জানা যায়, মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া চিঠিতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল কম্পাউন্ডের ভেতরে পুরাতন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট ও দুই নম্বর ভবনসহ নতুন করে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল ও গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে কোভিড-১৯ আক্রান্ত রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড ঘোষণা করা হয়। এসব হাসপাতালের সব রোগীদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে স্থানান্তর, সুচিকিৎসা নিশ্চিতের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়।
তবে এ ধরনের সিদ্ধান্ত সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন ঢামেক হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক ও বিশেষজ্ঞ। তারা বলছেন, ঢামেক হাসপাতাল দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ও রোগীদের শেষ ভরসাস্থল। পুরো দেশ থেকে এখানে রোগীরা আসেন। এখানকার পুরাতন বার্ন ইউনিটটি জরুরি বিভাগ থেকে কয়েক কদম দূরে। তাই অত্যন্ত সংক্রমিত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের সাধারণ রোগীদের পাশে একই হাসপাতাল এলাকায় রাখাটা বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হতে পারে। এতে ‘ক্রস ইনফেকশন’-এর ঝুঁকি অনেক বেড়ে যাবে। প্রয়োজনে পুরো হাসপাতালকেই কোভিডের জন্য ডেডিকেটেড করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢামেক হাসপাতালের একাধিক চিকিৎসক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউট ভবন করোনা আক্রান্ত রোগীদের জন্য শুরুতে ডেডিকেটেড করা হয়। তবে কোনও এক ‘অজানা কারণে’ সেটি প্রস্তুত করা হয়নি। অথচ একেবারে পৃথক এ ভবনেই চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে তা হতো সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত।
ঢামেক হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনের তিনতলায় কার্ডিওলজি বিভাগ, নেফ্রোলজি, নিউরোলজি, হেমাটোলজি-বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট, কার্ডিও থোরাসিক, ফিজিক্যাল মেডিসিনের রোগীরা চিকিৎসাধীন। এত বিভাগের রোগীরা যাবে কোথায় প্রশ্ন করলে চিকিৎসকরা বলছেন, ঢাকা মেডিক্যালের মূল ভবনে এমনিতেই ফ্লোরে থাকতে হয় রোগীদের, তার ওপর নতুন আসা রোগীদের যদি সেখানে নেওয়া হয়, তাহলে সে হাসপাতালের কী অবস্থা হবে? আবার যদি এসব রোগীদের বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে স্থানান্তরের কথা বলা হয়, সেক্ষেত্রে রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়বে। আবার অনেক রোগীরই ‘মাল্টিডিসিপ্লিনারি ট্রিটমেন্ট’ দরকার হয়, যেটা ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনে করা যায়, সেক্ষেত্রে তাদের সমস্যায় পড়তে হবে।
ঢামেক হাসপাতাল এলাকার পুরাতন বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ভবন ও দুই নম্বর ভবনকে কোভিডের জন্য ডেডিকেটেড ঘোষণার সমালোচনা করেছেন কোভিড-১৯ জাতীয় প্রতিরোধ কমিটি ও জাতীয় টেকনিক্যাল কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান।
তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবন এবং পুরাতন বার্ন ইউনিটকে কোভিড রোগীদের জন্য ডেডিকেটেড করা হচ্ছে চরম সিদ্ধান্তহীনতার বহিঃপ্রকাশ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশেষজ্ঞদের মতের কোনও তোয়াক্কাই করছে না। একই চত্বরে কোভিডের মতো ছোঁয়াচে রোগীর চিকিৎসা খুবই ঝুঁকির্পূণ হবে।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এ কে এম নাসির উদ্দিনও একই চত্বরে কোভিড ও সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে দেখছেন।
শেখ হাসিনা বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে কোভিড রোগীদের রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওখানে বা ওইদিকের ইন্ডিপেন্ডেন্ট হাসপাতালকে খালি করে রাখা গেলে, সবচেয়ে ভালো হতো। তাহলে কেন সেটা করা যাচ্ছে না, প্রশ্নে তিনি বলেন, সেটা আমি বলতে পারছি না…।
ঢামেক হাসপাতালের নতুন ভবনে সুযোগ-সুবিধার বিষয়ে তিনি বলেন, এখানে সবচেয়ে বড় ডায়ালাইসিস সেন্টার, কার্ডিয়াক সেন্টার, কার্ডিও ভাসকুলার সেন্টার, বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেন্টার…। নতুন ভবন করোনার জন্য ডেডিকেটেড হলে এই রোগীদের শিফট করতে হবে আগে, কিন্তু এসব রোগীকে অন্য কোথাও নিয়ে গেলে সেটা কতটুকু কী হবে… এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।
কোভিড রোগীদের আনা হলে পুরো হাসপাতাল ঝুঁকিতে পড়বে, ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক হিসেবে এটা বলা যেতে পারে কিনা প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘এটা তো অবশ্যই বলেছি, তবে বিস্তারিত আপনাকে বলা যাবে না…।’
প্রসঙ্গত, গত মার্চে প্রথম স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটসহ চারটি হাসপাতাল করোনা চিকিৎসার জন্য প্রস্তুত করার বিষয়ে জানান। পরে সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে মন্ত্রণালয়। গত ১০ এপ্রিল ঢামেকের পুরাতন বার্ন ইউনিট কোভিড রোগীদের জন্য প্রস্তুত করার কথা জানায় মন্ত্রণালয়। পরে ১৬ এপ্রিল স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আরেকটি চিঠিতে বলা হয়, শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল এবং গাজীপুরের শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালকে করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড করেছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু সে সিদ্ধান্ত বদলে মঙ্গলবার মন্ত্রণালয় থেকে নতুন নির্দেশনা আসে। আর এ নিয়েই চলছে আলোচনা-সমালোচনা।