ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে লন্ডন থেকে আসামিদের আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি। অন্যদিকে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। থাইল্যান্ডে অবস্থানকারী আসামিরা শুনানিতে যোগ দেননি।
আইনজীবী আজমালুল হোসেন কিউসি শুনানির শুরুতে বলেন, ‘আসামিরা বিদেশে অবস্থান করছেন। তারা সেখানে বসেই আগাম জামিন চেয়ে আবেদন জানিয়েছেন। তবে আসামিরা কোথায় কীভাবে আত্মসমর্পণ করবেন সে বিষয়ে আপনারা শর্ত দিয়ে দিতে পারেন। ভার্চুয়াল কোর্ট আইনে ৪ নম্বর ধারায় বিচার পদ্ধতিগত বিষয় বিবেচনায় নিয়ে তারা জামিন চাইছেন।’
অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, করোনা পরিস্থিতিতে শুরুর দিকে ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে আত্মসমর্পণের সুযোগ ছিল না। কিন্তু এখন আছে। কাজেই তারা নিচের কোর্টে গিয়ে উপস্থিত হয়ে (সশরীরে আত্মসমর্পণ করে) জামিন চাইতে পারেন।
অ্যাটর্নি জেনারেল আরও বলেন, ‘কোর্টের মাহাত্ম ও ভাবমূর্তি যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয় আমাকে সবসময় সেভাবেই শুনানি করতে হয়। আজ এত এত আইনজীবী আগাম জামিনের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন, কিন্তু তারা পারলেন না। কিন্তু একজন অত্যধিক বিত্তশালী, ক্ষমতাশালী তিনি যদি এই কোর্ট থেকে জামিন পেয়ে যান তাহলে সমাজে কী সিগন্যাল যাবে? এজন্যই কিন্তু কোর্টের সঙ্গে আজ সাংবাদিকরা যুক্ত হয়েছেন।’
জবাবে আদালত বলেন, ‘আমি এজন্যই ইচ্ছাকৃতভাবে মামলাটি শুনানির জন্য অন্তর্ভুক্ত করেছি। এ মামলার মধ্য দিয়ে আইনজীবীরা দেখুক, একজন অর্থশালী ব্যক্তি কত শক্তিশালী হতে পারে। তারা (আসামিরা) বাংলাদেশের সেরা সেরা আইনজীবীদের নিজেদের পক্ষে দাঁড় করাতে পারে। সাংবাদিকরাও দেখুক। আজ সংবাদপত্রে কী লেখা হচ্ছে? সাধারণ মানুষ কী সিগন্যাল পাচ্ছে? সাধারণ মানুষ পত্রিকা পড়ে জানবে, আগাম জামিন দেশে বসেই হয় না। কিন্তু বিদেশ থেকে বসে তাদের আবেদন আদালত শুনতে পারে! সাধারণ মানুষদের এমন প্রশ্নের জবাব তো আমাদেরই দিতে হবে। কারণ, আমাদের প্রতিটি আইনজীবীসহ সবার দায়িত্ব আদালতের সম্মান, ভাবমূর্তি রক্ষা করা। এটা শুধু আদালতের একার দায়িত্ব না। আইনজীবী, বিচারক, অ্যাটর্নি জেনারেল মিলেই আদালত। তাই সবাই মিলেই যদি জনগণকে দেখাতে পারি যে, এখান থেকে এমন কোনও কিছু হচ্ছে না, যার দ্বারা বিত্তশালীরা বিশেষ সুবিধা পায়, আর সাধারণ মানুষরা বিশেষ সুবিধা পায় না। এজন্যই মামলাটা আজ শুনানির জন্য রেখেছি।‘
আদালত আরও বলেন, ‘সত্যি বলতে জনমতটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আমরা আজ কোথায় এসে ঠেকেছি যে এই একটি মামলার শুনানি হচ্ছে, আর সবাই তাকিয়ে আছে। কেন তাকিয়ে আছে? সবার তো ভাবনা, আশঙ্কা যে, অমুকে অমুকে যখন দাঁড়িয়েছে (আইনজীবী), অমুক অমুক যখন হয়েছে তাহলে তমুক তমুকই হইবে (আদালতের আদেশ)। আমাদের ভাবতে হবে, আমরা কেন সেই ধরনের মামলা, যেটা জনমত ও আইন, নীতি-নৈতিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, কেন আদালতে নিয়ে আসবে। আমরা সবাই আদালত থেকে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থানের ব্যবস্থা করি। এটা আমাদের সবার আদালত। এই আদালতকে কীভাবে আমরা পূতপবিত্র রেখে মানুষের সেবা দেওয়া যায় তা দেখবো। বিতর্কিত করা আমাদের কাজ না, আমরা যখন একটা মামলা নিয়ে আসবো।’
আদালত বলেন, ‘যদি বাংলাদেশের কোনও প্রফেসর বা জ্ঞানতাপসের জন্য এই সবাই (আইনজীবীরা) এসে দাঁড়াতো, কোনও মিডিয়া, ব্যক্তি বা আইনজীবী টুঁ-শব্দ করতো না। বরং বলতো, ভালোই হয়েছে, তারা ভালো কাজই করেছেন। কিন্তু যখন মিডিয়া, সাধারণ আইনজীবীরা দেখে, যারা একটু বিতর্কিত মানুষ হয়ে যায়, যেভাবেই হোক, তখন সেটা নিয়ে মানুষের মনে প্রশ্ন হয়। উনাদের (বিতর্কিত মানুষ) কেন আমাদের সেরা সেরা আইনজীবীরা নিয়ে আসবেন? তখন মানুষের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে। এটার উদ্দেশ্য হলো এই- আমরা কোন মামলা আনবো আর কোন মামলা আনবো না। কারণ, এটা আমাদের আদালত। আমাদের আদালতও অনেকের চাপে পড়ে অনেক কিছু করে ফেলে। তাতে যা হচ্ছে, এই প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে মানুষের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হচ্ছে। কেন আজ সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এ কথা আসবে? কারণ, কিছু না কিছু আমরা করি তো। আমরা এমন কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে ফেলেছি।’
এরপর আদালত তার আদেশে বলেন, ‘আবেদনকারীদের আবেদন পর্যালোচনা এবং আইনজীবীদের মতামতের ওপর শুনানি নিয়ে এটি কাচের মতো স্পষ্ট যে, এই মামলাটি আইনের বিধিবিধান ও এখতিয়ারবহির্ভূতভাবে এই আদালতে দাখিল করা হয়েছে। আবেদনকারীদ্বয় ও বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ আইনজীবীগণ বিধিবহির্ভূতভাবে এই আবেদন আদালতে দাখিল করেছেন। এর দ্বারা আবেদনকারীদের সক্ষমতা অনুমেয়। আইন-আদালতকে সংবিধান ও আইনের বিপরীতে চালানোর প্রচেষ্টা সুস্পষ্ট। কিন্তু জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের এই আবেদন করে এর পক্ষে শুনানি করা যেমনই আইন পরিপন্থী, তেমনি নৈতিকতা পরিপন্থী। বাংলাদেশের আইনের সব ছাত্র, শিক্ষক, অ্যাডভোকেট, বিচারক এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সাধারণ মানুষদের আমি আহ্বান জানাবো, আপনারা এই মামলা দাখিল এবং এর পক্ষে দাঁড়ানো অ্যাডভোকেটগণের আইন ও নৈতিকতার যুক্তি চুলচেরা বিশ্লেষণ করবেন। আইন ও নৈতিকতা হলো- এমনতর বেআইনি ও নৈতিকতাহীন মামলা গ্রহণ না করাই ছিল এই আইনজীবীগণের দায়িত্ব। সেই আলোকে এই আবেদনকারীদের বেআইনি এই আবেদন জরিমানাসহ নিষ্পত্তি করা হলো।’
জরিমানার আদেশে আদালত বলেন, ‘আবেদনকারীরা বেআইনি আবেদন করা ও আবেদনের পক্ষে আইনজীবীদের জোর করে শুনানিতে হাজির করার জন্য তাদের (আবেদনকারীদের) ১০ হাজার পিপিই জরিমানা করা হলো। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এগুলো প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হলো। কারণ, তারা আদালতের সময় নষ্ট করেছে, জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের বাধ্য করেছে শুনানিতে নিয়ে আসতে। তাই এসব সাজা প্রদান করা হলো। আর এই পিপিই দাখিল আদেশ পালন করে বিষয়টি আবেদন আকারে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলকে জানাতে হবে। কিন্তু তারা পিপিই না দিলে তাদের বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা দায়ের করা হবে।’
প্রসঙ্গত, এর আগে বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে নির্যাতন ও গুলি করে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে সিকদার গ্রুপ অব কোম্পানিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদারের বিরুদ্ধে রাজধানীর গুলশান থানায় গত ১৯ মে মামলা করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
মামলার বিবরণীতে বলা হয়েছে, গত ৭ মে রন ও দিপু এক্সিম ব্যাংকের এমডি মুহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ও অতিরিক্ত এমডি মুহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে একটি অ্যাপার্টমেন্টে বন্দি করে রাখে। তাদের গুলি করে হত্যা করার চেষ্টাও করা হয়।
এদিকে ঘটনার পর থেকেই রন হক ও দিপু হক পলাতক ছিলেন। পরে নিজেদের চার্টার্ড বিমানে তারা থাইল্যান্ডে পাড়ি জমান। সেখান থেকেই তারা আগাম জামিন চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন জানান।
প্রসঙ্গত, করোনা পরিস্থিতিতে নিয়মিত আদালত না খোলায় হাইকোর্টে আগাম জামিনের আবেদন দাখিল ও এর শুনানি বন্ধ রয়েছে। কেননা, আগাম জামিনের ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করেই আসামিকে জামিন চাইতে হয়। কিন্তু হাইকোর্টে ভার্চুয়ালি মামলা পরিচালিত হওয়ায় আগাম জামিনের সুযোগ এখনও বন্ধ রয়েছে। এদিকে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের নির্দেশনায় নিম্ন আদালত আত্মসমর্পণ করে জামিন চাওয়ার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে।
আরও পড়ুন-
সিকদার গ্রুপের দুই ভাইয়ের ‘ভার্চুয়াল আত্মসমর্পণ’ আবেদন, পিপিই জরিমানা
অনুমতি নিয়েই জেট বিমানে দেশ ছাড়েন সিকদার গ্রুপের দুই ভাই
থাইল্যান্ড থেকে সিকদার গ্রুপের দুই সহোদরের আগাম জামিনের আবেদন
এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, যা বলছে উভয়পক্ষ
শিকদার গ্রুপের দুই সহোদরের বিরুদ্ধে মামলা