চিকিৎসকদের মনোবল ভাঙেনি, রয়েছে মানসিক চাপ ও ক্ষোভ

নিবিড়ভাবে রোগীদের সংস্পর্শে যাওয়ার কারণে করোনাভাইরাসে সংক্রমণের ঝুঁকি চিকিৎসকদের বেশি করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের মতো এ ধরনের পেন্ডেমিক (মহামারি) পরিস্থিতিতে কাজ করার পূর্ব অভিজ্ঞতা চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীদের ছিল না। তাই দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা একের পর এক আক্রান্ত হচ্ছেন। রয়েছেন ঝুঁকিতে। এটি যেহেতু একটি সংক্রামক ব্যাধি, তাই অন্যদের মতো তাদেরও একটি চাপ রয়েছে। মনের মধ্যে শঙ্কা নিয়ে পিপিই পরে এই কষ্টকর সময়ে ডিউটি করা, ওভারবার্ডেন হওয়ার চাপ মারাত্মক। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসকসহ অন্যদের মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার বিষয়টিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

ব্যক্তিগত সুরক্ষাহীনতা, বিভিন্ন ধরনের অব্যবস্থাপনা, নীতিনির্ধারকদের নানা চাপের সঙ্গে এ ধরনের ভয়ানক সংক্রামক অসুখে আক্রান্তদের সেবা করতে গিয়ে তারা মানসিক চাপে পড়ছেন। কারণ, তারা রোগীদের ক্লোজ কন্ট্যাক্টে যাচ্ছেন, তাই ঝুঁকিও তাদের বেশি। এ ধরনের কিছু কারণে চিকিৎসকসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের মানসিক চাপ বাড়ছে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘বার্ন আউট’। এ ধরনের পরিস্থিতিতে আবেগ-অনুভূতি এবং আচরণ যখন আক্রান্ত হয় তখন তাকে বার্ন আউট বলা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিশ্বজুড়েই চিকিৎসকদের এই বার্ন আউট নিয়ে ভাবা হচ্ছে। ব্রিটেন-ভারতের গাইডলাইনে এর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অথচ আমাদের দেশে এ বিষয়ে ভাবাই হয়নি।

যদিও দেরিতে হলেও গত ১৯ এপ্রিল দেশে করোনাভাইরাসের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় গঠিত হয় ১৭ সদস্যের জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটি। সে কমিটি অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি যেসব চিকিৎসক স্বাস্থ্যসেবা দিচ্ছেন তাদের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে কী প্রয়োজন এবং তাদেরসহ অন্যদের কীভাবে উৎসাহ দেওয়া যায় সে বিষয়েও পরামর্শ দেবে সরকারকে।

জাতীয় মানসিক মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. হেলাল উদ্দিন আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, কেবল কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক নিজ উদ্যোগে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সঙ্গে যোগাযোগ করে তার চিকিৎসকদের মানসিক উৎকর্ষের জন্য একটি সেশন করেছিলেন। এছাড়া প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দেশে কিছুই করা হয়নি, যদিও এতদিন পর এসে জাতীয় কোভিড-১৯ পরামর্শক কমিটিতে দুজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞকে রাখা হয়েছে।

করোনা টেস্টের জন্য উপচেপড়া ভিড়কোভিড ডেডিকেটেড-নন কোভিড হাসপাতালগুলোতে কাজ করা একাধিক চিকিৎসক বলছেন, তারা পেশার প্রতি মহৎ থাকতে চান, শপথ নিয়ে এ পেশাতে এসেছেন। কিন্তু পরিবারের মানুষরা সেটা করতে বাধ্য নন। পরিবারের প্রতি দায়িত্ববোধ এবং রোগীর প্রতি দায়িত্ববোধের সংমিশ্রণে তারা মানসিক দ্বন্দ্বে আটকে রয়েছেন। তারা বলছেন, তাদের মনোবল ভাঙেনি, তবে তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ এবং মনোকষ্ট রয়েছে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) নিয়ে যে প্রস্তুতি নেওয়ার কথা ছিল, সেটা নেওয়া হয়নি। পিপিই পরার প্রশিক্ষণ সব চিকিৎসক যথাযথভাবে পাননি। আর এ প্রশিক্ষণের অভাবেই অনেক চিকিৎসক আক্রান্ত হয়েছেন। এসব কারণে ক্ষোভ রয়েছে তাদের মধ্যে।

চিকিৎসকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টিতে শুরুতেই গুরুত্ব দেওয়া দরকার ছিল মন্তব্য করে জাতীয় কোভিড-১৯ পরামর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, ‘গত মার্চে কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ মন্ত্রণালয়ের জাতীয় কোভিড-১৯ প্রতিরোধ কমিটির প্রথম সভাতেই আমরা “অ্যাডভাইস” করেছিলাম এসব কার্যক্রম নেওয়ার জন্য। কিন্তু কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। চিকিৎসকদের প্রস্তুত করার দরকার ছিল।’

চিকিৎসকদের মানসিকভাবে উৎফুল্ল রাখাতো হয়ইনি, বরং বারবার তাদের ‘মোরালিটি’তে আঘাত এসেছে বলে মন্তব্য করেন চিকিৎসকদের নিরাপত্তা এবং অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন ফাউন্ডেশন ফর ডক্টরস সেফটি রাইটস অ্যান্ড রেসপন্সিবিলিটিসের (এফডিএসআর) যুগ্ম সম্পাদক ডা. রাহাত আনোয়ার চৌধুরী। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যেসব চিকিৎসকের কো-মরবিডিটি রয়েছে, যাদের সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি বেশি, যেসব চিকিৎসক ব্রেস্ট ফিডিং মা, তাদের পৃথক করার দরকার ছিল। ওয়ার্ক ফোর্সটাকে ভাগ করে ফ্রন্টলাইনে কারা সেবা দেবেন, কারা মিডলাইনে থাকবেন এবং কারা ব্যাকআপ হিসেবে থাকবেন– এ বিষয়টি নীতিনির্ধারকদের ভাবনাতেই আসেনি।’

‘চিকিৎসকরা যখন দেখছেন, পিপিই পরে সেবা দেওয়ার পরও একের পর এক চিকিৎসক আক্রান্ত হচ্ছেন– তখন সেই পিপিই নিয়েই সন্দেহ তৈরি হচ্ছে। পিপিই সঠিকভাবে পরা এবং কাজ শেষে খুলে রাখার প্রশিক্ষণও চিকিৎসকদের দেওয়া হয়নি। তাদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করা হয়নি। অথচ গত তিন মাস ধরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর প্রস্তুত রয়েছে বলে এসেছে। কিন্তু চিকিৎসকদের মানসিকভাবে ‘বুস্ট আপ’ কিংবা ‘চিয়ার আপ’ করার মতো কোনও পদক্ষেপ এখনও নেওয়া হয়নি। এই দুর্যোগ মোকাবিলায় মানসিকভাবে প্রস্তুত করার কাজটি এখনও করেনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বা অধিদফতর’- বলেন ডা. রাহাত আনোয়ার চৌধুরী।