গত ১৪ এপ্রিল সকালে ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালে এক রোগী আসেন শ্বাসকষ্ট নিয়ে। তাকে ভর্তি করা হয় হাসপাতালে। কিন্তু সেদিন রাতে চিকিৎসকদের জিজ্ঞাসার মুখে তিনি জানান, তার ঠিক আগেরদিনই করোনা পজিটিভ বলে তাকে জানানো হয়েছে। অথচ এ হাসপাতালে ভর্তির সময় তিনি চিকিৎসকদের সে কথা জানাননি। পরে তাকে কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে পাঠানো হলেও শেষ রক্ষা হয়নি। বন্ধ করে দিতে হয়েছে ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালের একটি সিসিইউ (করোনারি কেয়ার ইউনিট), পরে লকডাউন করা হয় হাসপাতালের অর্গান ট্রান্সপ্ল্যান্ট ইউনিট। সে রোগীর সংস্পর্শে আসায় আটজন চিকিৎসক ইতোমধ্যে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, কোয়ারেন্টিনে আছেন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য স্বাস্থ্যকর্মীসহ ৯০ জন। ২২ এপ্রিল নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে আরও ১০ জন চিকিৎসকের, তাদের রিপোর্ট পাওয়া যাবে আজ বৃহস্পতিবার।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে রোগীর তথ্য গোপনের কারণে এখন পর্যন্ত এ হাসপাতালে করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন ২৩ জন চিকিৎসকসহ ৪১ স্বাস্থ্যকর্মী। একজন রোগীর তথ্য গোপন করার কারণে চিকিৎসকসহ অন্যরা সংক্রমিত হয়েছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে, জানিয়েছেন হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদ উন নবী।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন মানুষ করোনা পজিটিভ হওয়ার কারণে তাকে যে পরিমাণ হয়রানি, হেনস্তা, অমানবিকতা আর স্টিগমার ভেতর দিয়ে যেতে হয়, তাতে করে রোগী তথ্য গোপন করতে বাধ্য হয়। এর জন্য পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকেই বদল করতে হবে, নয়তো রোগী তথ্য গোপন করবেই।
প্রসঙ্গত, গত ২৩ মার্চ করোনাভাইরাসকে সংক্রামক ব্যাধির তালিকাভুক্ত করে সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে। মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব আবদুল ওহাব খান স্বাক্ষরিত এ প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নভেল করোনাভাইরাস বা কোভিড-১৯-কে সংক্রামক রোগ (প্রতিরোধ, নিয়ন্ত্রণ ও নির্মূল) আইন, ২০১৮-এর ধারা ৪(ভ)-তে বর্ণিত ক্ষমতাবলে সংক্রামক ব্যাধির তালিকাভুক্ত করা হলো। ওই আইনে সংক্রামক ব্যাধির কথা গোপন রাখার পর এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে রোগের বিস্তার ঘটলে ওই ব্যক্তিকে ছয় মাসের কারাদণ্ডে বা এক লাখ টাকা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রয়েছে।
বেশ কিছু হাসপাতালে রোগী তথ্য গোপন করছে, সেক্ষেত্রে সংক্রামক আইন প্রয়োগ করা সম্ভব কিনা জানতে চাইলে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ আসাদুজ্জামান খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘কোয়ারেন্টিন, বাড়ি লকডাউন, সামাজিক হেনস্তার শিকার, এসব কারণে মানুষ তথ্য গোপন করে মিথ্যা বলছে। করোনা আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসকের কাছে গেলে চিকিৎসা পাওয়া যাবে, কিন্তু গোপন রাখলে বিপদ বেশি, এটা বোঝাতে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। যত আইনই প্রয়োগ করা হোক না, মানুষ মিথ্যা বলবেই। এজন্য শুরু থেকে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত করা দরকার ছিল, যেটা করা হয়নি। তাই এখন প্রতিটি রোগীকে করোনা পজিটিভ ধরে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে, যেহেতু প্রতিটি জায়গাতে করোনো টেস্টের সুযোগ নেই।’
তিনি আরও বলেন, তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে যদি আইনের প্রয়োগ হয় তাহলে সেটা উদাহরণ হিসেবে থাকলেও মোটিভেশনাল ওয়ার্কে যেতে হবে প্রচুর।
এদিকে, কেউ যদি নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে হাসপাতালে বলেন তিনি নারায়ণগঞ্জ থেকে এসেছেন, তাহলে তিনি হাসপাতালে চিকিৎসা পাবে না–এটা তার ভয়, আর তার এই ভয় অপরাধ নয় মন্তব্য করে স্বাস্থ্য অধিদফতরের সাবেক পরিচালক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, ‘ম্যানেজমেন্টটাই এমনভাবে করতে হবে যেন মানুষ তথ্য গোপন না করে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে এমনভাবে সাজানো দরকার ছিল, যার যা সমস্যা তার সমাধান তারা পাবেন, তাহলে রোগী তথ্য গোপন করতেন না।’
তিনি আরও মনে করেন, স্বাস্থ্যসেবাকে এখন এমনভাবে সাজাতে হবে যেন যার যে চিকিৎসা দরকার সেটুকু তারা পান, যাতে করে তাকে মিথ্যা না বলতে হয়। তাই আগে যেসব ‘অপকর্মগুলো’ করা হয়েছে, সেখান থেকে অতিসত্ত্বর সরে আসতে হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, মানুষকে যদি সব চিকিৎসা না দেওয়া হয়, তাহলে মানুষ মিথ্যাই বলবে এবং কেউ কেউ শুধু সেবা না পাওয়ার কারণে মারা যাবে।
লাল পতাকা উড়িয়ে দেওয়া, বাড়ি লকডাউন করে দেওয়ার মতো কাজ করে আমরাই সমস্যার সৃষ্টি করছি মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সামাজিক দূরত্ব বা সোশ্যাল ডিসট্যান্সিং যে মানুষ মানছে না, সে দায়ও আমাদের। যারা ম্যানেজমেন্টে রয়েছেন তাদের কারণেই রোগী তথ্য গোপন করছে, সেখান থেকে আক্রান্ত হচ্ছেন চিকিৎসকসহ অন্যরা।’
‘রোগী তথ্য গোপন করছে–এটা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি ব্যর্থতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা মানুষকে বোঝাতে ব্যর্থ হয়েছে যে এটা কোনও স্টিগমা নয়, এটা অসুখ, এটা লুকানোর কিছু নেই, চিকিৎসা করালে সুস্থ হয় মানুষ। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এ বার্তা মানুষকে দিতে পারেনি, তারা ‘টোটালি ফেইল’ করেছে, যার কারণে মানুষ তথ্য লুকিয়ে হাসপাতালে আসছে, তাতে করে আক্রান্ত হচ্ছে চিকিৎসকসহ অন্যরা, বন্ধ হয়ে যাচ্ছে অনেক হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ সব বিভাগ। এতে করে অন্য রোগীরা ভোগান্তিতে পড়ছে, এভাবে চলতে থাকলে কোভিড আক্রান্ত রোগীর চেয়ে অন্য রোগের রোগীরা চিকিৎসা না পেয়ে মারা যাবে, এর পুরো দায় স্বাস্থ্য বিভাগের।’
মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী রশিদ উন নবী বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোগীদের তথ্য লুকানোর পেছনে অসচেতনতা দায়ী। করোনা বিষয়ে এ সচেতনতা তৈরি করতে আমরা ব্যর্থ হয়েছি। এর পেছনে দায়ী আরও অনেক কারণ।’ তিনি বলেন, বিভিন্ন প্রয়োজনে মানুষকে বাইরে থাকতে হয়, লকডাউন মানা হচ্ছে না ঠিকমতো, হাসপাতালে এসে সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকিও আছে।
ইব্রাহীম কার্ডিয়াক হাসপাতালের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং কার্ডিওলজি বিভাগের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক ডা. এম এ রশীদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে এখন পর্যন্ত চিকিৎসক, নার্স, পরিচ্ছন্নতাকর্মী, টেকনোলজিস্ট সব মিলিয়ে ৯০ জনের মতো কোয়ারেন্টিনে আছেন।’
রোগীরা তথ্য গোপন করে হাসপাতালে আসছে এর কারণ কী জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘তথ্য গোপন করার কারণ চিকিৎসা না পাওয়ার ভয়, ভোগান্তির ভয়। আর এটা হয়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে। এই বিষয়গুলো যদি রোগীদের শুরু থেকে আশ্বস্ত করা যেতো, সবার সামনে একটা প্রসিডিউর থাকতো–এই বিষয়গুলো যদি পরিষ্কার থাকতো তাহলে এতো ভোগান্তি হতো না।’
তিনি বলেন, ‘করোনা পরিস্থিতির প্রথমদিকে প্রস্তুতি ছিল না। হয়তো তারা বুঝতেও পারেনি কোনদিকে যাবে, কীভাবে কী হবে। অভিজ্ঞতারও ঘাটতি ছিল। সত্যিকার অর্থে সঠিক প্রস্তুতি না থাকার কারণেই রোগীরা তথ্য গোপন করছে, আর তাতে করে এ অবস্থার তৈরি হয়েছে।’
এ সম্পর্কে জানতে চাইলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক ( হাসপাতাল ও ক্লিনিক) ডা. আমিনুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘রোগীরা তথ্য না দিলে আমরা কী করতে পারি। এখন আমরা যেটা করছি, সবাইকে পিপিই (পার্সোনাল প্রটেকটিভ ইকুইপমেন্ট) পরে সবাইকে কোভিড আক্রান্ত ধরে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়ার জন্য বলেছি আমরা।’
তিনি রোগীদের তথ্য লুকানোর পেছনে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দুর্বলতা বা তাদের অপর্যাপ্ত পদক্ষেপ দায়ী এটা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ‘স্বাস্থ্য বিভাগ সীমিত সম্পদের মধ্যে থেকে যা করার সেটা করছে। এর বেশি আর কী করতে পারে?’