রমজান মাস শুরু হওয়ার পর গত ২৮ এপ্রিল থেকে ইফতারি প্রস্তুত ও বিক্রির অনুমতি দেয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ। তবে শর্ত ছিল কেউ ফুটপাতে কোনও ধরনের ইফতারির পসরা বসিয়ে প্রদর্শন ও কেনাবেচা করতে পারবে না এবং রেস্টুরেন্ট বা রেস্তোরাঁয় বসে ইফতার খেতে পারবেন না। এরপর ঈদ উল ফিতরের আগে গত ১০ মে থেকে সীমিত আকারে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শপিং মল চালু করার অনুমতি দেয় সরকার।
গত ৭ মে দেশের বিদ্যমান করোনা পরিস্থিতিতে কোভিড-১৯ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ক্রমান্বয়ে চালু করার সুবিধার্থে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান,স্থাপনা ও পেশার জন্য একটি কারিগরি নির্দেশনা তৈরি করেছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে তৈরি করা এই গাইডলাইনে ৪৭টি ক্যাটাগরিতে আলাদা নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রেস্তোরাঁর ক্ষেত্রে বলা হয়েছে— খোলার আগে মহামারিবিরোধী সামগ্রী যেমন মাস্ক, জীবাণুমুক্তকরণ সামগ্রী ইত্যাদি সংগ্রহ করুন। আপদকালীন পরিকল্পনা তৈরি করুন। আপদকালীন সংক্রমিত বস্তুর ডিসপোজাল এলাকা স্থাপন করুন। সব ইউনিটের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করুন এবং কর্মীদের প্রশিক্ষণ জোরদার করুন। কর্মীদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করুন। প্রতিদিন কর্মীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক অবস্থা নথিভুক্ত করুন এবং যারা অসুস্থতা অনুভব করবেন, তাদের সঠিক সময়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। রেস্তোরাঁর প্রবেশ পথে তাপমাত্রা পর্যবেক্ষণের সরঞ্জাম স্থাপন করতে হবে এবং কেবলমাত্র সাধারণ তাপমাত্রার ব্যক্তিদেরই প্রবেশ করতে দিতে হবে।
এতে আরও বলা হয়, বড় আকারের ভোজন সমাবেশ নিষিদ্ধ থাকবে। রিজার্ভেশন ব্যবস্থার মাধ্যমে আগত অতিথিদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। টেবিল ও চেয়ারের সংখ্যা হ্রাস করতে হবে। গ্রাহকদের প্রত্যেকের এক টেবিল অন্তর খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। ভিন্ন ভিন্ন খাবার (স্বতন্ত্র খাবারের পরিবেশনা) পরিবেশন করতে হবে। রেস্তোরাঁগুলোতে চপস্টিকস, এক চামচ ব্যবহারের ব্যবস্থা করতে হবে। প্রতিবার পরিবেশন করার পরে টেবিল ওয়্যার পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত করতে হবে। কর্মীদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা জোরদার করতে হবে এবং মাস্ক পরতে হবে। হাতের হাইজিনের প্রতি লক্ষ্য রাখতে হবে এবং হাঁচি দেওয়ার সময় মুখ এবং নাক টিস্যু বা কনুই দিয়ে ঢাকতে হবে। কাজের সময় গল্প করা হ্রাস করতে হবে এবং কাজের পরে ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে। কর্মক্ষেত্রে কর্মীদের মাস্ক পরতে হবে এবং গ্রাহকদের মাস্ক পরতে হবে। রেস্টুরেন্টে দীর্ঘক্ষণ ধরে খাওয়া চলবে না। স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রচারের জন্য খাবারের জায়গায় মহামারি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত নোটিশ এবং পোস্টার লাগাতে হবে।
রাজধানীর ধানমন্ডি এলাকায় কয়েকটি রেস্তোরাঁ ঘুরে দেখা গেছে, বেশিরভাগ রেস্তোরাঁয় স্বাস্থ্য সম্পর্কিত জ্ঞানের প্রচারের জন্য খাবারের জায়গায় মহামারি প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কিত নোটিশ এবং পোস্টার কিছুই লাগানো নেই। তাছাড়া প্রবেশমুখে শরীরের তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা নেই। ক্রেতাদের জন্য শুধু রাখা হয়েছে হ্যান্ড সেনিটাইজার। কিন্তু সেটা ব্যবহার করার জন্যও কেউ বলছে না। ক্রেতারা যে যার মতই আসছেন। কেউ কেউ মাস্ক ছাড়াও আসছেন। তাও ব্যবসার খাতিরে তা ক্রেতাদের স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে না বলেও স্বীকার করেছেন কোনও কোনও ব্যবসায়ী।
আবার কেউ কেউ সরকারি নির্দেশনার বাইরেও অতিরিক্ত ব্যবস্থা করেছেন ক্রেতাদের সুরক্ষায়। ধানমন্ডির সাত মসজিদ রোডে ম্যাডশেফে গিয়ে দেখা যায়, তাদের প্রবেশমুখে একজন তাপমাত্রা পরীক্ষা করছেন। পরীক্ষা শেষ হাত সেনিটাইজ করার পরামর্শ দিচ্ছেন। এরপর ক্রেতাদের প্রবেশের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। অতিরিক্ত সুরক্ষা হিসেবে তারা ডিজিটাল মেন্যুর ব্যবস্থা করেছেন। টেবিলে উল্লিখিত কিউ আর কোড স্ক্যান করলেই ফোনে মেন্যু পাওয়া যায়। তাছাড়া খাবার পরিবেশনের সময় পুরো টেবিল একটি পাতলা সাদা কাগজে ঢেকে দেওয়া হচ্ছে এবং প্রতিবার তা পরিবর্তন করা হচ্ছে।
ম্যাডশেফের ব্রাঞ্চ ইনচার্জ ইশান আল মামুন জানান, তাদের আসন সংখ্যা ছিল ৬০, কিন্তু করোনার কারণে তা কমিয়ে ৩৫ করা হয়েছে। আর আমরা কিউ আর কোড করেছি কারণ খাবারের মেনু অনেকে ধরবে। কিউ আর কোড দিয়ে যে যার ফোন থেকে দেখে ইচ্ছামতো অর্ডার করতে পারবেন। তাছাড়া আমরা খাবার পরিবেশনের ক্ষেত্রে ওয়ান টাইম প্লেট, চামচ, গ্লাস ব্যবহার করছি। আমরা যতটুকু পারি সুরক্ষার জন্য ব্যবস্থা করেছি।
তিনি আরও বলেন, ‘বেশিরভাগ মানুষই মাস্ক পড়ে আসে। মাস্ক ব্যবহারেও অনেকের অনীহা থাকে। আমরা বলে দেই সরাসরি যে, মাস্ক ছাড়া আমরা প্রবেশ করতে দেই না। এরকম আছে হয়তো ৫-১০ শতাংশ হবে।’
একই বিল্ডিংয়ের আরও কয়েকটি রেস্তোরাঁতে গিয়ে হ্যান্ড সেনিটাইজার ছাড়া আর তেমন কিছু চোখে পড়েনি এই প্রতিবেদকের। তাছাড়া আশেপাশের কয়েকটি রেস্তোরাঁতে দেখা গেছে, মানুষের বিপুল সমাগম। সেখানে ক্রেতা সামলাতে হিমসিম খাচ্ছেন রেস্তোরাঁর কর্মীরা, যার কারণে স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে কোনও নজরদারি নেই। এই বিষয়ে কমিক ক্যাফের ক্যাশিয়ারের দায়িত্বে থাকা কর্মীর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি জানান, অফার চলায় ক্রেতার চাপ বেশি, এখন কথা বলা যাবে না।
সাত মসজিদ রোডের জেনিয়াল ব্যুফে-তে তাপমাত্রা মাপার ব্যবস্থা নেই। আছে শুধু হ্যান্ড সেনিটাইজার। এর সত্ত্বাধিকারী মো. মাহবুব জামান বলেন, ‘আমাদের ১১০ জনের বসার ব্যবস্থা ছিল, আমরা তা কমিয়ে ৬০ করেছি। ক্রেতারা বেশিরভাগই মাস্ক পরে আসেন। মাস্ক ছাড়া আসার সংখ্যা খুব কম। আসলেও যদি অনেকের মধ্যে একজন- দুই জনের না থাকে, তাহলে আমরা আমাদের নিজেদের কাছ থেকে দেই ‘
ডি -স্ম্যাক ক্যাফেতেও তেমন কোনও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয় দেখা যায়নি। এর ম্যানেজার ভিকি চৌধুরী বলেন, ‘মাস্ক না পরে আসলে তারা ক্রেতাদের ফিরিয়ে দিতে পারেন না। ব্যবসার স্বার্থে তাদের আসতে দিতেই হয় ‘
বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি বলছে, অনেকেই আছে ট্রেড লাইসেন্স ছাড়া ব্যবসা করে, অনেকেই নিবন্ধিত না। শুধু সমিতির আওতাভুক্ত রেস্তোরাঁগুলোকে স্বাস্থ্যবিধি পালন করলে হবে না, অন্যদেরও তা পালনে বাধ্য করতে হবে। সমিতির সভাপতি রুহুল আমিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘‘আমরা আমাদের সমিতির মাধ্যমে ১০টি নির্দেশনা দিয়েছি রেস্তোরাঁ মালিকদের। এখন দেখা যাচ্ছে যে, আমরা মানছি ঠিকই কিন্তু ক্রেতারা খুব একটা তোয়াক্কা করছেন না। যেমন মাস্কের কথা জানতে চাইলে অনেকেই বলেন, ‘খেতে আসছি এখানে মাস্ক কিসের!’ কিন্তু আমাদের দায়িত্ব বলা যে – স্যার, প্লিজ হাত ধুয়ে আসুন। আমরা টেবিলে বসার সঙ্গে সঙ্গে গরম পানি দেই হাত ধোঁয়ার জন্য। মাঝারি ধরন থেকে বড় রেস্তোরাঁগুলোতে আমরা এগুলো মেইনটেইন করছি। কিন্তু যারা ফুটপাতে কিংবা খুব সাধারণ মানের রেস্তোরাঁ, তারা এগুলো কিছুই মেনটেইন করছে না। আমাদের ভয়টি সেখানেই যে, তাদের মাধ্যমে তো মানুষ সংক্রমিত হতে পারে।’’