ হাজার ৯৪২ জন যক্ষ্মারোগী শনাক্ত হয়েছে। এনটিপি সূত্র অনুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত সবধরনের (জীবাণুযুক্ত ও জীবাণুবহির্ভূত কফ) যক্ষ্মা রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসার সাফল্যের হার ৯৪.৪ শতাংশ। এক্ষেত্রে সরকারের আশাব্যঞ্জক সাফল্য সত্ত্বেও যক্ষ্মার ঝুঁকির বিবেচনায় বাংলাদেশে এটি এখনও মারাত্মক জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত।