করোনাকালে সবুজ আঁকড়ে বাঁচা




ছাদ বাগান

শুধু শৌখিনতা নয়, প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে এখন মানুষের বাসার বারান্দা ভরে উঠছে সবুজে। এর আগে, ইট-কাঠ-পাথরের রাজধানীতে ব্যস্ত মানুষ গাছ কেটেছে নির্বিচারে। সবুজও যে দরকার, তা মাথায় আসেনি। করোনায় ঘরবন্দি হওয়ার পরে চারপাশে যখন অক্সিজেনের হাহাকার, তখন মনে হয়েছে সবুজের প্রয়োজন। সামর্থ্য অনুযায়ী বাসার বারান্দায় ও ছাদে গাছ লাগিয়ে এতোদিনের শূন্যতা পূরণের চেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো। ছাদ বাগান ও বারান্দা বাগান করেছেন যারা, তারা বলছেন, এক চিলতে জায়গা ছিল কিন্তু চোখের আরামের জন্যও যে সবুজ দরকারি সেটা ভাবার সময় ছিল না। করোনাকালে প্রয়োজন আর অবসর দুটোই মিলে যাওয়ায় চেষ্টা করেছেন সবুজে ভরে ফেলতে।


নার্সারি মালিকরা বলছেন, অনলাইন আর অফলাইনে সমান হারে গাছ ও গাছ লাগানোর অনুসঙ্গ বিক্রি করেছেন।

মনো চিকিৎসকরা বলছেন, বাসযোগ্য শহরের জন্য সবুজ খুব জরুরি। যখন কিনা মহামারি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যেতে হচ্ছে, তখন একটি গাছকে নিজ হাতে প্রস্তুত করার মধ্য দিয়ে মানসিক প্রশান্তি তৈরি হয়।

গত ১৫ জুন দলের নেতাকর্মীসহ দেশবাসী সবাইকে অন্তত তিনটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ একটা বদ্বীপ। এই বদ্বীপে টিকে থাকা এবং উন্নতি করা খুবই কঠিন একটা কাজ। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হয়। বদ্বীপকে বাঁচাতে হলে ব্যাপকহারে বৃক্ষরোপণ প্রয়োজন।’ এজন্য দেশের প্রতিটি এলাকায় বৃক্ষরোপণ করে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

বারান্দায় লাগানো গাছ

এদিকে করোনাকালে ব্যক্তি উদ্যোগে বাসায় গাছ লাগানোর প্রবণতা বাড়তে দেখা গেছে। বারান্দার বাগান ছাড়িয়ে ফারজানা খান গাছ লাগানো শুরু করেছেন ছাদেও। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'করোনার কারণে এখন ঘর থেকে বের হওয়া মানা। তাই অনেক অবসর। আমি অনেক আগে থেকেই বাগান করি। এসময় আরও বেড়েছে বাগানের পরিধি।' গাছ মানসিক প্রশান্তি এনে দেয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'চারপাশে কেবল দালান আর দালান। তারওপর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। ঘরে যদি এক টুকরো বাগান থাকে তাহলে মনটা বিষন্ন হয় না। গাছের অনেক ক্ষমতা।'

আগারগাঁওয়ের নার্সারির মালিক আবুল মোমেন বলেন, 'মার্চের পর কিছুদিন বন্ধ থাকলেও পরে ধীরে ধীরে নার্সারি খোলা হয় এবং অনলাইনে কিছু অর্ডারের কাজও ছিল। এসময় মানুষ তার বারান্দায়, বাসার খোলা অংশে গাছ লাগিয়েছে অনেক। এসময় দ্বিগুণের বেশি চারা বিক্রি হয়েছে। বেশিরভাগই পাতাবাহার আর ফুলের গাছ। রান্নায় প্রতিনিয়ত ব্যবহার হয় এমন জিনিষের মধ্যে কাঁচামচির, লেমনগ্রাস, ধনেপাতা, লেটুস এসব গাছ লাগিয়েছে বেশি। এমন অনেকে এসেছেন যারা আসলে বাগান করার বিষয়ে তেমন জানেনও না, এবারই প্রথম করছেন।'

বারান্দায় লাগানো গাছ

করোনার সময়ে বাসার ছাদে সবজি চাষ, শিশুদের জন্য গাছ লাগানো, কৃষিতে বপনের কাজ শেখানোসহ নানা উদ্যোগ নেন মাহবুব সুমন। তিনি বলেন, 'করোনাকাল মানুষকে এক নতুন উপলব্ধি, নতুন সত্যের মুখোমুখি করে দিয়েছে। তা হলো, যে জীবন আমরা যাপন করছিলাম সেটা প্রকৃতিকে ব্যথা দিয়ে বেঁচে থাকা। চলতি সময়গুলোতে নিভৃত চিন্তার সুযোগে মস্তিষ্ক আবার প্রকৃতি প্রেমিক হয়ে উঠেছে। প্রত্যেকের ভেতর একটা তাড়না কাজ করছে যে পরিবেশের জন্য একটা কিছু করতে হবে। সেই চিন্তার ফলেই মানুষ প্রচুর গাছ লাগাচ্ছে। করোনার কারণে গাছ লাগানো দিয়ে যা শুরু হলো, তা সামনে আরও অনেক ভালো কাজের বীজ বপন করে যাচ্ছে।'

সবুজের মধ্যে মানুষের মন বাঁচে উল্লেখ করে মনোচিকিৎসক তাজুল ইসলাম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, 'গাছ লাগানো কেবল একটা টবে গাছটা লাগিয়ে ফেলা না, প্রতিনিয়ত যত্ন ও বড় করে তোলার মধ্য দিয়ে তার সঙ্গে মানসিক সম্পৃক্ততা তৈরি হয়। এতে ব্যক্তি প্রকৃতিকে ভালবাসতে শেখে। করোনায় ঘরে বন্দি শিশুদের জন্য বারান্দা করা খুব কাজের হতে পারে। তারা আনন্দ নিয়ে ওই জায়গাটায় যাবে, সারাদিন ঘরে বসে থাকলে তার যে বিষন্নতা সেটা গাছের প্রতিদিনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে কেটে  যাবে।'