এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ, যা বলছে উভয়পক্ষ

Send
আমানুর রহমান রনি
প্রকাশিত : ২২:৪৭, মে ২৮, ২০২০ | সর্বশেষ আপডেট : ২৩:১১, মে ২৮, ২০২০

এক্সিম ব্যাংকএক্সপোর্ট ইমপোর্ট ব্যাংক অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (এক্সিম)দুই কর্মকর্তাকে গুলি করে হত্যাচেষ্টার ঘটনায় পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিয়েছে উভয়পক্ষ। মূলত পারিবারিক সম্পর্কের অধিকার খাটিয়ে আইনকে উপেক্ষা করে উভয়পক্ষের মধ্যে ব্যাংকিং ও ব্যবসায়ীক সুবিধা নেওয়ার দীর্ঘদিনের চর্চার শিকার হয়েছে বেসরকারি ব্যাংকটির দুই কর্মকর্তা। ঋণের বিপরীতে উপযুক্ত জামানত না দেওয়ার রেওয়াজ এই দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকে রয়েছে। সিকদার গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যাংককে উপযুক্ত জামানত না দিয়ে এক্সিম ব্যাংকের একাধিক পরিচালক এর আগে মোটা অংকের ঋণ সুবিধা নিয়েছেন। এক্সিম ব্যাংকের মামলার প্রতিবাদ করতে গিয়ে সিকদার গ্রুপ এক বিবৃতিতে বিষয়টি স্বীকার করেছে। বুধবার (২৭ মে) বিকালে উভয়পক্ষের বক্তব্যে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

গত ১৯ মে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গুলশান থানায় সিকদার গ্রুপের পরিচালকের বিরুদ্ধে এক্সিম ব্যাংকের পরিচালক লে. কর্নেল (অব.) সিরাজুল ইসলাম হত্যাচেষ্টা মামলা করেন। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন এক্সিম ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ হায়দার আলী মিয়া ও অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এএমডি) মোহাম্মদ ফিরোজ হোসেনকে গুলি করে হত্যার চেষ্টা করেন সিকদার গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রন হক সিকদার ও তার ভাই দিপু হক সিকদার।

মামলায় যে অভিযোগ করেছে এক্সিম ব্যাংক

মামলার বাদী লে. কর্নেল (অব.) সিরাজুল ইসলাম এজাহারে উল্লেখ করেন, সিকদার গ্রুপের এমডি রন হক সিকদার (৫০) এক্সিম ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব করেন। গত ৭ মে আনুমানিক দুপুর ১২টার দিকে আসামি রন হক সিকদার ও ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি)এএফএম শরিফুল ইসলাম গুলশানের এক্সিম ব্যাংক শাখায় যান। তারা এক্সিম ব্যাংকের গুলশান শাখা থেকে ব্যাংকটির এমডি হায়দার আলী খান ও এএমডি ফিরোজ হোসেনকে কৌশলে প্রস্তাবিত ঋণের টাকার বিপরীতে কোলেটারেল হিসাবে সিকদার গ্রুপের রূপগঞ্জ কাঞ্চনস্থ আদি নওয়াব আসকারী জুটমিলটি পরিদর্শনের জন্য নিয়ে যান। দুপুর আনুমানিক ১২টায় সিকদার গ্রুপের রূপগঞ্জের প্রস্তাবিত প্রকল্প আদি নওয়াব আসকারী জুটমিলের জায়গাটি পরিদর্শন করেন  এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা। পরিদর্শনকালে সিকদার গ্রুপের প্রস্তাবিত ঋণের (৫০০ কোটি টাকা) বিপরীতে এই সম্পত্তির বন্ধকীমূল্যের বিশাল ব্যবধান রয়েছে বলে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও এএমডি মন্তব্য করেন। তদের মতের সঙ্গে রন হক সিকদার দ্বিমত হন। পরবর্তীতে এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে রন হক সিকদার তাদের পূর্বাচলের প্রকল্প স্যাটেলাইট সিটিতে আইকন টাওয়ারের জায়গাটি পরিদর্শনের জন্য অনুরোধ করেন। ওই দিন বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে এক্সিম ব্যাংকের জরুরি একটি বৈঠক থাকায় এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা প্রথমে সেখানে যেতে রাজি হননি। তারপরও রন হকের বিশেষ অনুরোধে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও এএমডি পূর্বাচলে যান। তারা বাইরে থেকে জায়গাটি দেখেন। রন হক সিকদার প্রকল্পের ভেতরে ঢুকে সম্পূর্ণ জায়গাটি দেখতে বলেন। সময়ের স্বল্পতার কারণে এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তারা প্রকল্পের ভেতরে যেতে অনীহা প্রকাশ করেন। তবুও সামাজিকতার খাতিরে রন হক সিকদারের অনুরোধ রাখতে ভেতরে যান। কিন্তু রাস্তা অপরিচিত হওয়ায় এবং সেখানে রন হক সিকদার এবং ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডির গাড়ি দেখতে না পেয়ে এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তারা ঢাকার দিকে রওয়ানা হয়ে ৩০০ ফিট রাস্তায় ওঠেন। এসময় তারা দেখতে পান ঢাকামুখী সড়কের পাশে রন হক সিকদার ও এনবিএল’র এমডি গাড়িতে বসে আছেন। তাদের গাড়ি দেখতে পেয়ে এক্সিম ব্যাংকের দুই কর্মকর্তা গাড়ি থামান। এসময় এনবিএল’র এমডি গাড়ি থেকে নেমে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও এএমডিকে বলেন, ‘তারা প্রকল্পের ভেতরে  না যাওয়ায় রন হক অত্যন্ত মর্মাহত ও ক্ষুব্ধ হয়েছেন।’ এরপর রন হক সিকদার এই ঘটনার জন্য এক্সিম ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মাফ চাইতে বাধ্য করেন। রন হক সিকদার গাড়ির ভেতরে বসা অবস্থায় গ্লাস নামিয়ে তার পিস্তল বের করে হত্যার উদ্দেশে এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে গুলি করে। যা এমডি’র বাম কানের পাশ দিয়ে চলে যায়। এমডি হতভম্ব হয়ে ঘটনাস্থলে দাঁড়িয়ে থাকেন, পুনরায় রন হক এমডিকে গুলি করার উদ্যত হলে তিনি দৌড়ে গাড়ির পেছনে গিয়ে নিজেকে রক্ষা করেন। এরপর রন হক এক্সিম ব্যাংকের এমডি’র মোবাইল ফোন কেড়ে নেন, তাকে জোরপূর্বক নিজের গাড়িতে ওঠান। এক্সিম ব্যাংকের এমএমডিকে ন্যাশনাল ব্যাংকের এমডি’র গাড়িতে ওঠান।

অভিযোগে আর বলা হয়, রন হক সিকদার ৩০০ ফিট থেকে এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও এএমডিকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে অপহরণ করে বনানী সিকদার হাউজিংয়ে নিয়ে যান। এক্সিম ব্যাংকের এমডিকে বাড়ির তৃতীয় তলায় নিয়ে যান রন হক সিকদার। সেখানে সিকদার গ্রুপের জমি ও সম্পত্তির কাগজপত্র দেখতে বাধ্য করেন। অন্যদিকে এক্সিম ব্যাংকের এএমডিকে বাড়ির ষষ্ঠ তলায় নিয়ে যাওয়া হয়। এসময় রন হক সিকদার এএমডিকে বলেন, ‘প্রতি কাঠার জমির দাম আড়াই কোটি টাকা, আর তুই কেন বললি প্রতি বিঘার দাম আড়াই কোটি টাকা? এখনই তোকে শেষ করে ফেলবো।’ দিপু হক সিকদার এসময় এএমডিকে মারার জন্য উদ্যত হয়। এএমডি দুই ভাইয়ের কাছে মাফ চেয়ে প্রাণে বেঁচে যায়। এরপর দিপু হক সিকদার এমডিকে মারার জন্য নীচের তলার দিকে যায়। তখন এএমডি তার কাছে এমডির প্রাণ ভিক্ষা চেয়েও মাফ চান এবং তাকে না মারার জন্য অনুরোধ করেন। এরপর এএমডি ও এমডির দুপাশে দুজন বিদেশি নিরাপত্তকর্মী পাহারায় বসিয়ে রাখা হয়। সেখানে রন হক সিকদার ও দিপু হক সিকদার তাদের প্রজেক্টের সবকিছু সঠিক আছে বলে ব্যক্ত করে তাদের অস্ত্র দেখিয়ে জোরপূর্বক একটি সাদা কাগজে এমডি’র স্বাক্ষর নেয়। ওই কাগজে সাক্ষী হিসেবে এএমডি’রও স্বাক্ষর নেয়। স্বাক্ষর না করলে বিদেশি নিরাপত্তাকর্মীদের দিয়ে টর্চার সেলে নিয়ে টর্চার করা হবে বলেও হুমকি প্রদান করা হয়।

ওইদিন বিকাল ৫ টা ৩০ মিনিটে দিপু হক সিকদারের নির্দেশে এই দুই ব্যাংক কর্মকর্তাকে তাদের বাবা জয়নাল হক সিকদারের কাছে নিয়ে যায় এবং সেখানে ফটোসেশন করা হয়। এক্সিম ব্যাংকের এমডি, এএমডি ও দুজন গাড়ি চালককে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে রন হক সিকদার দুই ব্যাংক কর্মকর্তার ও ড্রাইভারদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া মোবাইল ফোন ফেরত দেন এবং তাদের ছেড়ে দেন।

সিকদার গ্রুপের বক্তব্য

এক্সিম ব্যাংকের দায়ের করা মামলার বিষয়ে বুধবার (২৭ মে) বিকালে প্রতিবাদ জানিয়েছে সিকদার গ্রুপ। গ্রুপের অন্যতম প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ব্যাংক লিমিটেডের একটি প্যাডে গ্রুপটির এমডি রন হক সিকদার ও পরিচালক দিপু হক সিকদারের বিরুদ্ধে এক্সিম ব্যাংকের মামলাকে মিথ্যা ও বানোয়াট বলে আইনজীবী আব্দুল বাছেত মজুমদার একটি প্রতিবাদ দিয়েছেন। প্রতিবাদপত্রে তিনি দাবি করেছেন, ‘এক্সিম ব্যাংকের জনৈক পরিচালক ব্যবসা প্রসারের জন্য ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রকার ঋণ সুবিধা নিয়েছে, এমনকি জনৈক পরিচালক তার কন্যার নামেও ঋণ সু্বিধা নিয়েছেন। জনৈক পরিচালক বেনামে ঋণ সুবিধা গ্রহণের জন্য প্রস্তাবও দিয়েছিল। গুলশান থানার মামলার বাদী এক্সিম ব্যাংকের পরিচালক সিরাজুল ইসলাম নিজেও ন্যাশনাল ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেছেন। তারা এসব ঋণ নেওয়ার সময় উপযুক্ত জামানত ছাড়াই ঋণ পেয়েছে। বর্তমান করোনা পরিস্থিতিতে এক্সিম ব্যাংকের জনৈক পরিচালক ও তার স্বার্থ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান বিপুল অংকের ঋণ সুবিধার জন্য ন্যাশনাল ব্যাংকে আবেদন করে। তিনি গত ১৩ মে ৫ কোটি টাকা ঋণ সুবিধা গ্রহণ করেন।

তিনি আরও বলেন, ‘গত ৭ মে দুপুর ১২ টা থেকে  সন্ধ্যা ৭ টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ঘটনার বিবরণ দেখিয়ে কর্নেল (অব) সিরাজুল ইসলাম মামলা দায়ের করেন। ওই মামলায় রন হক সিকদারের বিরুদ্ধে এক্সিম ব্যাংক থেকে ৫০০ কোটি টাকার ঋণ নেওয়ার প্রস্তাব অভিযোগ করা হয়। রন হক সিকদার এরকম কোনও ঋণের  আবেদন করেনি। এরকম কোনও আবেদন মামলার বাদী কোনভাবেই দেখাতে পারবে না। অভিযোগ পরবর্তী ৭ মে রন হক সিকদার ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা উল্লেখিত ৭ মে এক্সিম ব্যাংকের গুলশান এভিনিউ শাখায় যায়নি।। তাই ঋণ এবং এই সংক্রান্ত জামানত নিয়ে দরকষাকষির কোনও সুযোগ আসতে পারে না। এই মামলার বাদী উল্লেখিত ঘটনার সাক্ষী না। এক্সিম ব্যাংকের এমডি ও এএমডির সঙ্গে আলোচনা না করে ঘটনার ১২ দিন পর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা দায়ের করেন। যা ন্যায় বিচারের পরিপন্থী এবং মামলাটি শুধু আমার মক্কেলকে সামাজিকভাবে হেয় করার জন্য দায়ের করা হয়।’

মামলার বাদীর বক্তব্য

বেসরকারি এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার এবং সিকদার গ্রুপের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদারের মধ্যে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে বলে জানিয়েছেন মামলার বাদি লে. কর্নেল (অব.) সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘তাদের মধ্যে পারিবারিক সম্পর্ক। সিকদার গ্রুপ বিভিন্ন সময় মৌখিকভাবে ঋণ চেয়েছিল। তবে চেয়ারম্যান তো একার সিদ্ধান্তে লোন দিতে পারে না। বোর্ডের কোরামে পাশ হতে হবে। তারা ব্যাংক থেকে দুই কর্মকর্তাকে প্রজেক্ট দেখাতে নিয়ে গেল, যখন সম্পত্তির সম্ভাব্য মূল্য আমাদের কর্মকর্তারা বলল, তখনই তাদের অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করা হলো। গালিগালাজ করা হলো। সিকাদর গ্রুপের দুভাই আমাদের ব্যাংকের দুজন কর্মকর্তাকে যেভাবে হুমকি দিয়েছে, তাতে দুই কর্মকর্তাই ভয় পেয়ে যায়। তারা অফিস করা বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে আমাদের বোর্ডের সভায় সিদ্ধান্ত হয় মামলা করার। সবাই আমাকে বলল, আমি তারপর মামলা করেছি। আমি মিডিয়া হয়ে কাজ করেছি। আর কিছু না।’

মামলার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এমনও হতে পারে মামলা আবার কোনও এক বোর্ড সভায় প্রত্যাহার করাও হতে পারে। এটা ব্যাংকের ব্যাপার।’

পুলিশের বক্তব্য

গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামরুজ্জামান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা তদন্ত করছি। তদন্ত শেষে এ বিষয়ে মন্তব্য করা যাবে।’

 

/এআরআর/ এমআর/এফএএন/

লাইভ

টপ