করোনা আতঙ্কে সড়কে যানবাহন কম, কমেছে বায়ুদূষণ

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে বায়ুদূষণের চিত্র।করোনা ভাইরাস কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত তিন রোগী শনাক্ত হওয়ার প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর পথে-ঘাটে। কর্মব্যস্ত দিন হলেও প্রয়োজন ছাড়া পথে নামছেন না রাজধানীর মানুষ। এর ফলে দিনের বেলাও রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলো মোটামুটি ফাঁকা থাকছে গত দুদিন ধরে। তফাতটা প্রথম দেখায় চোখে নাও পড়তে পারে, তবে একটু পর্যবেক্ষণ করলে তা নজরে আসবে সবার। সড়কে যানজটও হচ্ছে কম। এর প্রভাব পড়েছে এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্সে। গত দুইদিন বায়ুমান সূচকে ঢাকার অবস্থান শীর্ষ ১০-এর নিচে। অথচ করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার আগে গত শনিবারও (৭ মার্চ) বায়ুদূষণের সূচকে শীর্ষ ছিল ঢাকা। গত দুইদিনে বায়ুমানের সূচক নেমে এসেছে দুই সংখ্যার ঘরে। রাস্তায় গত দুদিন যানবাহন কম দেখছে খোদ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ট্রাফিক বিভাগ।

বায়ুমান সূচক দেখে জানা যায়, দিনের বেলা অফিস চলাকালীন সময়ে সূচক ছিল ৯২। তাতে বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে ঢাকার অবস্থান ছিল ২০তম। আর শীর্ষ অবস্থানে ছিল থাইল্যান্ডের চিং মাই শহর। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল ভারতের মুম্বাই এবং তৃতীয় ছিল ভিয়েতনামের হো চিন মিন শহর। আবার অফিস সময়ের পর সূচক বেড়ে ৯৮ হলে ঢাকার অবস্থান হয় ১৩তম।

স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্রের (ক্যাপস) পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের দূষণের উৎস এতদিন ইটভাটা বলা হলেও ঢাকার বাতাসে যে সূক্ষ্ম কণা পাওয়া যায় তা যানবাহন, শিল্প কারাখানা ও জৈববস্তু পড়ানোর ধোঁয়া থেকে নির্গত হয়।

ক্যাপসের প্রতিষ্ঠাতা ও পরিচালক এবং স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, পরিবহন যে বায়ুদূষণের একটি বড় সোর্স তা প্রমাণ করে। যখন পরিবহনের পরিমাণ দিনের বেলা কমে যায়, তখন দূষণ কম লক্ষ করা যায়। রাতের বেলা পরিবহন এমনিতেই কমে যায়, কিন্তু সেটায় পরিবর্তন আসে না। আমরা ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস করে দেখেছি রাতের বেলায় বায়ুমান সূচকের তেমন কোনও পরিবর্তন হয় না। দিনের বেলা পরিবর্তন বেশি হচ্ছে।

মঙ্গলবার (১০ মার্চ) বায়ুদূষণ ইনডেক্সে ঢাকার অবস্থান ছিল ১৭ নম্বরেতিনি আরও বলেন, করোনার কারণে একান্ত প্রয়োজন না হলে মানুষের বাইরে না যাওয়ার প্রবণতা এ মুহূর্তে বেশি। গত দুই-তিনদিন ধরে এটা লক্ষ করা যাচ্ছে। পরিবহন সেক্টরের এই কন্ট্রিবিউশন কিন্তু প্রমাণ করে যে ট্রান্সপোর্ট কমে গেলে বায়ুদূষণ কমে। চীনের শহরগুলো কিন্তু পৃথিবীর অন্যতম দূষিত শহর। অনেকেই বলে থাকেন, খারাপ মানের বাতাসের সঙ্গে করোনার একটি প্রভাব পড়ে, যদিও এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এখনও পাওয়া যায়নি। যেখানে যেখানে বায়ুর মান খারাপ সেখানে ঝুঁকি বেশি। শুধু চীনের উহানের কথা দেখলেই বোঝা যায়, করোনা আসার পর বিশ্বব্যাপী বায়ুমান সূচক দেখলে বোঝা যায় শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো বিশ্বে বায়ুদূষণের মাত্রা কমে গেছে।

করোনা নিয়ে শঙ্কা আছে অভিভাবকদের মনে। তাই অনেকেই তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না। অভিভাবকরা মনে করছেন, এই মুহূর্তে স্কুলে পাঠানো খুব ঝুঁকির বিষয়। রাজধানীর ধানমন্ডির একটি স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থীর মা আলেয়া জানান, তার সন্তানকে তিনি গত দুইদিন স্কুলে পাঠাননি। স্বাস্থ্য ঝুঁকির কথা চিন্তা করেই এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে, রায়েরবাজার এলাকার এক স্কুলশিক্ষার্থীর মা জাহানারা আক্তার বলেন, তার ছেলের ক্লাসের কয়েকজন করোনার ভয়ে আসছে না। গতকাল তার ছেলে স্কুলে গেলেও আজকে তিনি নিজেই পাঠাননি।

এদিকে, দোলযাত্রার কারণেও সোমবার (৯ মার্চ) রাজধানীর অনেক বিদ্যালয়ে ছুটি ছিল।

প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থীর সমাগম হয় তেজগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে। সেখানে উপস্থিতি ভালোই আছে বলে জানান অধ্যক্ষ রেবেকা সুলতানা। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, আমাদের এখানে উপস্থিতি বেশ ভালোই আছে। তবে জনসমাগম কম করার নির্দেশ থাকায় অ্যাসেম্বলি কমিয়ে দিয়েছি। আর কেউ যদি অসুস্থ হয় তাকে আমরা বাড়িতে থাকার পরামর্শ দিয়েছি। এতে আমরা তাদের ছুটি ছাড় দিচ্ছি।

গণপরিবহনে যাত্রী কম থাকার কথাও জানিয়েছেন চালকরা। তারা এও বলেছেন, গত দুইদিন রাস্তায় প্রাইভেট গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক কম থাকছে দিনের বেলায়। সদরঘাট থেকে সাভারগামী বাসের চালক আসলাম। তিনি বলেন, যাত্রী কম থাকায় বাস একটু কম নামছে। আবার রাস্তায় প্রাইভেট গাড়িও কম চলে দেখলাম।

গত দু’দিন ঢাকার রাস্তায় গাড়ির পরিমাণ কম থাকার বিষয়টি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের নজরেও এসেছে। ডিএমপি’র ট্রাফিক বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মফিজউদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, গত দুইদিন রাস্তায় ট্রান্সপোর্ট কম এটা আমরাও পর্যবেক্ষণ করেছি। মূলত গণপরিবহন বলতে আমরা যেটা বুঝি বাস, সেটা কম।